জিসিসির সঙ্গে এফটিএ হলে ১,৭০০ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতির শঙ্কা

সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন ছয় দেশের জোট গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার ক্ষেত্রে সব পণ্যের আমদানিতে শুল্ক-কর পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হলে বাংলাদেশের প্রায় এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হতে পারে। এ ক্ষতি কমাতে সংবেদনশীল শিল্প ও উচ্চ রাজস্ব আদায়কারী পণ্যে আমদানি শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার না করে সীমিত পর্যায়ে ৫ শতাংশ রাখার সুপারিশ করা হয়েছে সম্ভাব্যতা সমীক্ষায়। তবে এফটিএর ফলে বাণিজ্য বাড়লে দীর্ঘ মেয়াদে সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি কমানো বা সমন্বয় করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। এ জন্য পর্যায়ক্রমে শুল্ক কমানো বা ‘স্টেজিং’-এর মাধ্যমে রাজস্ব ক্ষতির তাৎক্ষণিক প্রভাব সীমিত রাখার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) বাংলাদেশ-জিসিসি এফটিএর সম্ভাব্যতা নিয়ে একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করেছে। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এক কর্মশালায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়।

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ-পরবর্তী বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (সেপা) বা এফটিএ সম্পন্ন করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে জিসিসির সঙ্গেও এফটিএ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের আগে আগামী বছরের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আট থেকে ১০টি দেশের সঙ্গে সিইপিএ বা এফটিএ সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে। বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখতে এলডিসি থেকে উত্তরণ-পরবর্তী প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এসব চুক্তি করা হচ্ছে।

বড় বাণিজ্য ঘাটতি

জিসিসির ছয় সদস্য দেশ হলো সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ওমান ও বাহরাইন। এসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শুল্ক ও অশুল্ক বাধা, সম্ভাব্য রাজস্ব প্রভাব এবং এফটিএর সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে সমীক্ষাটি করা হয়েছে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিসিসির বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল প্রায় ৬৯ কোটি মার্কিন ডলার। বিপরীতে জিসিসি থেকে বাংলাদেশ আমদানি করেছে ৫৬৪ কোটি ডলারের পণ্য। ফলে জিসিসির সঙ্গে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে।

বর্তমানে জিসিসির বাজারে বাংলাদেশ প্রধানত তৈরি পোশাক, মসলা, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, শাকসবজি, পানপাতা, পাটের সুতা, ফলের জুসসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে। এফটিএ হলে রপ্তানি সম্প্রসারণ, নতুন পণ্যের বাজার সৃষ্টি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমানোর সুযোগ রয়েছে বলে সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে। জিসিসির বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর গড় এমএফএন শুল্ক ৫ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। এর মধ্যে কৃষিপণ্যে গড়ে ৬ দশমিক ৬২ শতাংশ এবং অকৃষিপণ্যে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৪ সালে দেশগুলো তৈরি পোশাক আমদানি করে প্রায় ১৩ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার। ফলে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি মসলা, হোম টেক্সটাইল, ফুটওয়্যার, সিরামিক, বাইসাইকেলসহ বিভিন্ন পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। সমীক্ষায় বলা হয়েছে, এফটিএ স্বাক্ষর হলে জিসিসি থেকে বাংলাদেশের আমদানি প্রায় ২১ কোটি ডলার বাড়তে পারে। এর মধ্যে সম্ভাব্য ট্রেড ক্রিয়েশন প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি এবং ট্রেড ডাইভারশন সাড়ে ছয় কোটি ডলার।

পেট্রোলিয়াম আমদানিতে রাজস্ব ঝুঁকি

বাংলাদেশ জিসিসিভুক্ত দেশগুলো থেকে মূলত পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি করে। ফলে সব পণ্যের আমদানিতে সব ধরনের শুল্ক-কর শূন্য করা হলে প্রায় এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। এ ক্ষতি কমাতে সংবেদনশীল শিল্প ও উচ্চ রাজস্ব আদায়কারী পণ্যে আমদানি শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার না করে ৫ শতাংশ রাখা হলে এফটিএ আলোচনা কার্যকর হতে পারে বলে সমীক্ষায় মত দেওয়া হয়েছে।

কর্মশালায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রতিনিধি বলেন, এফটিএ বাস্তবায়িত হলে সরকারের রাজস্বের একটি অংশ কমে যেতে পারে। এই ঘাটতি পূরণ ও রাজস্ব বাড়ানোর উপায় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এফটিএ অনুবিভাগের প্রধান বলেন, সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে পড়বে না। প্রথমদিকে অল্প পরিমাণে শুল্ক কমিয়ে পরে ধাপে ধাপে কমানো হলে বাণিজ্য বৃদ্ধির সঙ্গে সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি কমানো বা সমন্বয় করা সম্ভব। এফটিএ অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব বলেন, রাজস্ব ক্ষতির কথা বলা হলেও বাণিজ্য বৃদ্ধি পেলে দীর্ঘ মেয়াদে তা কমানো বা সমন্বয় করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে হালাল খাদ্য, সাধারণ খাদ্যসামগ্রী ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বহুগুণ করার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়তে পারে এবং জ্বালানি খাতের সরবরাহ শৃঙ্খল নিরাপদ হতে পারে।

সেবা খাত ও দক্ষ কর্মীর বাজার

এফটিএ আলোচনায় পণ্য বাণিজ্যের পাশাপাশি সেবা খাত ও দক্ষ কর্মীদের অন্তর্ভুক্তির ওপর অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। ‘মুভমেন্ট অব ন্যাচারাল পারসন্স’ বা মোড-৪-এর আওতায় বাংলাদেশের দক্ষ কর্মীদের সুযোগ দেওয়া হলে জনশক্তি রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বাড়তে পারে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি জানান, ইতোমধ্যে পাঁচটি খাতে জিসিসির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এফটিএ বাস্তবায়নে বাংলাদেশের প্রস্তুতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রতিনিধি বলেন, শুধু রাজস্ব ক্ষতি নয়; এফটিএর কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক সুবিধাও বিবেচনায় নিতে হবে। জিসিসি ব্লকে যুক্ত হলে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং সংকটের সময়ে সহযোগিতা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে। তাই জিসিসির সঙ্গে সিইপিএ বা ইপিএ করার প্রয়োজন রয়েছে। এ মতের সঙ্গে একমত পোষণ করে এফবিসিসিআই।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রতিনিধি বলেন, জিসিসি থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি আমদানি করা পণ্য পেট্রোলিয়াম। জ্বালানি সহযোগিতা এফটিএর আওতায় যুক্ত করা গেলে বাংলাদেশ লাভবান হবে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি বলেন, সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করা গেলে এ খাত উপকৃত হবে।পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর প্রতিনিধি বলেন, জিসিসির বাজারে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাকের চাহিদা রয়েছে। এফটিএ হলে রপ্তানির সুবিধা বাড়বে। তবে বিজিএমইএর প্রতিনিধি বলেন, সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ এমএফএন শুল্ক থাকলেও বাংলাদেশ জিসিসির বাজারে প্রত্যাশিতভাবে প্রবেশ করতে পারেনি। তাই এফটিএ আলোচনায় খাতভিত্তিক অবদান বিশ্লেষণ জরুরি। ওষুধশিল্পের প্রতিনিধি বলেন, এফটিএ হলে জিসিসির বাজারে ওষুধ রপ্তানির বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে।