তালিকাভুক্তির দুই বছরেই ঋণ খেলাপি টেকনো ড্রাগস

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির মাত্র দুই বছরের মাথায় বড় অঙ্কের ঋণ খেলাপিতে পড়েছে ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান টেকনো ড্রাগস পিএলসি। কোম্পানিটি ওয়ান ব্যাংকের ২০৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকার খেলাপি গ্রাহকে পরিণত হয়েছে। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় গাজীপুরে কোম্পানিটির প্রধান কারখানার জমি, স্থাপনা ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নিলামে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে ব্যাংকটি।

টেকনো ড্রাগসের আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির আগেই কোম্পানিটির ব্যবসায় বড় ধরনের ওঠানামা ছিল। ২০১৮-১৯ হিসাববছরে ২১৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা থাকা রাজস্ব ২০২১-২২ হিসাববছরে বেড়ে ৫০২ কোটি ৮৫ লাখ টাকায় উঠলেও আইপিও আবেদনের আগের অর্থবছর ২০২২-২৩ সালে তা কমে ২৭৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। একই সময়ে ২০২১-২২ হিসাববছরে ৪৭ কোটি ৯৮ লাখ টাকা নিট মুনাফা থেকে ২০২২-২৩ সালে তা কমে হয় ১৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। অন্যদিকে তালিকাভুক্তির আগেই বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কোম্পানিটির ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৬৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা।

আইপিওতে ১০০ কোটি টাকা সংগ্রহ

টেকনো ড্রাগস ২০২৪ সালে আইপিওর মাধ্যমে ১০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। চূড়ান্ত প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, এর মধ্যে ৩০ কোটি টাকা বা ৩০ শতাংশ ব্যাংকঋণ পরিশোধে ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল। আর ৬৭ কোটি টাকা বা ৬৭ শতাংশ নরসিংদী ও গাজীপুরের কারখানার যন্ত্রপাতি, বিএমআরই ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয়ের কথা ছিল। এর মধ্যে যন্ত্রপাতি ক্রয় ও স্থাপনে ২৭ কোটি, নরসিংদীর সতীরপাড়ায় বিএমআরইতে ২৫ কোটি এবং গাজীপুরের বি কে বাড়িতে ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণে ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। বাকি ৩ কোটি টাকা আইপিও-সংক্রান্ত ব্যয়ের জন্য নির্ধারণ করা হয়। প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, আইপিও তহবিল পাওয়ার ২৪ মাসের মধ্যে এসব অর্থ ব্যবহারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা ছিল।

কমেছে মুনাফা, বেড়েছে ঋণ

তালিকাভুক্তির বছর ২০২৩-২৪ হিসাববছরে টেকনো ড্রাগসের রাজস্ব ছিল ৩৬১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা এবং নিট মুনাফা ২৮ কোটি ৬ লাখ টাকা। পরের হিসাববছরে রাজস্ব কমে ৩৩৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা এবং নিট মুনাফা কমে ২৩ কোটি ২০ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। এ সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ২ টাকা ৯৪ পয়সা থেকে কমে ১ টাকা ৭৬ পয়সায় নেমে আসে। একই সময়ে দীর্ঘমেয়াদি ব্যাংকঋণ ২০২৪ সালের জুনে ১২১ কোটি ২১ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২০২৫ সালের জুনে ১৫৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের চলতি অংশ ছিল ৩৭ কোটি ৭২ লাখ টাকা এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণ ৬০ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ব্যবসায় মন্দার কারণ হিসেবে সরকারি টেন্ডার ও কার্যাদেশ কমে যাওয়া, কাঁচামাল ও ডলার-সংকট, গ্যাস-সংকট এবং ইউটিলিটি ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কথা জানিয়েছে।

ঋণ পুনর্গঠনে ৫০ কোটি টাকার বন্ড

ঋণের চাপ সামলাতে চলতি বছর নতুন করে বন্ড ছাড়ার উদ্যোগ নিয়েছে টেকনো ড্রাগস। ডিএসইর প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ ১৪ মে ২০২৬ তারিখে ৫০ কোটি টাকার পাঁচ বছর মেয়াদি কুপন বন্ড ইস্যুর সিদ্ধান্ত নেয়। এর ২৫ শতাংশ হবে রিডিমেবল এবং ৭৫ শতাংশ কনভার্টিবল। কোম্পানিটির ঋণ পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে এই বন্ড ইস্যুর প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এ জন্য শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনের পাশাপাশি বিএসইসির অনুমোদন প্রয়োজন। প্রস্তাবিত বন্ডের ইস্যু ম্যানেজার ও অ্যারেঞ্জার হিসেবে এমটিবি ক্যাপিটাল লিমিটেডকে নিয়োগের সিদ্ধান্তও জানানো হয়।

অর্থাৎ আইপিওর মাধ্যমে ১০০ কোটি টাকা সংগ্রহের দুই বছরের মধ্যে কোম্পানিকে আবারও ঋণ পুনর্গঠনের জন্য নতুন অর্থায়নের পথ খুঁজতে হচ্ছে। ঘোষিত লভ্যাংশ বিতরণে ব্যর্থ হওয়ায় কোম্পানিটির শেয়ার ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে চলে যায়। পরে ২০২৫ সালের জন্য ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ বিতরণের তথ্য দেওয়ায় ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে শেয়ারটি আবার ‘এ’ ক্যাটাগরিতে ফেরানোর ঘোষণা দেয় ডিএসই।

এবার কারখানাই নিলামে

ওয়ান ব্যাংকের ১১ সেপ্টেম্বরের নিলাম বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, টেকনো ড্রাগসের কাছে ব্যাংকের পাওনা ২০৩ কোটি ৪৭ লাখ ৪২ হাজার ৯৭২ টাকা। ঋণ পরিশোধের জন্য একাধিকবার তাগাদা দেওয়ার পরও অর্থ পরিশোধ না করায় প্রতিষ্ঠানটি খেলাপি ঋণগ্রহীতায় পরিণত হয়েছে। ২০১৭ সালের ২৮ ডিসেম্বরের বন্ধকী দলিলের মাধ্যমে কোম্পানির সম্পত্তি ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখা হয়েছিল।

নিলামের আওতায় রয়েছে গাজীপুরের কারখানার জমি, স্থাপনা এবং বিভিন্ন উৎপাদন ও প্যাকেজিং যন্ত্রপাতি। ফলে ঋণসংকট এখন শুধু আর্থিক বিবরণীর বিষয় নয়; কোম্পানির উৎপাদন সক্ষমতার ওপরও এর সরাসরি প্রভাব পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। টেকনো ড্রাগসের চূড়ান্ত প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, স্পন্সর, পরিচালক এবং ১০ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ারধারীদের শেয়ারে তিন বছরের লক-ইন রয়েছে। কোম্পানির পাঁচ পরিচালক ও স্পন্সরের শেয়ারের ওপরও তিন বছরের লক-ইন প্রযোজ্য। এই লক-ইন ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত থাকার কথা।

এসব বিষয়ে কোম্পানির বক্তব্য জানতে টেকনো ড্রাগসের কোম্পানি সচিব এস এম আবু তালহা সিদ্দিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন কেটে দেন। ফলে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র বলেন, টেকনো ড্রাগসের বিষয়টি কমিশনের নজরে এসেছে। এ বিষয়ে খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।