হাসিনার প্রত্যর্পণ ছাড়া তারেকের ভারত সফর নয়

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেবেন না এবং ভারতও সফর করবেন না, যতক্ষণ না দিল্লি শেখ হাসিনাকে ঢাকায় ফেরত পাঠায়।শুক্রবার (১৪ আগস্ট) এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য দিয়েছে ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য ট্রিবিউন। কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ১০ আগস্ট ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠকে তারেক রহমান এই বার্তা দেন।

দ্য ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, হাসিনা দুই দেশের সম্পর্ককে নিজের মতো করে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন। এতে তারেক রহমান ও তার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকারের অসন্তোষ কতটা, তা আরও স্পষ্ট হয়েছে ঢাকার আরেকটি বার্তায়। দিল্লিকে জানানো হয়েছে, এমনকি তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরও শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের ওপর ‘ফিফটি-ফিফটি’ নির্ভর করবে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে জয়ের পর তারেক রহমানকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণের কথা উল্লেখ করেছে। মোদি ছিলেন প্রথম দিকের বিশ্বনেতাদের একজন, যিনি তাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। এই দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণকে ব্রিকসের আমন্ত্রণ থেকে আলাদা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরীয় আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের (BIMSTEC) চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আঞ্চলিক সংগঠনের প্রধানদের আমন্ত্রণ জানানোর প্রচলিত রীতির অংশ হিসেবেই এটি করা হয়।

১০ আগস্ট ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (র‌)-এর প্রধান পরাগ জৈন ঢাকায় এসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম শামসুল ইসলামের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকেও ঢাকার পরিবর্তিত মনোভাব স্পষ্ট ছিল বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। একই দিন সকালে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ৪৫ মিনিটের ওই বৈঠকে তারেক রহমান স্পষ্টভাবে জানান, শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করা না হলে তিনি ভারত সফর করবেন না—এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা।

সূত্রের দাবি, ত্রিবেদী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের সুযোগ সীমাহীন এবং ভারত সম্পর্ক পুনর্গঠনে কোনো চেষ্টাই বাদ দেবে না। কিন্তু তারেক রহমান নিজের অবস্থানে অনড় ছিলেন। পরে সাংবাদিকদের কাছে ত্রিবেদী বৈঠকটিকে দুই দেশের সম্পর্ককে ‘ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যতমুখী’ পথে নেওয়ার ভারতের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফরের অপেক্ষায় রয়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে এমন কোনো সমস্যা নেই, যার সমাধান করা সম্ভব নয়।

দিল্লিতে গত কয়েক দিনে ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ঢাকার পরিবর্তিত অবস্থান সম্পর্কে অবহিত করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে তিনি দুই দেশের সম্পর্ককে প্রকাশ্যে ‘বহুমাত্রিক ও দীর্ঘস্থায়ী’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। দ্য ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়,ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে মোদি নিজে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এই নতুন ‘লুক ইস্ট’ উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ। ফলে তারেক রহমানের কঠোর অবস্থান দিল্লির কাছে কিছুটা আকস্মিক বলেই মনে হচ্ছে।

বর্তমানে দুই পক্ষই নিজেদের কঠোর অবস্থান কিছুটা নমনীয় করার চেষ্টা করছে। কারণ দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে উভয় দেশই একে অপরের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন। তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর মালয়েশিয়া ও চীন—এই দুই সফরও ভারত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। শেখ হাসিনার প্রসঙ্গে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলেছে, শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা এবং ভারতের পুরোনো ও বিশ্বস্ত বন্ধুর সন্তান হিসেবে ভারত তাকে পরিত্যাগ করতে পারে না। বিশেষ করে জীবনে দ্বিতীয়বারের মতো তিনি ভারতে আশ্রয় চেয়েছেন। তবে সূত্রগুলো স্বীকার করেছে, হাসিনার ৫ আগস্টের সংবাদ সম্মেলন দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টায় বড় বাধা তৈরি করেছে। সূত্রগুলো আরও বলেছে, ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তের নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কেবল একটি বন্ধুত্বপূর্ণ বাংলাদেশই তা নিশ্চিত করতে পারে।