পাঁচ বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮% করার পরিকল্পনা

আগামী পাঁচ বছরে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছে সরকার, যার ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে অ্যাডভাইজরি কমিটি পাঁচ বছর মেয়াদি একটি নতুন অর্থনৈতিক কৌশল প্রণয়ন করেছে, যা আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে চূড়ান্ত করা হবে। বুধবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের পরিকল্পনা কমিশনের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত কমিটির প্রথম সভায় ‘বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়নে অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্নির্ধারণ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়।

অ্যাডভাইজরি কমিটির সভাপতি সাবেক পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের সভাপতিত্বে সভায় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল-মাহমুদ তিতুমীর, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ সাকি। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন কমিটির সদস্য সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, মোস্তাফিজুর রহমান, অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব উল্লাহ্, সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুরসহ কমিটির সদস্যরা। সভা সঞ্চালনা করেন জিইডির সচিব (সদস্য) ড. মনজুর হোসেন।

অর্থনৈতিক কৌশল প্রণয়নের খসড়া তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরে ৫ শতাংশ, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সাড়ে ৬ শতাংশ, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৭ শতাংশ, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে সাড়ে ৭ এবং ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চায় সরকার। কেবল সংখ্যা নয়, এই প্রবৃদ্ধি হবে প্রকৃত। সব শ্রেণির মানুষ যেন সুফল পায় সেদিকে সর্বোচ্চ নজর রাখা হবে। এদিকে কৌশলপত্রের খসড়ায় পর্যায়ক্রমে নেওয়া হয়েছে মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরার পরিকল্পনা। বলা হয়েছে, বর্তমানে ৮ শতাংশ থেকে আগামী অর্থবছরে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ, ২০২৭-২৮ এ সাড়ে ৬ শতাংশ, ২০২৮-২৯ এ গিয়ে সেটি কমে হবে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। কৌশলপত্রের শেষ সময়ে গিয়ে মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে এসে হবে ৫ শতাংশ।

এছাড়া বিনিয়োগ নির্ভর প্রবৃদ্ধি ও অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি করতে চায় সরকার। তাই বিনিয়োগ বাড়াতে নতুন কৌশলপত্রে ব্যাপক গুরুত্ব পাবে পরিবেশগত উন্নয়ন। মোট বিনিয়োগের লক্ষ্য ধরা হতে পারে ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ। যদিও আশা করা হচ্ছে, বর্তমানে অর্থবছরে সেটি হবে ৩০ শতাংশ। এছাড়া আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৩৫ দশমিক ১ শতাংশ, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে গিয়ে সেটি বেড়ে দাঁড়াবে ৩৬ শতাংশে।

সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে রাশেদ আল-মাহমুদ তিতুমীর জানান, অতীতের মতো কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ পরিকল্পনা নয়, বরং সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন পদ্ধতি ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে নতুন অর্থনৈতিক কৌশল প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে সরকার। তিনি বলেন, আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে কৌশলপত্রটি চূড়ান্ত করা হবে। তাঁর মতে, আগের অনেক পরিকল্পনায় বাস্তবায়নের স্পষ্ট দিকনির্দেশনা ছিল না, ফলে সেগুলো কার্যকর হয়নি। নতুন কৌশলে শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ নয়, বরং বাস্তবায়ন পদ্ধতি, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং জনগণের কাছে অগ্রগতি তুলে ধরার ব্যবস্থা রাখা হবে। তিনি আরও বলেন, সরকার এমন একটি কাঠামো গড়ে তুলতে চায় যেখানে প্রতিটি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন কৌশল পরিষ্কার থাকবে এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে সবার প্রয়োজন ও চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে এবং জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।

অর্থনৈতিক সংকটের বিষয়ে উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান সরকার সংকটকে সম্ভাবনায় রূপান্তরের নীতি নিয়ে এগোতে চায়। তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে হঠাৎ মূল্য সমন্বয় করলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়তে পারে, তাই ধাপে ধাপে সমন্বয়ের পথে এগোনোর কথা ভাবা হচ্ছে। এছাড়া ভবিষ্যতে যেকোনো সংকট মোকাবিলায় খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ‘কৌশলগত মজুত’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।