দেড় বছরে সরকারের ঋণ বেড়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা

অর্থ মন্ত্রণালয়–এর প্রকাশিত হালনাগাদ ঋণ বুলেটিন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন থেকে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় দেড় বছরে সরকারের মোট ঋণ বেড়েছে ৩ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা। এ সময়ের বেশিরভাগ সময়জুড়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস–এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বে থাকলেও উন্নয়ন ব্যয় কম থাকা সত্ত্বেও ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়নি। বুলেটিনে উল্লেখ করা হয়, গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশি-বিদেশি মিলিয়ে মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৬ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালের জুন শেষে ছিল ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। এছাড়া ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ঋণের পরিমাণ ছিল ১৯ লাখ ৪৪ হাজার ১৭১ কোটি টাকা, অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সরকারের ঋণ বেড়েছে ২ লাখ ৬২ হাজার ২৯১ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার মেগা প্রকল্প থেকে সরে আসার পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে উন্নয়ন ব্যয় ব্যাপকভাবে কমালেও ঋণনির্ভরতা কমাতে পারেনি। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ করতে না পারা এবং আগের ঋণ পরিশোধের চাপের পাশাপাশি-পরিচালন ব্যয়ে লাগাম টানতে না পারায় ঋণ বাড়াতে হয়েছে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের সময় দেশের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আগের সরকারের পতনের আগে ওই বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত মোট ঋণ দাঁড়িয়েছিল ১৮ লাখ ৮৮ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা। হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত ঋণ বুলেটিনে দেশের মোট ঋণের পরিমাণ ১৮ লাখ ৩২ হাজার ২৮২ কোটি টাকা উল্লেখ ছিল। পরে বৈদেশিক ঋণকে নতুন বিনিময় হারে রূপান্তর করার কারণে এর পরিমাণ ৫৬ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা বেড়েছে।

সরকারের ঋণ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার অভ্যন্তরীণ ঋণের চেয়ে বৈদেশিক উৎস থেকে বেশি ঋণ নিয়েছে। এই সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের কিস্তি পাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে ঋণ নিয়েছে। গত অর্থবছরে সরকার ৩৪৪ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা নিয়েছে, আগের অর্থবছর এর পরিমাণ ছিল ২০০ কোটি ডলার। দেড় বছরে বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণের পরিমাণ আট লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৯ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। আগের সরকারের পতনের এক মাস আগে যেখানে অভ্যন্তরীণ ঋণ ছিল ১০ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা, তা গত ডিসেম্বর শেষে বেড়ে হয়েছে ১২ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা।

গত অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা, যা গত সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। তুলনায় ২০১৮–১৯ অর্থবছরে এডিপি ব্যয় ছিল ১ লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকা এবং ২০২৩–২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় ২ দশমিক ৫ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছায়। উন্নয়ন ব্যয় কমলেও ঋণ বৃদ্ধি থেমে থাকেনি। অর্থ বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার মূলত পুরোনো ঋণ পরিশোধ ও সংশ্লিষ্ট চাপ সামাল দিতেই নতুন ঋণ নিচ্ছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাধারণত রাজস্ব আয় দিয়ে পরিচালন ব্যয় মেটানো হয় এবং সেখান থেকে কিছু অর্থ উন্নয়ন খাতেও বরাদ্দ দেওয়া হয়; তবে বর্তমানে রাজস্ব আয় দিয়ে পরিচালন ব্যয়ই পুরোপুরি মেটানো যাচ্ছে না, যা উদ্বেগজনক। তার মতে, নব্বইয়ের দশকের পর এ ধরনের পরিস্থিতি আর দেখা যায়নি।

সুদ পরিশোধে ব্যয় বেড়েই চলেছে

কাঙ্ক্ষিত হারে রাজস্ব আয় না হওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, উন্নয়ন ব্যয়ের পাশাপাশি পরিচালন ব্যয়ের একটি অংশও ঋণ নিয়ে মেটাতে হচ্ছে। ফলে সরকারের ব্যয় নির্বাহে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে এবং এর প্রভাবে ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে ব্যয়ও ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে ঋণের সুদ এখন বাজেটের অন্যতম বড় খাতে পরিণত হয়েছে। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই সরকারের মোট ব্যয়ের প্রায় ২৬ শতাংশ, অর্থাৎ ৬৬ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা, ব্যয় হয়েছে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে। এর মধ্যে দেশীয় ঋণের সুদে ৫৬ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা এবং বিদেশি ঋণের সুদে ৯ হাজার ৯২৭ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। তুলনায়, গত অর্থবছরের একই সময়ে সুদ বাবদ ব্যয় ছিল ৬৪ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা, আর পুরো বছরে এ খাতে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা।