দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে চোরাচালান ও শুল্ক ফাঁকি প্রতিরোধে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের (সিআইআইডি) তৎপরতা জোরদার হয়েছে। আগস্টের প্রথম তিন সপ্তাহে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও বেনাপোল সীমান্তসহ বিভিন্ন কাস্টমস স্টেশনে পরিচালিত অভিযানে বিপুল পরিমাণ সোনা, বিদেশি সিগারেট, আইফোন, মূল্যবান প্রসাধনী ও মদ জব্দ করা হয়েছে। যাত্রী প্রোফাইলিং, গোপন গোয়েন্দা তথ্য ও শিফটভিত্তিক নিবিড় নজরদারির মাধ্যমে চোরাচালানকারীদের নানা অভিনব কৌশল নস্যাৎ করছেন রাজস্ব কর্মকর্তারা। কাস্টমস গোয়েন্দাদের এসব অভিযানের ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে জাতীয় অর্থনীতিতে; পাশাপাশি বৈধ পথে ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রবাসী আয় আনতে নাগরিকদের উৎসাহ বাড়ছে।
এনবিআরের তথ্য অনুসারে আগস্টের প্রথম তিন সপ্তাহে দেখা যায়, প্রায় ১৫ কোটিরও বেশি টাকার পণ্য জব্দ করা হয়। এর মধ্যে বড় একক অভিযান হয় চট্টগ্রামে শাহ আমানত বিমানবন্দরে দুবাইফেরত ফ্লাইট থেকে ১,৮০২ কার্টন সিগারেট ও ১৩টি আইফোন উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া যাত্রীর অন্তর্বাসে লুকানো পেস্ট ও বারসহ বিভিন্ন অভিযানে কয়েক কেজি সোনা আটক করা হয়। চট্টগ্রাম ও ঢাকায় মিথ্যা ঘোষণার পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক ও জরিমানা আদায়ও বেড়েছে।
অন্তর্বাসে সোনা ও ট্রলিতে গোপন পকেট, অভিনব কৌশলেও রেহাই নেই
কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে চোরাচালানকারীরা সোনা ও মূল্যবান পণ্য পাচারে নানা জটিল ও অভিনব কৌশল ব্যবহার করছে। তবে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার থাকায় তাদের এসব অপচেষ্টা একের পর এক ব্যর্থ হচ্ছে। গত ১৭ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুবাইফেরত এক যাত্রীর কাছ থেকে ৮৮১ গ্রাম সোনা পেস্ট জব্দ করা হয়। এর আগে ৩ আগস্ট চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভারতীয় ও বাংলাদেশি দুই যাত্রীর অন্তর্বাস থেকে মোট ১ হাজার ৫০০ গ্রাম সোনা পেস্ট উদ্ধার করা হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা। এছাড়া ১৫ আগস্ট শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইনসের এক যাত্রীর ট্রলির গোপন চেম্বার থেকে ১৩৩ গ্রাম সোনা ও লুকানো ২ হাজার ৫৮৯ পিস ওষুধ জব্দ করা হয়। অন্যদিকে, ৫ আগস্ট বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচারের সময় প্যান্টের পকেটে লুকিয়ে রাখা ১০০ গ্রাম সোনা উদ্ধার করেন কাস্টমস কর্মকর্তারা।
ইতিহাস গড়া চট্টগ্রাম অভিযান
গত ১৭ আগস্ট চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক সময়ের বড় সিগারেটের চালান আটক করে সিআইআইডি। দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ইএ১৪৮ ফ্লাইটে নজরদারি চালানো হয়। ফ্লাইটে তিন যাত্রীর কাছ থেকে ৭৮২ কার্টন প্ল্যাটিনাম ও মন্ড সিগারেট এবং ১৩টি আইফোন উদ্ধার হয়। একই ফ্লাইটের ২ নম্বর ব্যাগেজ বেল্টের একটি পরিত্যক্ত ব্যাগেজে মেলে আরও ১ হাজার ২০ কার্টন সিগারেট। শুধু এই একক চালানেই শুল্ক-করসহ আটক পণ্যের মূল্য দাঁড়ায় ৫ কোটি ৫৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
বিউটি ক্রিম, বিদেশি মদ ও প্রসাধনীর লাগাতার চালান জব্দ
আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা থাকা ও উচ্চ কর এড়াতে বিভিন্ন ফ্লাইটে নিষিদ্ধ ক্ষতিকর বিউটি ক্রিম, প্রসাধন সামগ্রী ও মদ আনার প্রবণতা দেখা গেছে। গত ১৭ আগস্ট বিমানবন্দরে ফরেন পোস্ট অফিসে অভিযান চালিয়ে ৩১৯ কেজি নিষিদ্ধ বিউটি ক্রিম উদ্ধার করা হয়। গত ২০ ও ২১ আগস্ট পৃথক অভিযানে শত শত কেজি নিষিদ্ধ গৌরি ক্রিম, ভ্যাপ লিকুইড, মিল্ক পাউডার ও একাধিক আইফোন উদ্ধার হয়। গত ১২ ও ১৫ আগস্ট এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটে আগত একাধিক যাত্রীর লাগেজ থেকে দামি ব্র্যান্ডের বিপুল পরিমাণ মদ আটক হয়।
মিথ্যা ঘোষণার আড়ালে রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা নস্যাৎ
গত ৪ আগস্ট চট্টগ্রামের কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি) আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সুলতানা করপোরেশনের একটি চালানে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে শুল্ক ফাঁকির বড় ধরনের অপচেষ্টা শনাক্ত করে। এ ঘটনায় অতিরিক্ত রাজস্ব ও জরিমানা বাবদ ৭১ লাখ ৭২ হাজার ৬০৬ টাকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব জানান, শুল্ক খাতে যথাযথ শুল্কায়ন নিশ্চিত, দ্রুত পণ্য খালাস, বকেয়া রাজস্ব আদায় ও মামলা নিষ্পত্তি, বন্ডের অপব্যবহার রোধ এবং সব ধরনের চোরাচালান ঠেকাতে গোয়েন্দা ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করা হচ্ছে। পাশাপাশি নিলাম কার্যক্রমও আরও গতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সাড়ে ৫ হাজার ডলারের ঘোষণায় মিলল পৌনে ২ কোটি টাকার পণ্য
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ারফ্রেইট এলাকায় মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা শনাক্ত করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। কর ফাঁকির উদ্দেশ্যে নামমাত্র মূল্য দেখিয়ে আনা দুটি পৃথক চালানে কায়িক পরীক্ষা চালিয়ে প্রায় ২ কোটি ৭ লাখ টাকা মূল্যের বিপুল পরিমাণ ল্যাপটপ, ট্যাবলেট, আইপ্যাড ও গাড়ির যন্ত্রাংশ আটক করা হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সরদার গ্লোবাল ট্রেড নামের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এবং তাদের খালাসকারী প্রতিনিধি ফাহিম ফাইভ স্টার লিমিটেডের মাধ্যমে পণ্যগুলো দেশে আনা হয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ১৩ আগস্ট চালান দুটির খালাস কার্যক্রম স্থগিত করা হয় এবং ২৩ আগস্ট প্রতিনিধিদলের উপস্থিতিতে পণ্যগুলোর কায়িক পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। চালান দুটিতে সম্মিলিতভাবে পণ্যের আমদানি মূল্য মাত্র সাড়ে ৫ হাজার মার্কিন ডলার ঘোষণা করা হয়েছিল।
