চট্টগ্রামে বিদেশি বিনিয়োগে হচ্ছে গ্রিন টার্মিনাল

চট্টগ্রাম বন্দরে সম্পূর্ণ বিদেশি বিনিয়োগে দেশের প্রথম ‘গ্রিন ফিল্ড’ কনটেইনার টার্মিনাল নির্মিত হতে যাচ্ছে। আজ রোববার স্থাপন করা হবে ভিত্তিপ্রস্তর। আশা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এই প্রকল্প পুরোপুরি অপারেশনাল কাজ শুরু করবে। বন্দর প্রতিষ্ঠার ১৩৯ বছরের মধ্যে এমন উদ্যোগ এটিই প্রথম। এই টার্মিনালের নির্মাণ, যন্ত্রপাতি সংযোজন ও পরিচালনার সব ধাপই সম্পন্ন করবে ডেনমার্কের বিদেশি বিনিয়োগকারী।

৫৫ কোটি বা ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই টার্মিনালে বছরে ২০ ফুট সমমানের (টিইইউ) ৮ লাখের বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা যাবে। এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা প্রায় ২৩ শতাংশ বাড়বে। টার্মিনালটিতে একসঙ্গে ৬ হাজার টিইইউ ধারণক্ষমতার জাহাজ পরিচালনা করা সম্ভব হবে, যা বর্তমানে বন্দরে আসা জাহাজগুলোর সক্ষমতার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। এখানে সর্বোচ্চ ১০ দশমিক ৫ মিটার গভীরতার জাহাজ নোঙর করতে পারবে। টার্মিনালে থাকবে সাতটি শিপ-টু-শোর ক্রেন, ৩২টি বিদ্যুতায়িত রাবার-টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন এবং ৪১টি বিদ্যুতায়িত টার্মিনাল ট্রাক্টর। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের সামগ্রিক সক্ষমতা ও দক্ষতা আরও বাড়বে।

নৌপরিবহন, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, ডেনমার্কের সহযোগিতায় লালদিয়া টার্মিনালটিকে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন টার্মিনাল’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। টার্মিনালের ক্রেনগুলো অফিস থেকে দূরবর্তী স্থানে বসেও পরিচালনা করা যাবে। প্রকল্পটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং জাতীয় অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আশা করছি, ২০৩০ সালের মধ্যে এই প্রকল্প পুরোপুরি অপারেশনাল কাজ শুরু করতে পারে।

এপিএম টার্মিনালস লালদিয়ার সিইও রমেশ ডেভিড জানান, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে টার্মিনালটির নকশা, অর্থায়ন, নির্মাণ ও পরিচালনা করবে এপিএম টার্মিনালস। গত বছরের ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) সঙ্গে একটি ৩০ বছর মেয়াদি ছাড়পত্র চুক্তিও স্বাক্ষর করে তারা। নেদারল্যান্ডসভিত্তিক টার্মিনাল পরিচালনাকারী সংস্থাটি সম্প্রতি তাদের ওয়েবসাইটে প্রকল্পটির নকশা, ধারণা ও কারিগরি বিবরণ প্রকাশ করেছে।

যেভাবে কমতে পারে লজিস্টিকস খরচ

চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে সর্বোচ্চ প্রায় ২ হাজার ৭০০ টিইইউ ধারণক্ষমতার জাহাজই বেশি নোঙর করে। এসব জাহাজ সাধারণত ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকায় সরাসরি চলাচল করতে পারে না। ফলে কলম্বো ও সিঙ্গাপুরের মতো আঞ্চলিক প্রধান বন্দরে গিয়ে পণ্য স্থানান্তর করতে হয়। এতে সময় লাগে অতিরিক্ত ৭ থেকে ১০ দিন এবং বাড়ে পরিবহন ব্যয়। তবে এপিএম টার্মিনালস ৬ হাজার টিইইউ পর্যন্ত ধারণক্ষমতার জাহাজ পরিচালনা করতে পারবে। ফলে এ টার্মিনালের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর থেকেই এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার রুটে চলাচলকারী বড় মূলধারার কনটেইনার জাহাজ থেকে সরাসরি সেবা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এতে ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহন ও পরিচালন ব্যয় কমবে বলে মনে করেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম।

শতভাগ কর ছাড় পাচ্ছে বিদেশি প্রতিষ্ঠান

লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল উন্নয়ন ও পরিচালনার জন্য চুক্তিবদ্ধ দুটি বিদেশি কোম্পানি ১০ বছরের জন্য শতভাগ কর ছাড় পাবে বলে জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রতিষ্ঠানটির সাবেক চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ২০১৭ সালের একটি সরকারি আদেশের অধীনে দশকব্যাপী কর সুবিধা ভোগ করবে বিদেশি প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস। এ ছাড়া সেখানে কর্মরত বিদেশি কারিগরি কর্মীরাও নির্দিষ্ট পরিমাণ কর ছাড় পাবেন। কোম্পানিগুলোর রয়্যালটি, কারিগরি দক্ষতার ফি, লভ্যাংশ– সবকিছুই এখন কর ছাড় পাবে।’ কর-সংক্রান্ত ২০১৭ সালের একটি বিদ্যমান সরকারি আদেশ (এসআরও) অনুযায়ী, পিপিপির অধীনে ১২ ধরনের পরিকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগকারী কোম্পানিগুলো ১০ বছরের জন্য শতভাগ আয়কর ছাড় পাওয়ার অধিকারী।

প্রশ্ন আছে চুক্তির স্বচ্ছতা নিয়ে

লালদিয়া টার্মিনাল নিয়ে সম্পাদিত চুক্তির শর্তাবলি অপ্রকাশিত আছে এখনও। এটি নিয়ে আছে অনেক বিতর্কও। সিপিডির সম্মানিত ফেলো মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এই চুক্তিগুলো থেকে আমরা কী লাভ করছি এবং কী ছাড় দিচ্ছি, সে বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকতে হবে। এসব বিষয় নিয়ে একটি প্রকাশ্য বিতর্কও হওয়া উচিত।’

লালদিয়ায় বিনিয়োগকারীরা কারা

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চট্টগ্রামের লালদিয়া নিয়ে চুক্তি হয়। লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল উন্নয়ন ও পরিচালনার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি একটি ছাড়পত্র চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ডেনিশ জাহাজ শিল্পোদ্যোগী প্রতিষ্ঠান এপি মোলার-মার্স্কের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান নেদারল্যান্ডসভিত্তিক এপিএম টার্মিনালস বিভি এই চুক্তি স্বাক্ষর করে। তারাই বিনিয়োগকারী হিসেবে একটি বৃহৎ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) প্রকল্পের মাধ্যমে এটি বাস্তবায়ন করবে।