দৈনিক ব্যয় ২২ লাখ, আয় ১২ লাখ

কর্ণফুলী টানেল

কর্ণফুলী নদীর দুই পাড়ের সংযোগ স্থাপনের জন্য ব্যয়বহুল টানেল নির্মাণ করেছিল তৎকালীন হাসিনা সরকার। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত আগ্রহে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হলেও বর্তমানে সেখানে লক্ষ্যমাত্রার এক-চতুর্থাংশেরও কম যানবাহন চলাচল করছে। ফলে টানেলটির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও উঠে আসছে না এবং প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে। এতে বোঝা যায়, ভুল আর্থিক প্রক্ষেপণের ভিত্তিতেই টানেলটি নির্মাণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন (আইএমইডি) বিভাগের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গত ৩০ জুন প্রকাশিত ‘কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বহুলেন সড়ক টানেল নির্মাণ (২য় সংশোধিত) প্রকল্প’-এর প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষায় টানেলটির বিভিন্ন দুর্বলতা, ঝুঁকি এবং আর্থিক প্রক্ষেপণের অসংগতি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ প্রকল্পটি ২০১৫ সালের নভেম্বরে অনুমোদন করে তৎকালীন হাসিনা সরকার। সে সময় এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। ২০২০ সালের জুনে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কয়েক দফা মেয়াদ বাড়ানোর পর তা ২০২৪ সালের জুনে সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। এর মাঝে প্রকল্পটি ব্যয়ও বেড়েছে দুই দফা। দ্বিতীয় দফা বৃদ্ধির পর কর্ণফুলী টানেলের নির্মাণব্যয় দাঁড়ায় ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা। অর্থাৎ দুই দফায় প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে ২ হাজার ২৪৩ কোটি ৮ লাখ টাকা বা ২৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ। চীনের কঠিন শর্তের ঋণে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর ঠিকাদার হিসেবে কাজ করেছে চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি) লিমিটেড।

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যয়বহুল এ প্রকল্পটির পরিকল্পনাতেই ত্রুটিপূর্ণ আর্থিক প্রক্ষেপণ করা হয়েছিল। সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় যে ট্রাফিক ও রাজস্ব প্রক্ষেপণ দেখানো হয়েছিল, বাস্তবতার সঙ্গে তার বড় ধরনের অমিল রয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটির অভ্যন্তরীণ আয়ের হার (আইআরআর) ঋণাত্মক এবং এটি আর্থিকভাবে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ের নিচে অবস্থান করছে, ফলে টানেল পরিচালনায় বছরে প্রায় ৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। সমীক্ষা অনুযায়ী দৈনিক ১৭ হাজার ৩৭৫টি যান চলাচলের প্রত্যাশা থাকলেও বর্তমানে গড়ে মাত্র ৪ হাজার যানবাহন চলাচল করছে, যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ২৩ শতাংশ। উদ্বোধনের পর প্রথম তিন মাসে দৈনিক সাড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার যানবাহন চলাচল করলেও পরে তা কমে ৪ হাজারে নেমে আসে। ২০২৫ সালে যান চলাচল ২৮ হাজার ছাড়ানোর পূর্বাভাস থাকলেও বাস্তবে তা বাড়ার বদলে আরও কমে গেছে।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, যান চলাচল কম হওয়ায় টানেলটি থেকে প্রত্যাশিত আয়ও পাওয়া যাচ্ছে না। তবে এর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে নিয়মিতই ব্যয় হচ্ছে। বর্তমানে কর্ণফুলী টানেল পরিচালনায় দৈনিক ব্যয় ২২ লাখ টাকা। তবে এ থেকে দৈনিক টোল আদায় হয় গড়ে ১২ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতিদিন টানেল পরিচালনায় লোকসান যাচ্ছে ১০ লাখ টাকা। তবে ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ বিবেচনা করলে এ লোকসান আরও বাড়বে। মূলত টোল হার বেশি হওয়ায় টানেলের ব্যবহার বাড়ছে না বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। বর্তমানে টানেলটি যানবাহনের টোল হার কার-জিপ-পিকআপ ২০০ টাকা, মাইক্রোবাস ২৫০ টাকা, বাস (৩১ আসন বা এর কম) ৩০০ টাকা, বাস (৩২ আসন বা এর বেশি) ৪০০ টাকা, বাস (৩ এক্সেল) ৫০০ টাকা, ট্রাক (৫ টন পর্যন্ত) ৪০০ টাকা, ট্রাক (৫.০১ থেকে ৮ টন পর্যন্ত) ৫০০ টাকা, ট্রাক (৮.০১ থেকে ১১ টন পর্যন্ত) ৬০০ টাকা, ট্রাক/ট্রেইলার (৩ এক্সেল) ৮০০ টাকা, ট্রাক/ট্রেইলার (৪ এক্সেল) এক হাজার টাকা এবং ট্রাক/ট্রেইলার (৪ এক্সেলের অধিক) এক হাজার টাকা (প্রতি এক্সেল ২০০ টাকা)।

আইএমইডি জানিয়েছে, টোলের হার বেশি হওয়ায় অধিকাংশ যানবাহন বিকল্প সেতু বা রুট ব্যবহার করছে। বিশেষ করে পণ্যবাহী ও বাণিজ্যিক যানবাহন টানেলটি ব্যবহার করতে অনাগ্রহী। এ ছাড়া চট্টগ্রামের আনোয়ারা এলাকায় টানেল-সংশ্লিষ্ট শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চল, ফিডার সড়ক উন্নয়নসহ সামগ্রিক শিল্প ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নির্ধারিত সময়ে এগোয়নি, যা প্রকল্পটিকে আরও দুর্বল করে তুলছে। আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে এসব অবকাঠামোগত উন্নয়ন ত্বরান্বিত না হলে টানেলটি আর্থিকভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্প এলাকায় ৪৮৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত সার্ভিস এরিয়ার প্রয়োজনীয়তা ও প্রকল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে টানেল পরিচালনায় ব্যবহৃত বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, জেট ফ্যান এবং ইলেকট্রোমেকানিক্যাল ও আইটি সরঞ্জাম পুরোনো হয়ে গেলে বা প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হলে উচ্চ ব্যয় আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এজন্য আগাম রিপ্লেসমেন্ট তহবিল না থাকলে ভবিষ্যতে টানেল পরিচালনা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশীয় দক্ষ জনবলের অভাবে টানেল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিসিসিসি’র ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে, আর সেতু কর্তৃপক্ষের স্থায়ী জনবল কাঠামো এখনো অনুমোদিত হয়নি—যা ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে। এছাড়া টানেলের প্রবেশপথে ৪ শতাংশ ঢাল থাকায় যানবাহনের গতি বেড়ে দুর্ঘটনার সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।