১৯ স্কুলের পাশে তামাকচাষ, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শিক্ষার্থীরা

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার অন্তত ১৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশপাশে তামাক চাষ ও তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণের কার্যক্রম চলায় শিক্ষার্থীরা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। বিদ্যালয়গুলোর চারপাশে বিস্তৃত তামাকখেত ও তামাকচুল্লির কারণে শিশুরা প্রতিদিনই পড়াশোনার পাশাপাশি দূষিত বাতাসে শ্বাস নিতে বাধ্য হচ্ছে। সম্প্রতি কাকারা, ফাঁসিয়াখালী, বমু বিলছড়ি, বরইতলী ও সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন বিদ্যালয় সরেজমিন ঘুরে এমনই উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে, যেখানে কোথাও শ্রেণিকক্ষের একেবারে পাশেই তামাকখেত আবার কোথাও বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথের দুই পাশে ছড়িয়ে রয়েছে তামাকচাষ।

কাকারা ইউনিয়নের ডা. গোপাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রবেশমুখেই বিস্তৃত তামাকখেত দেখা যায়। একইভাবে ফাঁসিয়াখালীর পুকপুকুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের প্রধান সড়কের দুই পাশে তামাকের চাষ রয়েছে। বমু বিলছড়ির নাজমা ইয়াছমিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রায় তিন দিক থেকেই তামাকখেতের মধ্যে ঘেরা। কোথাও কোথাও মনে হয়, তামাকখেতের মাঝেই শিক্ষার্থীরা ক্লাস করছে। জানা যায়, এসব ১৯টি বিদ্যালয়ের আশপাশে অন্তত শতাধিক তামাকচুল্লিতে পাতা শুকানো হচ্ছে, আর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী শুধু এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘিরেই রয়েছে প্রায় ১১০টি চুল্লি। ডা. গোপাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আমেনা বেগম জানান, তামাকপাতা পরিপক্ব হলে এর তীব্র গন্ধ শ্রেণিকক্ষ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, আর কাটার মৌসুমে অনেক শিক্ষার্থী পরিবারের সঙ্গে কাজেও যুক্ত হয়, ফলে তাদের পড়াশোনা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে।

শিশুদের শরীরে ঢুকছে অদৃশ্য বিষ

বিদ্যালয়ে যেতে শিশুদের বাধ্য হয়ে তামাকখেত পেরোতে হয়, যেখানে তারা খালি পায়ে বা স্যান্ডেল পরে কীটনাশক ছড়ানো জমির ওপর দিয়েই চলাচল করে। তামাকপাতা ছোঁয়া এবং অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সঙ্গে খেতে কাজ করার কারণে তারা শৈশব থেকেই বিষাক্ত উপাদানের সরাসরি সংস্পর্শে আসছে। ২২ এপ্রিল সকালে উত্তর কাকারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয় থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে দুটি তামাকচুল্লিতে পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ চলছে। চুল্লি থেকে নির্গত তীব্র গন্ধ বাতাসে ভেসে সরাসরি বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পৌঁছে যায়, যা শ্রেণিকক্ষের ভেতরেও শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অনুভব করেন। শিক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কোনো একদিনের ঘটনা নয়; তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় নিয়মিতভাবেই এমন গন্ধে বিদ্যালয় পরিবেশ প্রভাবিত হয়।

চিকিৎসকদের মতে, এই সংস্পর্শের প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে ধরা না পড়লেও শরীরের ভেতরে ধীরে ধীরে ক্ষতি তৈরি করে। চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জায়নুল আবেদীন বলেন, তামাকপাতার মধ্যে থাকা নিকোটিন ত্বকের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এ অবস্থাকে ‘গ্রিন টোব্যাকো সিকনেস’ বলা হয়। এতে বমি, মাথা ঘোরা ও দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। তিনি আরও জানান, তামাক চাষে ব্যবহৃত কীটনাশক শিশুদের স্নায়ুতন্ত্র ও শ্বাসতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কম বয়সে এসব রাসায়নিকের সংস্পর্শে এলে দীর্ঘ মেয়াদে শারীরিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

পরিবেশ ও কৃষিতে পড়ছে চাপ

তামাক চাষের নেতিবাচক প্রভাব শুধু মানুষের স্বাস্থ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি পরিবেশ ও কৃষিতেও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। মাতামুহুরী নদীঘেঁষা এলাকায় তামাক চাষে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক বৃষ্টির পানি ও সেচের মাধ্যমে নদী ও জলাশয়ে মিশে যাচ্ছে, যা জলজ প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন। পাশাপাশি পাশের কৃষিজমিতেও এর প্রভাব পড়ছে। সুরাজপুর চরের কৃষক আলী আহমদ জানান, তামাকখেতের পাশে তাঁর বাদামের জমিতে আগের তুলনায় ফলন অনেক কমে গেছে; যেখানে আগে একটি গাছে প্রায় ২৫০ গ্রাম বাদাম পাওয়া যেত, এখন তা কমে প্রায় ১০০ গ্রামের কাছাকাছি নেমে এসেছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহানাজ ফেরদৌসী বলেন, তামাক চাষে তুলনামূলক বেশি মাত্রায় রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, যা মাটির জৈব গঠন নষ্ট করে। দীর্ঘদিন এভাবে চাষ চললে জমির উর্বরতা শক্তি কমে যায় এবং খাদ্যশস্য উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়। স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, ধান বা সবজির মতো ফসলের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি ও বাজার অনিশ্চিত। তার বিপরীতে তামাক চাষে কোম্পানিগুলো আগাম অর্থ, বীজ ও উপকরণ দেয়, ফলে চাষিরা নিশ্চিত আয় পান। কাকারা এলাকার কৃষক মোহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, ‘তামাক চাষে লাভ নিশ্চিত। অন্য ফসলে খরচ উঠে আসবে কি না, সেই অনিশ্চয়তা থাকে। তাই অনেকেই বাধ্য হয়ে তামাকের দিকে ঝুঁকছেন।’

তদারকির অভাব, দায় কার

পরিবেশকর্মীদের দাবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে তামাক চাষ ও চুল্লি স্থাপন বন্ধে কার্যকর তদারকি নেই। প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগের আশ্বাস থাকলেও বাস্তবে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। আইনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে তামাক নিয়ন্ত্রণের কথা থাকলেও বাস্তবে বিদ্যালয়ের দেয়াল ঘেঁষে তামাকখেত কীভাবে টিকে থাকে, এই প্রশ্ন তুলছেন অভিভাবকেরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন অভিভাবক বলেন, শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশের ক্ষতি; এসব কারও অজানা নয়। তবু কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই।

তবে বিদ্যালয়ের পাশে তামাক চাষ দ্রুত বন্ধ করা উচিত বলে মনে করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজারের সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ। তিনি বলেন, চকরিয়ায় হাজারের বেশি একর জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে, যার একটি বড় অংশ ছড়িয়ে পড়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে। ফলে যে জায়গাটি শিশুদের নিরাপদ শেখার পরিবেশ হওয়ার কথা, সেটিই হয়ে উঠছে ঝুঁকির কেন্দ্র। জানতে চাইলে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মহিউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, বিষয়টি তাঁদের নজরে এসেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ারও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।