কমছে মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) দেশে পণ্য আমদানি বেড়েছে ১২ দশমিক ২০ শতাংশ। তবে একই সময়ে কমেছে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি। নতুন বিনিয়োগ ও শিল্পকারখানা সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ এই উপকরণের আমদানি কমে যাওয়ায় অর্থনীতিতে বিনিয়োগের গতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় নতুন বিনিয়োগ কমে গেছে। উচ্চ সুদহার, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হ্রাস এবং কয়েকটি ব্যাংকের তারল্য সংকটের কারণে উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছেন না। পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা নতুন কারখানা স্থাপন এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। বড় প্রকল্পের সংখ্যা কমে যাওয়ায় মূলধনি যন্ত্রপাতির চাহিদাও হ্রাস পেয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণের পরিবর্তে বিদ্যমান কার্যক্রম সচল রাখার দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে দেশে মোট ১ হাজার ২৮৯ কোটি ৬০ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১৪৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি বেড়েছে ১৪০ কোটি ৩০ লাখ ডলার বা ১২ দশমিক ২০ শতাংশ। তবে আমদানির এই প্রবৃদ্ধিতে মূলধনি পণ্যের অবদান নেই। বরং এ খাতে আমদানি কমেছে। গত অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে মূলধনি পণ্য আমদানি ছিল ২০০ কোটি ৫০ লাখ ডলার, যা চলতি অর্থবছরের একই সময়ে কমে ১৬০ কোটি ৫০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ৭৫ কোটি ১০ লাখ ডলার থেকে কমে ৫০ কোটি ৭০ লাখ ডলারে নেমেছে। এতে এ খাতে আমদানি কমেছে ৩২ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি ভালো নয়। সাধারণত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে আমদানি বাড়ে। বর্তমানে আমদানির যে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তার প্রধান কারণ জ্বালানি। চলমান সংকটের মধ্যে উদ্যোক্তারা নতুন করে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন না। ফলে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। তবে শিল্পের কাঁচামালসহ মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি বেড়েছে ১৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। এ খাতে আমদানি ৭১০ কোটি ৪০ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ৮৪৬ কোটি ৩০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি বেড়েছে ১১ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে, তুলা আমদানি কমেছে ৫ দশমিক ৬১ শতাংশ।

বস্ত্র খাতের মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর সাবেক সহসভাপতি আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, গত তিন বছর ধরেই দেশে বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক। নতুন করে মূলধনি বিনিয়োগ প্রায় হচ্ছে না বললেই চলে। এর অন্যতম কারণ ছিল নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা। তবে নির্বাচনের পরও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বরং ব্যাংকিং খাতে অসহযোগিতামূলক মনোভাব ও তারল্য সংকটের কারণে উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, সরকার ৪০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করলেও এখন পর্যন্ত এ তহবিল থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বিতরণ করা হয়নি। মাত্র ৫০০ কোটি টাকা বিতরণ হয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে দেশে বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় সমস্যা অর্থায়ন।

আবদুল্লাহ আল মামুন আরও বলেন, গত তিন-চার বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা এবং ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে। এতে ব্যবসায়ীদের কার্যকরী মূলধন কমে গেছে। ফলে অনেক উদ্যোক্তার ব্যবসা সম্প্রসারণের সক্ষমতা আর নেই। জ্বালানি সংকটের প্রভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৫ থেকে ২০ দিন আগে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। জ্বালানি সংকট আগে থেকেই ছিল, তবে সম্প্রতি তা আরও প্রকট হওয়ায় উদ্যোক্তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সংকটের সমাধান কীভাবে হবে, তা নিয়েও তাঁদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এসব কারণে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে।

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ মাসাদুল ইসলাম বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যা সমাধান না হলে নতুন শিল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনা কম। এসব সুবিধা ছাড়া কোনো শিল্পকারখানা চালানো সম্ভব নয়। আগামী দুই বছরেও গ্যাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না—সরকারের পক্ষ থেকে এমন বাস্তবতার কথা জানানোয় উদ্যোক্তারা নতুন যন্ত্রপাতি আমদানি করে ঝুঁকিতে পড়তে চাইছেন না।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির মাধ্যমে সাধারণত নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন ও বিদ্যমান কারখানার সম্প্রসারণ করা হয়। এতে শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়ে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। কর্মসংস্থান বাড়লে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনে। বিপরীতে, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ার অর্থ বিনিয়োগের গতি থমকে যাওয়া। বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়বে। দীর্ঘ মেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে অর্থনীতিতে।

এদিকে, গত আগস্ট শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন। টানা কয়েক মাস ধরে এ প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কের ঘরে রয়েছে। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাও কমছে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে নতুন ঋণের চাহিদা কমে যায়। নতুন শিল্প স্থাপন বা বড় কারখানা সম্প্রসারণ না হলে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিও স্বাভাবিকভাবেই সীমিত থাকে।