বছরের পর বছর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারছে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এরই মধ্যে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের ‘উচ্চাভিলাষী’ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি। রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং কর-জিডিপি অনুপাত উন্নত করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব খাত সংস্কার ও কর আদায় বাড়াতে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে।
এ সময়ে কর ফাঁকি শনাক্ত করা, বকেয়া রাজস্ব আদায়, মামলায় আটকে থাকা অর্থ উদ্ধারে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর), দ্রুত অডিট নিষ্পত্তি, ভ্যাট ফাঁকি রোধ, উৎসে কর বা ট্যাক্স ডিডাকশন অ্যাট সোর্স (টিডিএস) তদারকি এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতার পর এবার এনবিআরের সামনে স্বাধীনতার পর সর্বোচ্চ উচ্চাভিলাষী রাজস্ব প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআরের মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের প্রকৃত আদায়ের তুলনায় প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি।
জানা গেছে, রাজস্ব বাড়াতে এনবিআর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে কর ফাঁকি শনাক্ত ও বন্ধ করার ওপর। মাঠপর্যায়ে অভিযান জোরদারের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করে বিশেষ নজরদারির আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এছাড়া মনোবল বাড়াতে কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিব। রেষারেষি ভুলে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক বিভাগকে একত্রে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন চেয়ারম্যান। একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের েচাহিদা ও সুযোগ সুবিধা পূরণের ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। ‘টিম এনবিআর’ মন্ত্রে দীক্ষিত করে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
সূত্র জানায়, ভ্যাট খাতে মাসে ১০ লাখ টাকার বেশি লেনদেন করে এবং ফাঁকির ঝুঁকি রয়েছে—এমন প্রায় ৮ হাজার প্রতিষ্ঠানকে নিবিড় নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে বিশেষ অভিযান চালিয়ে অতিরিক্ত ২৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নিয়েছে এনবিআর। পাশাপাশি বছরে এক কোটি টাকার বেশি ভ্যাট পরিশোধকারী প্রায় ২ হাজার বড় করদাতার ওপর পৃথকভাবে নজরদারি চালিয়ে আরও ১০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে শুধু ভ্যাট ফাঁকি শনাক্ত করে অতিরিক্ত প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি। এ ছাড়া তামাক খাত থেকে ১২ হাজার কোটি, বকেয়া রাজস্ব থেকে ১৪ হাজার কোটি, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের মাধ্যমে ১৫ হাজার কোটি এবং অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি থেকে আরও প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার আশা করছে এনবিআর। রাজস্ব আদায়ের অন্যতম বড় উৎস টিডিএস বা উৎসে কর। এ খাতে ফাঁকি বন্ধে গত ১৯ জুলাই এনবিআর জানিয়েছে, সংস্থাটির কর্মকর্তারা যেকোনো বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে সরেজমিনে পরিদর্শন করতে পারবেন।
প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের হিসাবের বই, ভাউচার, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, রসিদ ও অন্যান্য আর্থিক নথি পরীক্ষা করা যাবে। কম্পিউটার, ক্লাউড সার্ভার, ডিজিটাল রেকর্ড কিংবা অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইসে থাকা তথ্যও যাচাইয়ের সুযোগ থাকবে। প্রয়োজন হলে নথি বা ইলেকট্রনিক রেকর্ড সাময়িকভাবে জব্দ করার ক্ষমতাও রয়েছে কর্মকর্তাদের। এক্ষেত্রে এনবিআর কর্মকর্তাদের সরেজমিনে পরিদর্শনে বাধা দিলে আয়কর আইনের ১৪৭(২) ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, এটি নতুন কোনো ক্ষমতা নয়; আইনে আগে থেকেই থাকা ক্ষমতার প্রয়োগ নিশ্চিত করতেই বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। যারা উৎসে কর কেটে সরকারি কোষাগারে জমা দিচ্ছেন না বা তথ্য গোপন করছেন, তাদের শনাক্ত করাই উদ্দেশ্য।
তবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো এতে উদ্বিগ্ন। তাদের আশঙ্কা, অটোমেশন ও পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া কর্মকর্তাদের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা দিলে হয়রানি ও দুর্নীতির সুযোগ বাড়তে পারে। বিজিএমইএ, ঢাকা চেম্বারসহ কয়েকটি ব্যবসায়ী সংগঠন বিষয়টি নিয়ে এনবিআরের কাছে উদ্বেগ জানিয়েছে। রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর আরেকটি বড় পথ হিসেবে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে আদালতে আটকে থাকা বকেয়া রাজস্ব আদায়ে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন আদালতে মামলার কারণে আটকে আছে প্রায় ৮২ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে আয়কর খাতে ৩৬ হাজার ৭০০ কোটি, ভ্যাটে ৩৬ হাজার ২০০ কোটি এবং শুল্ককর খাতে ৯ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকার রাজস্ব। চলমান মামলার সংখ্যা আয়কর খাতে প্রায় ৫ হাজার ৫০০, ভ্যাটে ১১ হাজার ৬৮৪ এবং শুল্ককর খাতে ১২ হাজার ৩৩৫টি।
দীর্ঘদিন ধরে এসব মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় এবার বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর, বুক অ্যাডজাস্টমেন্ট, প্রয়োজনে ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং সার্টিফিকেট মামলা করার মতো পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি রাজস্ব-সংশ্লিষ্ট বড় মামলাগুলো দ্রুত শুনানির জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আদালতের কার্যতালিকায় নেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে। এনবিআরের পক্ষ থেকে প্রায় ৫০টি বড় মামলার তালিকা তৈরি করা হয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব জড়িত।
রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনায় দীর্ঘদিনের অডিট জটও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এনবিআরের উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে প্রায় ৬৬ হাজার করদাতার অডিট দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি রাজস্ব-সংশ্লিষ্ট ২৩টি বড় কর বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এনবিআরের মতে, এতে একদিকে সরকারের পাওনা নির্ধারণ ও আদায় ত্বরান্বিত হবে, অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা কর বিরোধগুলোরও সমাধান হতে পারে। রাজস্ব ফাঁকি রোধে তামাক খাতেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সিগারেটের প্যাকেটে কিউআর কোড সংযুক্ত করা এবং কারখানায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ক্যামেরা স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করছে এনবিআর। এর মাধ্যমে উৎপাদন, সরবরাহ ও বিক্রির তথ্য আরও কার্যকরভাবে নজরদারির আওতায় আনা এবং অবৈধ উৎপাদন ও রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ কমানো হবে।
সরকারের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে ২০২৮-২৯ অর্থবছরের মধ্যে সামগ্রিক রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১০ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ অনুপাত ১০ দশমিক ২ শতাংশ এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ১০ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রক্ষেপণ রয়েছে। এছাড়া শুল্ক ফাঁকি রোধ করতে অভিযান বাড়িয়েছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)। ঢাকা বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ও শুল্ক স্টেশনে বিগত কয়েক সপ্তাহে সোনা, মূল্যবান ইলেকট্রনিক গ্যাজেট, জামা-কাপড়, গৌরি ক্রিম জব্দ করেছে সংস্থাটি। শুল্ক ফাঁকি দেওয়া এসব পণ্যের মূল্য প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা।
অন্যদিকে, এনবিআরের নিজস্ব কর রাজস্ব জিডিপির ৬ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৯ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ৯ দশমিক ৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। রাজস্ব বাড়াতে সরকারের উদ্যোগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে প্রশাসনিক সক্ষমতা ও ব্যবসায়ীদের আস্থা। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, করব্যবস্থা পুরোপুরি অটোমেশন করা গেলে কর ফাঁকি কমার পাশাপাশি কর কর্মকর্তা ও করদাতার সরাসরি যোগাযোগও কমবে। এতে হয়রানি, ঘুস ও অনিয়মের সুযোগ সীমিত হবে।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, টিডিএস বিষয়ে ব্যবসায়ী ও ক্রেতা—দুই পক্ষেরই পর্যাপ্ত ধারণা নেই। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি, নেই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও। এমন পরিস্থিতিতে এনবিআরকে এ ধরনের ক্ষমতা দেওয়া ‘পাগলের হাতে খুন্তি দেওয়ার মতো’ বলে মন্তব্য করেন তিনি। হেলাল উদ্দিনের ভাষ্য, এনবিআরের অনেক কর্মকর্তা মনে করেন ভয়ভীতি দেখিয়েই কর আদায় বাড়ানো সম্ভব। তবে ভালো কর্মকর্তার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার অভিযোগও রয়েছে। তাঁর মতে, কর ফাঁকি শনাক্তের জন্য আরও আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত। দোকানে গিয়ে কম্পিউটার বা নথিপত্র জব্দ কিংবা সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করা হলে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হতে পারে। এতে সরকারের জনপ্রিয়তাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, দেশের অর্থনীতির আকার বিবেচনায় সঠিকভাবে ভ্যাট আদায় করা সম্ভব হলে বর্তমান আদায়ের পরিমাণ অন্তত দ্বিগুণ করা যেতে পারে। এ জন্য পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির বলেন, রাজস্ব আহরণ বাড়াতে নেওয়া উদ্যোগগুলো ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। কর ফাঁকি রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এসব পদক্ষেপ যাতে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির হাতিয়ার না হয়ে ওঠে, সেদিকেও নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়িয়ে করের আওতা সম্প্রসারণ এবং অটোমেশনের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
