আইএমএফের চাপে উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্য নির্ধারণ

২০২৬-২৭ অর্থবছর

আগামী অর্থবছরের বাজেটে সরকার উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। রাজস্ব আদায়ে ধারাবাহিক ব্যর্থতার মধ্যেও এত বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করায় অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। তবে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচির শর্ত পূরণের অংশ হিসেবেই রাজস্ব লক্ষ্য বাড়ানো হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৪১ হাজার কোটি টাকা বেশি।

সরকারের আর্থিক, মুদ্রা ও মুদ্রা বিনিময় হার বিষয়ক কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের সাম্প্রতিক বৈঠকে এই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে দেশের সাম্প্রতিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয় এবং আগামী তিন অর্থবছরের মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক কাঠামোর সম্ভাব্য প্রক্ষেপণ নিয়েও আলোচনা হয়। সভায় অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তাদের মতে, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০ দশমিক ১৭ শতাংশ রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে কর খাত থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আয় ধরা হয়েছে, যা চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ১ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা বেশি।

চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে কর খাতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। তবে অর্থবছরের প্রথম আট মাসে আদায় হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৫০ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা। ফলে চার মাস বাকি থাকলেও লক্ষ্যমাত্রার প্রায় অর্ধেক আদায় এখনও অনিশ্চিত। অন্যদিকে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন কর খাতে সবচেয়ে বড় অংশ আসবে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) থেকে। এই খাত থেকে ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা মোট কর আয়ের একটি বড় অংশ হিসেবে ধরা হচ্ছে। পাশাপাশি আয়কর খাতে ২ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা, শুল্ক বিভাগে ৬৭ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য কর খাতে ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

কর আয়ের পাশাপাশি কর-বহির্ভূত রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রেও কিছুটা বৃদ্ধি ধরা হয়েছে। আগামী অর্থবছরের জন্য কর-বহির্ভূত রাজস্বের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এই খাতের লক্ষ্য ছিল ১৯ হাজার কোটি টাকা, যা পরে সংশোধন করে ২০ হাজার কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কর-বহির্ভূত রাজস্বের প্রকৃত আদায় হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা। ফলে এই খাতেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

অন্যদিকে কর-বহির্ভূত রাজস্ব বা এনটিআর খাতের জন্য আগামী অর্থবছরে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৬ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এই খাতের লক্ষ্য ছিল ৪৬ হাজার কোটি টাকা। পরে সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৬৫ হাজার কোটি টাকা করা হয়। চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এনটিআর খাতে প্রকৃত আদায় হয়েছে ৩৭ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরের বাকি সময়ের ওপরই নির্ভর করছে চূড়ান্ত অর্জনের পরিমাণ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের মোট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। পরে সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রকৃত আদায় হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৯৩ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা। এই পরিস্থিতির মধ্যেই সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। তবে বর্তমান বাস্তবতায় এই লক্ষ্য অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রাজস্ব আয়ের এই উচ্চলক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পেছনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণ কর্মসূচির শর্ত বড় ভূমিকা রেখেছে। মূলত আইএমএফের চলমান ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। গত কয়েক বছরে রাজস্ব লক্ষ্যপূরণে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। ফলে সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে আইএমএফ।

ব্যবসায়ী মহলের মতে, বর্তমান বিনিয়োগ পরিবেশে অনিশ্চয়তা ক্রমেই বাড়ছে। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় ধরনের বিনিয়োগেই ধীরগতি দেখা যাচ্ছে, ফলে উৎপাদন কার্যক্রম সম্প্রসারণের গতি কমে যেতে পারে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়বে রাজস্ব আহরণের ওপর। বিশেষ করে শিল্প খাতে সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি হওয়া চাপ অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাবে কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে কার্যক্রম বন্ধ করেছে, আবার অনেক সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠান অর্থায়নের অভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শিল্প খাতে যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে, তার প্রভাব এখনও পুরোপুরি কাটেনি এবং অনেক উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় রয়েছেন। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তিতে জটিলতা বৃদ্ধি, সুদের হার বেড়ে যাওয়া এবং অর্থায়ন সংকট ব্যবসায়িক ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মতে, উৎপাদন ও বিনিয়োগের পরিবেশ শক্তিশালী না হলে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে, কারণ রাজস্ব আয়ের বড় অংশই আসে শিল্প ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম থেকে।