মার্কেন্টাইল ব্যাংকে ৩০৪ কোটি টাকার অনিয়ম

মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসিতে ব্যাপক অনিয়ম ও জালিয়াতির তথ্য উঠে এসেছে। বেসরকারি ব্যাংকটির বিভিন্ন ধরনের কেনাকাটা ও করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কার্যক্রমে দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বোর্ডসভার নির্ধারিত ৮ হাজার টাকা ফি’র পরিবর্তে পরিচালকদের দেওয়া হয়েছে ১ লাখ টাকা করে। এছাড়া সিএসআর তহবিল, ল্যাপটপ ও সফটওয়্যার কেনাকাটাসহ বিভিন্ন খাতে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের তথ্য মিলেছে।

শুধু তাই নয়, ব্যাংকটি গ্র্যাচুইটি, কল্যাণ তহবিল সংরক্ষণ না করায় অবসরপ্রাপ্ত অনেকে সুবিধাবঞ্চিত হচ্ছেন। মর্কেন্টাইল ব্যাংকের গুরুতর এসব অনিয়ম উঠে এসেছে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক বিশেষ পরিদর্শনে। ওই পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এসব অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যাংকটির কয়েকজন পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রধান আর্থিক কর্মকর্তাসহ (সিএফও) ডজনখানেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে সিএফও তাপস চন্দ্র পাল ও এমডি মতিউল হাসানের নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে ব্যাংকের প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর), ল্যাপটপ-সফটওয়্যার ও আসবাবপত্র কেনাকাটা এবং অনুমোদনহীন বিদেশি চিকিৎসা ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব অনিয়মের ঘটনায় ব্যাংকটির এমডি, দুই ডিএমডি ও সিএফওকে চাকরি থেকে অপসারণের সুপারিশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদন।

পরিদর্শন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে মোহাম্মদ আব্দুল আওয়াল পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে ব্যাংকের বিভিন্ন ক্রয় কার্যক্রম ও সিএসআর খাতে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে সিএসআরের আওতায় কম্বল কেনার নামে ১১০ কোটি টাকা এবং ব্যবসা উন্নয়ন খাতে ডায়েরি ও ক্যালেন্ডার কেনার নামে ৭৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, অর্থাৎ মোট ১৮৭ কোটি টাকা আত্মসাতের তথ্য পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শক দল। এটিকে সুসংগঠিত দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ হিসেবে দেখছে তারা। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সিএ, এসিসিএ বা এফসিএর মতো পেশাগত সনদ না থাকলেও তাপস চন্দ্র পাল দীর্ঘদিন এফডিএ ও সিএফও অফিসে দায়িত্ব পালনকালে আর্থিক বিবরণীতে কারসাজি করেছেন। এ কাজে কিছু নিয়ন্ত্রক পরিদর্শকের নীরব সহযোগিতার অভিযোগও রয়েছে। এসব অনিয়মের ফলে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থান ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

অভিযোগ রয়েছে- তিনি কর্মচারীদের গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও কল্যাণ তহবিলের জন্য বাধ্যতামূলক সংরক্ষণ (প্রভিশন) না রেখেই আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করেছেন। এর ফলে অবসরপ্রাপ্ত ও চাকরি ছেড়ে যাওয়া বহু কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে তাদের প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি নিজে দায়িত্ব পালনকালীন এসব সুবিধা গ্রহণ করলেও পর্যাপ্ত সংরক্ষণ না থাকায় বহু অবসরপ্রাপ্ত ও পদত্যাগী কর্মচারী বছরের পর বছর তাদের আইনগত পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

নথিপত্র অনুযায়ী, সিএসআর, বিশেষ সিএসআর এবং বিভিন্ন ক্রয় কার্যক্রমের ডায়েরি, ক্যালেন্ডার, কম্বল, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, সফটওয়্যার, আসবাবপত্র ইত্যাদির জন্য বরাদ্দ তহবিল প্রভাবশালী পরিচালক ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরোক্ষ আর্থিক সুবিধা দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, তাপস পাল রূপালী ব্যাংকে কর্মচারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে মার্কেন্টাইল ব্যাংকে জুনিয়র অফিসার হিসেবে যোগ দেন।

এরপর পদোন্নতি নিয়ে তাকে আর ভাবতে হয়নি। তিনি ওই ব্যাংকে ২০১৮ সালে ভিপি পদে, ২০২১ সালে এসভিপি, ২০২২ সালে ইভিপি এবং ২০২৪ সালে এসইভিপি হন। আর পরিচালকদের আর্থিক সুবিধা দেওয়ার পুরস্কার হিসেবে ২০২৬ সালে ডিএমডি পদে পদোন্নতি পান তাপস চন্দ্র পাল। প্রতিবেদন বলছে, পরিচালনা পর্ষদ ও নির্বাহী কমিটির সভায় ভুয়া বিলের মাধ্যমে ব্যাংকটির এমডি মতিউল হাসান অবৈধ সুবিধা ভোগের উদ্দেশ্যে কোম্পানি সেক্রেটারি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম শুহিনের সহযোগিতায় প্রতি বোর্ড ও ইসি সভায় নির্ধারিত ফি ৮ হাজার টাকার স্থলে দিতেন ১ লাখ টাকা। এর সাসপেন্ড হিসাব এ/সি বিডিটি ১৪০৩৯০০০১০০০১।

ভুয়া বিল ও জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে অর্থ সমন্বয়ের ঘটনাকে গুরুতর আর্থিক জালিয়াতি ও ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে প্রায় ১১০ কোটি টাকার কম্বল কেনা দেখিয়ে অন্তত ৮৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ ঘটনায় চেয়ারম্যানসহ ব্যাংকের সাতজন পরিচালক জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নয়নের নামে এমডি মতিউল হাসান তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী প্রকৌশলী মো. রেজা হোসেনের সহায়তায় কোনো স্বচ্ছ টেন্ডার ছাড়াই ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার কার্যাদেশ দেন। এতে আপত্তি জানানোয় ডিএমডি আদিল রাইহানকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়। একই সঙ্গে আইটি বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ মাহমুদ হাসানকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অনিয়মে সহযোগিতা করতে বাধ্য করার অভিযোগও রয়েছে।

একইভাবে ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা অনুসরণ না করে কেনা সফটওয়্যার ল্যাবকে ৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা কার্যাদেশের পর এমডি মতিউল হাসান তার সহচর ইঞ্জিনিয়ার রেজা হাসানের প্রত্যক্ষ সহায়তায় রেইনবো অ্যারের অনুকূলে ব্যাংকটির কারওয়ান বাজার শাখার মাধ্যমে ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ডিএমডি অসীম কুমার সাহা বলেন, এই অভিযোগের বিষয়টি আমার জানা নেই। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্ট অথবা ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলতে পারবেন। যতটুকু জানি, এমডির গুরুতর অসুস্থ এক আত্মীয় হাসপাতালে ভর্তি থাকায় তিনি দৌড়াদৌড়ির মধ্যে আছেন। সে কারণে হয়তো ফোন কল রিসিভ করতে পারছেন না।

এ বিষয়ে এমডির সঙ্গে সরাসরি কথা বলার জন্য পরদিন অফিসে গিয়ে সাক্ষাতের পরামর্শ দেন তিনি। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের অনিয়মের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, পরিদর্শনে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে ব্যাংকটিকে এসব বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। ব্যাংকের দেওয়া জবাব সন্তোষজনক না হলে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে বিষয়গুলো উঠে আসায় এগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ব্যাংকের ব্যাখ্যা পর্যালোচনার পর নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।