১১ কোটি নাগরিকের তথ্য ফাঁস, বিসিসির বিরুদ্ধে তদন্তে দুদক

নির্বাচন কমিশনের ডেটা সেন্টারে সংরক্ষিত ১১ কোটির বেশি বাংলাদেশি নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য চুরির ঘটনায় তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের অধীন বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি)-এর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ বিষয়ে চলতি বছরের ২৪ মে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি।

সূত্র জানায়, ২০২২ সালের ৪ অক্টোবর এনআইডি যাচাই সেবা নেওয়া নিয়ে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন ও আইসিটি বিভাগের অধীন বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওই চুক্তির অনুচ্ছেদ ২ অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের তথ্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিনিময় বা বিক্রি করার অনুমতি ছিল না। তবে এই শর্ত উপেক্ষা করে ১১ কোটির বেশি নাগরিকের ৪৬ ধরনের ব্যক্তিগত তথ্যের অনুলিপি দেশ-বিদেশের প্রায় ১৮২টি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনার তদন্তের অংশ হিসেবে সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে প্রয়োজনীয় রেকর্ড ও তথ্য চেয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগে চিঠি দিয়েছে দুদক।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০২২ সালে চুক্তি হলেও চুক্তির আগেই ১১ কোটিরও বেশি নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের মিরর কপি তৈরি করে ২০১৯ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলকে দেওয়া হয়। একই বছরের সেপ্টেম্বরে ডিজিকন গ্লোবাল সার্ভিস লিমিটেড নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য প্রদান করে। চুক্তির আগেই কী করে তথ্য পেল বিসিসি বা ডিজিকন সেই বিষয়ে অনুসন্ধান করছে দুদক। আর সেই অনুসন্ধানের অংশ হিসেবেই নানা সময়ে বিভিন্ন ধরনের তথ্য চেয়ে আইসিটি বিভাগকে চিঠি দেয় দুদক। চিঠির কপিতে দেখা যায়, এ বছরের ১৬ জুন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের প্রশাসন শাখা এই চিঠি গ্রহণ করে। চিঠিতে অভিযোগের সংক্ষিপ্ত বিবরণে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অধীনে থাকা বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির অভিযোগ করা হয়।

দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক (অনুঃ ও তদন্ত-৫) ও অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা নীল কমল পাল স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘porichoy.gov.bd’ নামের গেটওয়ে বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের সার্ভার থেকে নাগরিকদের তথ্য যাচাইয়ের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ সরকারের ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি (সিসিজিপি) যে অনুমোদন দিয়েছে, তার পত্র বা কার্যবিবরণীর সত্যায়িত অনুলিপি চাওয়া হয়েছে। চিঠি পাওয়ার পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত এই অনুসন্ধানী কর্মকর্তার কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, বিষয়টি নিয়ে দুদকের তদন্ত চলছে এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল দুদকের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছে। তিনি আরও জানান, নির্বাচন কমিশনের তথ্য ব্যবহার করত তৃতীয় পক্ষ প্রতিষ্ঠান ‘ডিজিকন লিমিটেড’ এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল কেবল ‘সার্ভিস বাস গেটওয়ে’ হিসেবে কাজ করেছে। ফলে তাদের কাছে কোনো তথ্য সংরক্ষণ বা ব্যবহারের সুযোগ ছিল না।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, তারা দুদকের চাহিদা মোতাবেক সব তথ্য পাঠিয়েছেন বললেও এখনো এই চিঠিতে চাওয়া তথ্য-উপাত্ত দুদক পায়নি বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির অনুসন্ধানের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা নীল কমল পাল। তিনি বলেন, আমি এখনো কোনো উত্তর তাদের কাছ থেকে পাইনি। তারা কিছু জানাননি। তারা কবে চিঠি রিসিভ করেছে এটা ডাক বিভাগ জানে। আবারও চিঠি পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। যদিও দুদকের পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করা ছিল ‘চিঠি গ্রহণের ৫ কর্মদিবসের মধ্য’ তথ্য পাঠাতে হবে। চিঠি গ্রহণের ৫ কর্মদিবসের মধ্যে তথ্য দেওয়ার কথা থাকলেও দুদক এখনো তা পায়নি কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে কম্পিউটার কাউন্সিলের পরিচালক জাকির হোসেন বাচ্চু বলেন, কিছু তথ্য প্রস্তুত ছিল তা পাঠানো হয়েছে। আর কিছু তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছিল। সেটা হয় এক দিন আগে পাঠিয়েছি, না হলে পাঠিয়ে দেব। তিনি আরও বলেন, দুদক নানা সময়ে অনেক তথ্যই আমাদের কাছে চেয়েছে। আমরা পাঠিয়েছি। তবে এ চিঠির বিষয়ে আরও তথ্য দিতে হলে আমাকে আরও খবর নিয়ে দেখতে হবে।