বিলাসবহুল গাড়ির চেয়েও মাল্টায় শুল্ক-কর বেশি

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ইলন মাস্কের বৈদ্যুতিক গাড়ি টেসলা আমদানি হয়েছে সাতটি। বছরভেদে এসব গাড়িতে ৮৯ থেকে ৯২ শতাংশ শুল্ক–কর দিতে হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ৫০ হাজার ডলার মূল্যের একটি টেসলা আমদানি করলে সর্বোচ্চ শুল্ক–করভার হবে ৮০ শতাংশ। আর ২৫ হাজার ডলারের বিওয়াইডি বা একই শ্রেণির বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে তা ৬৪ শতাংশ। অন্যদিকে, গত ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার কমলাপুর আইসিডি থেকে ২০২৬ সালে তৈরি তিনটি মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ি খালাস করেছে র‌্যানকন মোটরস লিমিটেড। ১ হাজার ৯৯৯ সিসির প্লাগ-ইন হাইব্রিড প্রতিটি গাড়ির বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এসব গাড়ি আমদানিতে মোট ৯৬ দশমিক ১০ শতাংশ হারে শুল্ক–কর দিতে হয়েছে।

অথচ ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর পথ্য হিসেবে ব্যবহৃত ফল মাল্টা আমদানিতে শুল্ক–করভার এর চেয়েও বেশি, ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। শুধু টেসলা বা মার্সিডিজ নয়, চলতি অর্থবছরের ট্যারিফ অনুযায়ী অন্তত ১৪৬টি এইচএস কোডভুক্ত গাড়ি আমদানিতে শুল্ক–করের হার মাল্টার চেয়ে কম। বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক তৌহিদুল আলম বলেন, বিশ্বের কোথাও ফল আমদানিতে এত বেশি শুল্ক–কর নেই। বাংলাদেশে মাল্টাসহ তাজা ফলে গাড়ির চেয়েও বেশি শুল্ক–কর দিতে হচ্ছে।

সম্প্রতি আমদানি কমে যাওয়ায় খুচরা বাজারে মাল্টার দাম কেজিপ্রতি ৪৮০ থেকে ৫২০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। অথচ আমদানি পর্যায়ে প্রতি কেজির দাম ছিল প্রায় ৮৭ টাকা। সেই ৮৭ টাকার মাল্টার জন্যই শুল্ক–কর দিতে হয়েছে প্রায় ১০৭ টাকা। এতে মাল্টার উচ্চ শুল্ক–করহার নতুন করে আলোচনায় আসে। অবশ্য বাজারে সরবরাহ বাড়ার পর মাল্টার দাম কেজিপ্রতি ৪০০ টাকায় নেমে এসেছে।

মাল্টায় এত শুল্ক–কর কেন

দুই দশক আগে ২০০৬–০৭ অর্থবছরে মাল্টা আমদানিতে মোট করভার ছিল ৫৯ দশমিক ২৫ শতাংশ। তখন প্রতি কেজি মাল্টায় শুল্ক–কর পড়ত প্রায় ১২ টাকা। এরপর ধাপে ধাপে করভার বেড়েছে। ২০২১–২২ অর্থবছর পর্যন্ত তা বেড়ে ৮৯ দশমিক ৩২ শতাংশে দাঁড়ায়। সে সময় প্রতি কেজিতে শুল্ক–কর দিতে হতো প্রায় ৩৮ টাকা। বড় পরিবর্তন আসে ২০২২ সালের মে মাসে। ডলার–সংকটের মধ্যে আমদানি নিরুৎসাহিত করতে ফলের ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ করা হয়। এতে মাল্টার মোট শুল্ক–করভার বেড়ে প্রায় ১১৪ শতাংশে ওঠে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে করভার আরও বাড়িয়ে ১৩৬ শতাংশ করা হয়। এর প্রতিবাদে আন্দোলন করেন ফল আমদানিকারকেরা। পরে ২০২৫ সালের মার্চে বাড়তি শুল্ক–কর কিছুটা কমানো হয়। ২০২৫–২৬ অর্থবছর থেকে মাল্টার মোট শুল্ক–করভার ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়, যা এখনো বহাল রয়েছে।

একদিকে মাল্টাসহ তাজা ফলের করভার বাড়ানো হয়েছে, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব প্লাগ-ইন হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়িতে শুল্ক–করের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ফলে কোনো কোনো বৈদ্যুতিক গাড়ির করভার এখন মাল্টার প্রায় অর্ধেক। দুই দশক আগে ২০০৬–০৭ অর্থবছরে মাল্টা আমদানিতে মোট করভার ছিল ৫৯ দশমিক ২৫ শতাংশ। তখন প্রতি কেজি মাল্টায় শুল্ক–কর পড়ত প্রায় ১২ টাকা। এরপর ধাপে ধাপে করভার বেড়েছে। ২০২১–২২ অর্থবছর পর্যন্ত তা ছিল ৮৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। সে সময় প্রতি কেজিতে শুল্ক–কর দিতে হতো প্রায় ৩৮ টাকা।

যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় করভার প্রায় ২৩ গুণ

মাল্টা উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি নিজে মাল্টা উৎপাদন ও রপ্তানি করলেও বিদেশ থেকে মাল্টা আমদানিও করে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি কেজি মাল্টার সাধারণ শুল্কহার ১ দশমিক ৯ সেন্ট। আবার ১৬টি দেশ ও অঞ্চল থেকে মাল্টা আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড কমিশনের হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে শুল্কমুক্ত সুবিধার বাইরে যেসব দেশ থেকে মাল্টা আমদানি হয়েছে, সেসব চালানে গড় কার্যকর শুল্কহার ছিল ৫ দশমিক ১৯ শতাংশ। সেই হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বাংলাদেশে মাল্টার মোট শুল্ক–করভার প্রায় ২৩ গুণ বেশি। ভারতের রাজস্ব বিভাগের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবেশী ভারতেও মাল্টা আমদানিতে ৩০ শতাংশ মৌলিক শুল্ক রয়েছে। অন্যান্য করসহ মোট করভার প্রায় ৩৩ শতাংশ।

আমদানিকারক ও চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির প্রচার সম্পাদক জুনায়েদুল হক বলেন, আগে এক কনটেইনার মাল্টা আমদানিতে শুল্ক–কর দিতে হতো প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকা। এখন দিতে হচ্ছে ২৮ থেকে ২৯ লাখ টাকা। তাঁর ভাষ্য, ফলের ওপর এত উচ্চ শুল্ক–কর ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়ছে।

আমদানি কমছে, রাজস্ব বাড়ছে

শুল্ক–কর বাড়ানোর পর গত কয়েক বছরে হলুদ মাল্টার আমদানি কমেছে। তবে আমদানি কমলেও চার বছর আগের তুলনায় এ পণ্য থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় বেড়েছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে মাল্টা আমদানি থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় হয়েছে ১ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা। শুল্ক–কর বাড়ানোর আগে ২০২১–২২ অর্থবছরে এই রাজস্ব ছিল ১ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। অর্থাৎ চার বছরে রাজস্ব আদায় বেড়েছে প্রায় ৩১ শতাংশ।

শুল্ক–করহার যৌক্তিক করার সুপারিশ

তাজা ফলের শুল্ক–কর বাড়ানোর পর ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) পাঠানো এক চিঠিতে তা কমানোর সুপারিশ করেছিল বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন। চিঠিতে বলা হয়েছিল, এসেনশিয়াল কমোডিটিজ অ্যাক্ট অনুযায়ী খাদ্যপণ্য হিসেবে তাজা ফল অত্যাবশ্যকীয় পণ্য। আবার জাতীয় শুল্কনীতিতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক কেবল জরুরি প্রয়োজনে আরোপের কথা বলা হয়েছে। এই দুই যুক্তিতে তাজা ফলের শুল্ক–কর কমানোর সুপারিশ করেছিল কমিশন।

গবেষণা সংস্থা নলেজ হাব ইনস্টিটিউট ট্রাস্টের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন ঠেকাতে আমদানি নিরুৎসাহিত করার উদ্দেশ্যেই মাল্টাসহ ফলের শুল্ক–কর বাড়ানো হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য দেশীয় বাজার সুরক্ষা বা রাজস্ব বাড়ানো ছিল না। তিনি বলেন, রিজার্ভ পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক না হলেও আগের তুলনায় উন্নতি হয়েছে। তাই স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনায় মাল্টার শুল্ক–করহার যৌক্তিক করা দরকার। অতিরিক্ত শুল্ক–করের অর্থ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকেই দিতে হচ্ছে। তাঁর মতে, রোগীর পথ্য হিসেবে ব্যবহৃত মাল্টায় একদিকে উচ্চ শুল্ক–কর, অন্যদিকে বিলাসপণ্য হিসেবে বিবেচিত গাড়ির কোনো কোনো শ্রেণিতে তার চেয়ে কম শুল্ক–কর—এতে বর্তমান শুল্ককাঠামোয় ভারসাম্যের ঘাটতি স্পষ্ট হয়।