দীর্ঘদিনের অনিয়ম, লুটপাট ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়া পাঁচটি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) বন্ধ বা অবসায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের মঙ্গলবার (১২ মে) অনুষ্ঠিত সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে এফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং আগামী অর্থবছরের বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়ার পর অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এফএএস ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৯৯.৯৯ শতাংশ, ফারইস্ট ফাইন্যান্সে ৯৮.৫০ শতাংশ, আভিভা ফাইন্যান্সে ৯৩.৯৩ শতাংশ, পিপলস লিজিংয়ে প্রায় ৯৫ শতাংশ এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৯৯.৪৪ শতাংশ। এর আগে উচ্চ খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থতার কারণে গত বছর ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ‘অপরিচালনযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, এবং পরে সেগুলোর লাইসেন্স বাতিল ও অবসায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে সরকার ও গভর্নর পরিবর্তনের পর এ প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়।
ওই সময় অবসায়নের উদ্যোগ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, আভিভা ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি এবং প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করতে সরকারের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়াকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সংকটে থাকা ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক আমানত রয়েছে ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা ক্ষুদ্র আমানতকারীদের এবং বাকি ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের। সবচেয়ে বেশি ব্যক্তি আমানত আটকে রয়েছে পিপলস লিজিংয়ে, যার পরিমাণ ১ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। এছাড়া আভিভা ফাইন্যান্সে ৮০৯ কোটি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৬৪৫ কোটি এবং প্রাইম ফাইন্যান্সে ৩২৮ কোটি টাকা আটকে রয়েছে সাধারণ আমানতকারীদের।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, ২০২৩ সালে প্রণীত ‘ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন’ অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইনের ৭(১) ধারা অনুযায়ী, আমানতকারীর স্বার্থবিরোধী কার্যক্রম, দায় পরিশোধে সম্পদের ঘাটতি এবং মূলধন সংরক্ষণে ব্যর্থতার কারণে লাইসেন্স বাতিল করা যায়। আর ৭(২) ধারায় লাইসেন্স বাতিলের আগে ১৫ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর সুযোগ দেওয়ার বিধান রয়েছে। আর্থিক খাতের বহুল আলোচিত ব্যক্তি প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের অনিয়মের প্রভাব এখনো টানছে পুরো খাত। পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, এফএএস ফাইন্যান্স ও আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে তার সংশ্লিষ্টতার কারণে সেগুলো বড় সংকটে পড়ে। অন্যদিকে আভিভা ফাইন্যান্স ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলম (এস আলম) সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।
বর্তমানে দেশে ৩৫টি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) রয়েছে, যার মধ্যে ২০টিকে সমস্যাগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণ ২৫ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা, যার মধ্যে ২১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকাই খেলাপি—অর্থাৎ খেলাপি ঋণের হার ৮৩.১৬ শতাংশ। বিপরীতে এসব ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পদের মূল্য মাত্র ৬ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৬ শতাংশ। অন্যদিকে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকা ১৫টি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৭ শতাংশ। ২০২৪ সালে এ প্রতিষ্ঠানগুলো ১ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা মুনাফা করেছে এবং তাদের মূলধন উদ্বৃত্ত রয়েছে ৬ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, গত বছরের জুন শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ২৭ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা, যা খাতটির মোট বিতরণ করা ঋণের ৩৫.৭২ শতাংশ।
