বিদেশি বিনিয়োগে উগান্ডা-ঘানার পেছনে বাংলাদেশ

আঙ্কটাড

দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি জিডিপি থাকা সত্ত্বেও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। আফ্রিকার তুলনামূলক ছোট অর্থনীতির দেশ উগান্ডা ও ঘানার চেয়েও এ ক্ষেত্রে দেশের অবস্থান দুর্বল। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাডের ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬’-এ এই হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

সোমবার (৭ জুলাই) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছে মাত্র ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। অথচ একই সময়ে আফ্রিকার উগান্ডা পেয়েছে ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার এবং ঘানা ও ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (ডিআর কঙ্গো) প্রত্যেকে ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার করে বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদভিত্তিক বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ পাওয়ায় আফ্রিকার দেশগুলো এগিয়ে থাকলেও বাংলাদেশ উৎপাদন ও সেবা খাতে উল্লেখযোগ্য বিদেশি বিনিয়োগ টানতে হিমশিম খাচ্ছে।

প্রবৃদ্ধিতে শীর্ষে থাকলেও তলানিতে অবদান

বিনিয়োগের পরিমাণে পিছিয়ে থাকলেও ২০২৫ সালে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এফডিআই প্রবৃদ্ধিতে শীর্ষে ছিল বাংলাদেশ। ২০২৪ সালের ১২৩ কোটি ডলারের তুলনায় ২০২৫ সালে বিনিয়োগ বেড়েছে ৪৫ শতাংশ। তবে এই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিও দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য পর্যাপ্ত নয়। প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশের মোট স্থাবর মূলধন গঠনের (জিএফসিএফ) মাত্র ১.৪ শতাংশ আসছে বিদেশি বিনিয়োগ থেকে। এর অর্থ হলো, দেশের বিনিয়োগের বিশাল অংশ এখনো অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর নির্ভরশীল।

অন্যদিকে, নতুন বা ‘স্ক্র্যাচ থেকে’ শুরু হওয়া গ্রিনফিল্ড প্রকল্পের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৪ সালে এসব প্রকল্পের মূল্য ছিল ১ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালে ২২ দশমিক ৯ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি নতুন বিনিয়োগে বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহের ইঙ্গিত বহন করে। এদিকে, দেশীয় কোম্পানিগুলোর বিদেশে বিনিয়োগ কিছুটা বেড়েছে। ২০২৪ সালে যেখানে এ পরিমাণ ছিল ১৫ মিলিয়ন ডলার, ২০২৫ সালে তা ৭২ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২৫ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বর্তমানে দেশে মোট এফডিআই স্টক দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৯ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। আঙ্কটাডের এই তথ্যের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানেরও মিল পাওয়া গেছে।

কেন এগিয়ে যাচ্ছে আফ্রিকা?

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘানা, উগান্ডা এবং কঙ্গোর এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে রয়েছে বড় ধরনের নীতি সংস্কার। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর ঘানার প্রেসিডেন্ট জন মাহামা খরচ কমাতে এবং অভ্যন্তরীণ বাজার চাঙ্গা করতে বেশ কিছু কর বাতিল করেন। পাশাপাশি স্বর্ণ কেনার জন্য সরকারি সংস্থা গঠন করে দেশের রিজার্ভ শক্তিশালী করেন। ব্লুমবার্গের তথ্যমতে, দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতি ২১ শতাংশ থেকে কমে ৩.৪ শতাংশে নেমেছে এবং রিজার্ভ ১১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ঘানা ‘ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন অথরিটি (জিআইপিএ) অ্যাক্ট ২০২৬’ পাস করে বিদেশি বিনিয়োগের ন্যূনতম মূলধনের শর্ত তুলে দিয়েছে এবং ডিজিটাল ও শিল্পায়ন প্রক্রিয়া সহজতর করেছে। উগান্ডাও তাদের বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষকে ‘ওয়ান স্টপ সেন্টারে’ রূপান্তর করেছে এবং শিল্প পার্কগুলোতে বিশেষ সুবিধা প্রদান করছে। অন্যদিকে ডিআর কঙ্গো অবকাঠামো, বিদ্যুৎ খাতের উদারীকরণ এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার মাধ্যমে কোটি কোটি ডলারের বিনিয়োগ টানছে।

বিশ্ব বিনিয়োগ পরিস্থিতি

উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে এশিয়া অঞ্চল বিনিয়োগের প্রধান গন্তব্য হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। ২০২৫ সালে এই অঞ্চলে মোট ৬৪৪ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই এসেছে। তবে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এখন ডিজিটাল অবকাঠামো, সেমিকন্ডাক্টর এবং উন্নত ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের দিকে বেশি ঝুঁকছে। বিশ্বজুড়ে এফডিআই ৬ শতাংশ বেড়ে ১.৬ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা গত দুই বছরের পতন স্থগিতে ভূমিকা রেখেছে। তবে আঙ্কটাড সতর্ক করেছে যে, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, আঞ্চলিক সংঘাত এবং উচ্চ অর্থায়নের কারণে ২০২৬ সালের বৈশ্বিক বিনিয়োগ পরিস্থিতি অনিশ্চিত হতে পারে। বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র (২৭৭ বিলিয়ন ডলার)। এরপর শীর্ষ তালিকায় রয়েছে যথাক্রমে সিঙ্গাপুর (১৫১ বিলিয়ন ডলার), হংকং (১১৭ বিলিয়ন ডলার), চীন (১০৫ বিলিয়ন ডলার) এবং ব্রাজিল (৭৭ বিলিয়ন ডলার)।