প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক ১৫ বছরেও প্রবাসীবান্ধব হয়নি

দেড় দশক পেরিয়ে গেলেও বিশেষায়িত প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক এখনো পুরোপুরি প্রবাসীবান্ধব হতে পারেনি। রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় দেশে আনার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সক্ষমতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে ব্যাংকটি। একই সঙ্গে ১৫ বছরে যোগ্য জনবল ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতেও পিছিয়ে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। অন্যদিকে বৈদেশিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রবাসীদের জন্য ঋণ সুবিধা থাকলেও সেখানে নানা বাধা রয়েছে। মাঠপর্যায়ের গ্রাহকদের অভিযোগ, ঋণ নিতে গেলে দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া, অতিরিক্ত নথিপত্রের চাপ এবং দালালদের দৌরাত্ম্যের কারণে তারা কার্যত হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

প্রবাসী কর্মীদের ঋণ ও বিনিয়োগে সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ২০১১ সালে ১ হাজার কোটি টাকার মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। রেমিট্যান্স গ্রহণকে অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হলেও ১৫ বছরেও এই সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি ব্যাংকটি। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধি অনুযায়ী, রেমিট্যান্স গ্রহণের জন্য অথরাইজড ডিলার (এডি) লাইসেন্স, বৈদেশিক বাণিজ্যে অভিজ্ঞ জনবল, পূর্ণাঙ্গ করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থা, নস্ট্রো/ভস্ত্রো অ্যাকাউন্ট এবং সুইফট ব্যবস্থা থাকা বাধ্যতামূলক। তবে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক এখনো এসব শর্ত পূরণ করতে পারেনি। ফলে ২০১৮ সালে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করলেও তা বাতিল হয় এবং গ্রাহকরা এখনও অন্য ব্যাংক বা এক্সচেঞ্জ হাউসের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। যদিও সিলেট ও চট্টগ্রামে সীমিত অনুমতি পাওয়া গেলেও কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হয়নি। পরে সীমিত এডি লাইসেন্সের আওতায় ২০২২ সাল থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শুধু বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচা কার্যক্রম চালাচ্ছে ব্যাংকটি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেনের লাইসেন্স পেতে হলে প্রশিক্ষিত জনবল, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো এবং পর্যাপ্ত ব্যবসায়িক সক্ষমতা থাকতে হয়। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক এসব শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। সম্প্রতি ব্যাংকটি বাংলাদেশ অটোমেটেড ক্লিয়ারিং হাউজে (বিএসিএইচ) যুক্ত হতে আবেদন করেছে। এতে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের মাধ্যমে ব্যাংক-টু-ব্যাংক লেনদেন সহজ হবে এবং পরোক্ষভাবে রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনায় কিছু সক্ষমতা বাড়তে পারে।

সূত্রমতে, ২০২৩ সালে সোনালী ব্যাংক এবং পরের বছর সিটি ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স আনার ব্যবস্থা করে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। এর আগে অগ্রণী, এনসিসি ও কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমেও রেমিট্যান্স গ্রহণের সুযোগ ছিল। সে হিসেবে বর্তমানে মোট পাঁচটি ব্যাংকের সহযোগিতায় রেমিট্যান্স আনতে পারে প্রতিষ্ঠানটি। বৈদেশিক লেনদেনের জন্য সুইফট, নস্ট্রো/ভস্ত্রো অ্যাকাউন্ট এবং কোর ব্যাংকিং সিস্টেমসহ বিভিন্ন অবকাঠামো থাকা প্রয়োজন। সুইফট নেটওয়ার্ক আন্তর্জাতিক পেমেন্ট বার্তা আদান-প্রদানের সুবিধা দেয়, আর বিদেশি করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকে রাখা নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এ ধরনের অ্যাকাউন্ট চালু রাখতে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণও বাধ্যতামূলক। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ কোর ব্যাংকিং সিস্টেম (সিবিএস) চালু থাকলে নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট খোলার অনুমতি মেলে না। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে এখনো সিবিএস চালু হয়নি, ফলে নস্ট্রো অ্যাকাউন্টের জন্য আবেদন করার সুযোগও তৈরি হয়নি।

এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপক পরিচালক ওয়াহিদা বেগম বলেন, ‘নিজস্ব প্রক্রিয়ায় প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক রেমিট্যান্স গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএসিএইচ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও কারিগরি কার্যক্রম ইতোমধ্যেই সম্পন্ন করা হয়েছে। শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংক হতে অনুমোদন পাওয়া যাবে মর্মে আশা করা হচ্ছে।’ রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনায় অক্ষমতার পাশাপাশি প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ঋণ কার্যক্রম নিয়ে হয়রানির অভিযোগ করেছেন মাঠ পর্যায়ের গ্রাহকরা। দেশের বিভিন্ন জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঋণ নিতে দালালের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে, দিতে হচ্ছে ঘুষ, আর জটিল কাগজপত্রের কারণে বারবার ঘুরতে হচ্ছে। চাঁদপুরে অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে লাখে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা ঘুষ না দিলে ঋণ পাওয়া কঠিন। দালালচক্রের মাধ্যমে লেনদেন হয়, অফিসের কর্মকর্তারা সরাসরি দায় এড়িয়ে যান।

চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার ওয়ারুক গ্রামের তাছলিমা নামে এক গ্রাহক জানান, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়ে তিনি তার স্বামীকে বিদেশে পাঠান। তবে ঋণ পাওয়ার জন্য তাকে ১৪ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এছাড়া নীতিমালায় না থাকা অতিরিক্ত শর্ত, যেমন জমির দলিল, চাওয়ার কারণে অনেক প্রকৃত সুবিধাভোগী ঋণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলেও তিনি দাবি করেন। অন্যদিকে ঢাকার কাকরাইল শাখায় ঋণের জন্য আসা এক নারী অভিযোগ করেন, প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও তিন দিন ধরে শুধু আবেদন জমা দেওয়ার জন্য তাকে ঘুরতে হয়েছে। একই শাখায় ঋণের জন্য আসা রাজধানীর হাজারীবাগের শাহালম, যিনি শ্রমিক হিসেবে কুয়েতে যেতে চান, জানান, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। তার ভাষায়, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বারবার চাওয়া হচ্ছে এবং ঋণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল ও অনিশ্চিত।

অন্যদিকে ফেনী ও হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় গ্রাহকরা বলছেন, ঋণ পেতে দুই মাস পর্যন্ত সময় লাগছে, যা বিদেশযাত্রার বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ‎ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার আমজাদ হাট ইউনিয়নের উত্তর ধর্মপুরের বাসিন্দা সৌদি আরব প্রবাসী সামছুর আলম বলেন, ‘ঋণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত যাতায়াত ও আনুষঙ্গিক খরচ হয় এবং পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে প্রায় দুই মাস সময় লাগে। অথচ সাধারণত বিদেশে যাওয়ার মাত্র ১০ দিন আগে ঋণের টাকা প্রদান করা হয়, যা বাস্তব প্রয়োজনে অত্যন্ত অপ্রতুল।’

‎অভিযোগের বিষয়ে ফেনী ব্রাঞ্চ ম্যানেজার মো. শরিফুল হক বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যদি কোনো প্রবাসী যেতে চান, তাকে আমরা এক লাখ থেকে তিন লাখ টাকা সর্বোচ্চ ঋণ দিয়ে থাকি। দক্ষিণ কোরিয়া জাপানসহ অন্যান্য দেশে যদি কেউ যায় আমরা তাকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিয়ে থাকি। তবে এজন্য একজন গ্যারান্টার প্রয়োজন হয়, যার মাসে ইনকাম অন্তত ৪০ হাজার টাকা। অনেক সময় আমাদের গ্রাহকরা গ্যারান্টার জোগাড় করতে পারেন না। তখন আমরা তাদেরকে ঋণ দেই না। কেউ কেউ এটাকে হ্যাসেল মনে করে।’

সিলেটের বৃন্দাবন সরকারি কলেজের গণিত বিভাগে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করা শিক্ষার্থী ইমা চৌধুরী। ইংল্যান্ডে ওয়ার্ক পারমিট ভিসা পেলেও প্রচুর অর্থ সংকটে পড়েন তিনি। তিনি দ্বারস্থ হন হবিগঞ্জের প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের। তিনি ১০ লাখ টাকার জন্য আবেদন করতে চাইলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এত টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে কোন উপায় না পেয়ে উচ্চ সুদে বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমান। সৌদি আরবে কাজের ভিসা পাওয়া হবিগঞ্জের তানহার চৌধুরী বলেন, ‘তিন লাখ টাকা ঋণ পাওয়ার ৫ এপ্রিল তিনি আবেদন করেন। তাকে মে মাসের ৫ তারিখে যোগাযোগ করার জন্য বলা হয়েছে। তবে এক লাখ টাকা বেশি পাওয়া যাবে না। তিনি বলেন, ‘সঠিক সময়ে টাকা না পেলে উচ্চসুদে মহাজনদের কাছে থেকে ঋণ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।’

নীতিমালা অনুযায়ী, এক থেকে তিন লাখ টাকার ঋণ সাত কর্মদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তি হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে সময় লাগছে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস। আবার জামিনদার সংক্রান্ত কঠোর শর্ত, অতিরিক্ত নথি এবং সীমিত ঋণ কোটার কারণে অনেক আবেদনই বাতিল হচ্ছে। অভিযোগের বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের হবিগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান খান জানান, অতিরিক্ত ফাইলের চাপ এবং চরম জনবল সংকটের কারণে গ্রাহকদের সময়মতো সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। শাখাটি একটি বড় জেলার একমাত্র শাখা হওয়ায় পুরোনো এবং নতুন আবেদনকারীর ভিড় সবসময় লেগেই থাকে। ফলে সীমিত কর্মী দিয়ে এই বিশাল চাপের মোকাবিলা করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

সরকারি গ্যারান্টির বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রি-ফাইন্যান্স তহবিল থেকে কম সুদে ঋণ নিয়ে তা বেশি সুদে বিতরণের অভিযোগও রয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকটির মোট ঋণের পরিমাণ ৩,১৭৯ কোটি টাকা, যার মধ্যে ১৩ শতাংশের বেশি খেলাপি। প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে ২১০ কোটি টাকা। ব্যাংকটি আমানত গ্রহণ করে না; বিশেষ তহবিলের ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়। ফলে একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ব্যাংকের মতো আর্থিক সক্ষমতা গড়ে ওঠেনি।

এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের এমডি ওয়াহিদা বেগম বলেন, ‘প্রবাসগামী কর্মীদের সরলতার সুযোগ নিয়ে, প্রতারক চক্র বা দালাল চক্র যাতে গ্রাহকদের প্রতারিত করতে না পারে সে জন্য প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক কর্তৃক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অনলাইনে ঋন আবেদন, ডিজিটাল মাধ্যমে ঋণের কিস্তি পরিশোধ, প্রধান কার্যালয়ের নিবিড় মনিটরিং, অভিযোগ আসলে তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে।

প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন বলেন, ‘আমরা যেকোনো ব্যাংকের অথোরাইজড ডিলার (এডি) লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে নীতিমালায় দেয়া শর্তগুলো যাচাই করি। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক শর্ত পূরণ করতে পারেনি। তাই তাকে লাইসেন্স দেওয়া হয়নি। সাধারণত এই লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে রেমিট্যান্স নেওয়ার মতো যোগ্যতা সম্পূর্ণ জনবল আছে কিনা তা দেখা হয়। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে এমন লোক ছিল না। বিএসিএইচের জন্য আবেদন করা হলে সক্ষমতা বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমতি দেবে। শর্তপূরণ করতে পারলে বাংলাদেশ ব্যাংক আটকায় না।’