শুল্ক কমলেও কমেনি সোলার পণ্যের দাম

সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, লিথিয়াম ব্যাটারি, ব্যাটারি প্যাক ও মাউন্টিং স্ট্রাকচারসহ বিভিন্ন সরঞ্জামে শুল্ক-কর সুবিধা দিয়েছে সরকার। এতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ কমার পাশাপাশি সোলার সিস্টেমের দাম সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। তবে বাজেট ঘোষণার দুই মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও খুচরা বাজারে এর সুফল মিলছে না। রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, দেশজুড়ে লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় সোলার ও ব্যাটারিচালিত পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। বাড়তি চাহিদার সুযোগে কিছু সোলার পণ্যের দাম কমার পরিবর্তে বরং বেড়েছে। ফলে সরকার আমদানি পর্যায়ে শুল্ক-কর কমালেও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সাধারণ ক্রেতাদের চড়া দামে সোলার সরঞ্জাম কিনতে হচ্ছে।

কাপ্তান বাজার শপিং কমপ্লেক্সের রে পাওয়ার হোমের মালিক শেখ রায়হান বলেন, আগে যে দামে সোলার সিস্টেমের প্যানেল ও ব্যাটারি বিক্রি করতেন, এখনও প্রায় একই দামে বিক্রি করছেন। শুল্ক-কর কমানোর প্রভাব বাজারে না পড়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, নতুন অর্থবছরে দাম সামান্য কমলেও লোডশেডিংয়ের কারণে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আমদানিকারক ও ডিলাররা তা আবার বাড়িয়ে দিয়েছেন। তার দেওয়া হিসাবে, দুই কিলোওয়াটের একটি সোলার সিস্টেমের প্যানেল ও ব্যাটারির দাম ৭৪ হাজার টাকা, ফিটিং ও সার্ভিস চার্জ ছাড়া। এপ্রিল-মে মাসেও প্রায় একই দামে এটি বিক্রি হয়েছে বলে জানান তিনি।

সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকার ঘোষিত শুল্ক-কর কমানো বা মওকুফের সুবিধা মূলত কারখানা ও বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে স্থাপনের জন্য সরাসরি আমদানি করা সোলার সরঞ্জামের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকরা সরাসরি পণ্য আমদানি করলে শুল্ক সুবিধার পাশাপাশি ঋণ পাওয়ার সুযোগও রয়েছে। তবে খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা না পাওয়ায় বাজারে সোলার সরঞ্জামের দাম কমেনি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। রাজধানীর নবাবপুর, কাপ্তানবাজার শপিং কমপ্লেক্স, সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেট ও গুলিস্তান স্টেডিয়াম মার্কেট ঘুরেও একই চিত্র দেখা গেছে। এসব বাজারে কোনো কোনো পণ্য আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে, আবার কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। বিক্রেতাদের দাবি, বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিংয়ের কারণে সোলার পণ্যের বাড়তি চাহিদাই দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ।

কাপ্তান বাজারের তাসফিয়া সোলার অ্যান্ড ইলেকট্রিকের মালিক কামরুল ইসলাম বলেন, সোলারের চাহিদা বেড়েছে এবং অনেক ক্রেতা আসছেন। প্যাকেজ আকারে বেশি বিক্রি হলেও আগের তুলনায় দাম বেড়েছে। শুল্ক কমানোর সুবিধা বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না বলেও জানান তিনি। তার হিসাবে, আগে একটি ব্যাটারি ১৮ থেকে ১৯ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে ২৩ থেকে ২৪ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে প্রায় ২৮ শতাংশ। বাজার সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, গত এপ্রিল-মে মাসে ব্র্যান্ডভেদে ৫৫০ থেকে ৬২৫ ওয়াটের সোলার প্যানেল প্রায় সাড়ে ১১ হাজার থেকে ১৭ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। ৫ কিলোওয়াটের সোলার ইনভার্টারের দাম ছিল প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ হাজার টাকা। আর ৫ দশমিক ১২ কিলোওয়াট-ঘণ্টার লিথিয়াম ব্যাটারির দাম ছিল প্রায় ৯৪ হাজার থেকে ১ লাখ ২৮ হাজার টাকা। সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব পণ্যের দাম এপ্রিল-মে মাসেও প্রায় একই ছিল।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যমতে, নতুন অর্থবছরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে সোলার প্যানেল, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি, ইনভার্টার ও মাউন্টিং স্ট্রাকচারসহ বিভিন্ন উপকরণে শুল্ক-কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির আমদানি শুল্ক (সিডি) ২৫ শতাংশ থেকে শূন্যে নামানো হয়েছে। সোলার প্যানেলের সিডি ১ শতাংশ থেকে শূন্য করা হয়েছে। সোলার ইনভার্টারও শুল্ক-কর অব্যাহতির আওতায় এসেছে। এছাড়া স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের মাউন্টিং স্ট্রাকচার, ব্যাটারি সেল, ব্যাটারি প্যাকসহ বিভিন্ন উপকরণে শর্তসাপেক্ষে রেয়াত দেওয়া হয়েছে। তবে সম্পূর্ণ ব্যাটারি আমদানি ও ব্যাটারি তৈরির কাঁচামালের ক্ষেত্রে সুবিধা এক নয় বলে জানিয়েছে এনবিআর।

অন্যদিকে বর্তমানে বাজারে একটি ৫৫০ ওয়াটের প্যানেল ১৩ হাজার ৫০০ থেকে ১৯ হাজার ৫০০ টাকা, ৫ কিলোওয়াটের ইনভার্টার ৪৮ হাজার থেকে ৭৭ হাজার টাকা এবং ৫ দশমিক ১২ কিলোওয়াট-ঘণ্টার লিথিয়াম ব্যাটারি ৯৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই তিনটি প্রধান উপকরণেই ১ লাখ ৬০ হাজার থেকে ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। অথচ আগের অর্থবছরের বাজেটের হিসাবে এসব উপকরণে খরচ ছিল ১ লাখ ৫৪ হাজার থেকে ২ লাখ ২ হাজার টাকার মধ্যে। অর্থাৎ শুল্ক কমার পর দাম কমার প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে ক্রেতাকে বেশি অর্থ গুনতে হচ্ছে। বৈদেশিকমুদ্রা বিনিময় হার চেক করা

রাজধানীর রামপুরা থেকে গুলিস্তান স্টেডিয়াম মার্কেটে সোলার সিস্টেম কিনতে আসা মো. সুমন হাওলাদার বলেন, লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় বাসায় সোলার প্যানেল স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। সরকার শুল্ক কমিয়েছে—এমন খবর শুনে কিছুটা কম দামে সরঞ্জাম কেনার আশা করেছিলেন। কিন্তু দোকানিরা যে দাম চাচ্ছেন, তা তার সামর্থ্যের বাইরে। তাই কম দামে পণ্য পাওয়ার আশায় বিভিন্ন দোকানে ঘুরছেন তিনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সোলার পণ্যে শুল্ক কমানোর সুবিধা সব আমদানিকারক বা ভোক্তা সরাসরি পাচ্ছেন না। নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও শর্ত পূরণকারী প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পের ক্ষেত্রেই এ সুবিধা প্রযোজ্য। বিশেষ করে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠান এবং নির্দিষ্ট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো এ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রাখে। ফলে কোনো কারখানা বা বড় প্রকল্প শুল্ক ছাড়ে সরঞ্জাম আমদানি করতে পারলেও বাসাবাড়ির জন্য স্থানীয় বাজার থেকে একই ধরনের পণ্য কেনা সাধারণ ভোক্তারা এর সুফল সরাসরি পাচ্ছেন না।

সরকার আগামী কয়েক বছরে বাসাবাড়িসহ বিভিন্ন ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের ছাদ থেকে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, খুচরা বাজারে শুল্ক-কর ছাড়ের সুফল না পৌঁছানো এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। আমদানিকারকরা শুল্ক সুবিধা পাওয়ার পর তার কতটা ভোক্তার কাছে স্থানান্তর করছেন, তা যাচাইয়ে দৃশ্যমান ও কার্যকর মূল্য-তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা এল মাহমুদ বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর দেশে সোলার প্যানেল বসানোর প্রবণতা বেড়েছে। তবে সাধারণ ভোক্তা পর্যায়ে এর সুবিধা পৌঁছাতে হবে। কম দামে নিম্নমানের পণ্য বাজারে প্রবেশ করে যাতে মানুষের সোলার ব্যবহারে আগ্রহ কমে না যায়, সেদিকেও সরকারকে নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে সোলার পণ্য আমদানি ও বাজারজাতকরণে নজরদারি বাড়ানো এবং শুল্ক-কর কমানোর সুবিধা সাধারণ ভোক্তার কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে।