চট্টগ্রাম বন্দরে একের পর এক আমদানি পণ্যবোঝাই কনটেইনার গায়েবের ঘটনায় বন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। নিরাপত্তা ঘাটতির পাশাপাশি এসব ঘটনায় দেশের অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কনটেইনারগুলোতে কী পণ্য এসেছে এবং কারা সেগুলো আমদানি করেছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য না থাকায় রাজস্ব ফাঁকির পাশাপাশি মানিলন্ডারিং বা অন্য কোনো অপরাধের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি কাস্টমসের এসাইকোডা সিস্টেমে ডেলিভারি স্ট্যাটাসে লক করে রাখা ২৫০টি কনটেইনারের হদিস না মেলার বিষয়টি সামনে আসে। এর রেশ কাটতে না কাটতেই প্রায় তিন কোটি টাকা মূল্যের কাপড়বোঝাই আরও একটি কনটেইনার গায়েব হওয়ার ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
গত জুলাইয়ের শুরুতে কাস্টমসের এআইআর শাখার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চার বছরে ডেলিভারি নিষিদ্ধ ২৫০টি কনটেইনারের হদিস পাওয়া যাচ্ছিল না। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বন্দরের অভ্যন্তরে থাকা এসব কনটেইনারের অবস্থান জানতে দফায় দফায় চিঠি দিলেও দীর্ঘ সময় কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। পরে বিভিন্ন ইয়ার্ডে কনটেইনারগুলো রয়েছে দাবি করে কাস্টমসকে চিঠি দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে এখন পর্যন্ত চিঠিতে উল্লেখ করা অবস্থানের সঙ্গে মিলিয়ে সুনির্দিষ্ট কনটেইনারগুলো শনাক্ত করতে পারেনি কাস্টমস।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের মুখপাত্র ও সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন জানান, বিভিন্ন ইয়ার্ডে কনটেইনারগুলো সংরক্ষিত আছে জানিয়ে বন্দর থেকে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে হাজার হাজার কনটেইনারের মধ্যে সুনির্দিষ্ট ২৫০টি কোনগুলো, তা চিহ্নিত করে দেওয়া হয়নি। ফলে চিঠি পাওয়া ছাড়া কনটেইনারগুলোর অবস্থান সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। বিষয়টি মিলিয়ে দেখা ও যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। কনটেইনারগুলো হারিয়ে গেছে বা সবগুলো পাওয়া গেছে—এমন কোনো সিদ্ধান্তে এখনো পৌঁছানো হয়নি।
এদিকে তিন কোটি টাকা মূল্যের শতভাগ রপ্তানিমুখী পণ্য তৈরির কাপড়বোঝাই ৪০ ফুটের একটি কনটেইনার ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে বন্দর থেকে বের করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনায় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হলেও কনটেইনারটি এখনো উদ্ধার হয়নি। নিখোঁজ কনটেইনারটির নম্বর MRSU-8692827।
ফ্রান্সের এক ক্রেতার অর্ডারের ভিত্তিতে ঢাকার গোল্ড স্টার গার্মেন্টস লিমিটেড লেডিস পোশাক তৈরির কাপড় আমদানি করে। এমভি এমসিসি ডানাং জাহাজে করে পণ্যটি চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। এনসিটি টার্মিনালের দুই নম্বর জেটি থেকে খালাসের পর কনটেইনারটি সিসিটি ইয়ার্ডে রাখা হয়। শুল্কায়ন, ডেমারেজসহ বিভিন্ন খাতে ৪৫ লাখ টাকা পরিশোধ করে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে গত ৩০ আগস্ট কনটেইনারটি নিতে যায় আমদানিকারকের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এসআরএস সাইন্ড।
তবে তিন দিন সিসিটি ইয়ার্ডে খোঁজ করেও কনটেইনারটির হদিস না পেয়ে ২ সেপ্টেম্বর বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান। পরে বন্দর থেকে জানানো হয়, ১১ আগস্ট এন৪ সিস্টেমে কনটেইনারটির অন-ডেট ও অন-চ্যাসিস ডেলিভারি দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ, সিস্টেম অনুযায়ী কনটেইনারটি এরই মধ্যে ডেলিভারি হয়ে গেছে।
ঘটনার তদন্তে ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। পরে থানায় মামলাও করা হয়। ঘটনায় জড়িত সন্দেহে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্রতিষ্ঠান প্যারামাউন্ট ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের দুই জেটি শ্রমিক মোর্শেদ আলম ও সাইদুর রহমানের নাম উল্লেখ করে আরও তিন-চারজন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে এ ধরনের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। ২০২৫ সালে ছয় মাসের মধ্যে প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের কাপড়বোঝাই দুটি কনটেইনার গায়েব হয়। এর একটিতে এক ক্রেতা নিলামে ২৭ টন কাপড়ের জন্য ৮৫ লাখ টাকা এবং শুল্ক, ভ্যাট ও বন্দর ফি বাবদ আরও ২২ লাখ টাকা পরিশোধ করেও পণ্য বুঝে পাননি। অন্য একটি কনটেইনারের কাপড় কিনতে নিলামে ৪২ লাখ টাকা পরিশোধ করেও পণ্য পাননি আরেক ক্রেতা। চলতি বছরও পণ্যবোঝাই আরও দুটি কনটেইনার নিখোঁজের ঘটনায় মামলা করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দরের হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে ইয়ার্ড থেকে পাঁচটি কনটেইনার উধাও হয়েছে।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের বন্দর জোনের ডিসি আমিরুল ইসলাম বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর একটি কেপিআই এলাকা। বন্দর এলাকায় কোনো ঘটনা ঘটলে প্রাথমিকভাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেদের মতো করে তদন্ত করে। এরপর বিষয়টি পুলিশের কাছে আসে। এতে কিছুটা সময় পার হয়ে যাওয়ায় পুলিশের তদন্তও কঠিন হয়ে পড়ে। কনটেইনার গায়েবের ঘটনাগুলোর তদন্তেও একই ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, বন্দরের নিরাপত্তায় বেশ কিছু ঘাটতির বিষয় কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং সেগুলো সমাধানে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একটি কনটেইনার বন্দর থেকে বের করতে একাধিক ধাপ পার হতে হয়। তাই ভেতরের কারও সম্পৃক্ততা ছাড়া এত বড় কনটেইনার গায়েব করা সম্ভব কি না, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তে পুলিশ কাজ করছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও আবুল খায়ের গ্রুপের সিইও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শহীদ উল্লাহ চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানে কোনো ধরনের নিরাপত্তা ঘাটতি পুরো দেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অতীতে এ বন্দর দিয়ে ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালান এবং বড় বড় মাদকের চালান ধরা পড়েছে। আটক চালানগুলোর আমদানিকারকদের ঠিকানা যাচাই করে অনেক ক্ষেত্রেই ভুয়া তথ্য পাওয়া গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তার মতে, নিখোঁজ কনটেইনারগুলোর বেশিরভাগের আইজিএম দাখিল হয়েছে, কিন্তু সেগুলো ছাড়িয়ে নিতে কেউ বিল অব এন্ট্রি দাখিল করেনি। অর্থাৎ কনটেইনার বন্দরে আসার পর ভিন্ন কৌশলে সেগুলো বের করে নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব কনটেইনারে কী পণ্য আনা হচ্ছে, সে বিষয়ে সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে তথ্য না থাকায় বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নতুন করে সাজানো প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা ও প্রশাসন) জাফর আলম বলেন, বন্দর ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা ছাড়া কনটেইনার বের করার সুযোগ নেই। অনেক সময় স্বাক্ষর জাল করে কনটেইনার গায়েবের কথা বলা হয়, যা বিশ্বাসযোগ্য নয়। প্রতিটি নথিতে কিউআর কোড ব্যবহার করলে এ ধরনের জালিয়াতি ঠেকানো সম্ভব। শ্রমিকদের গ্রেপ্তার করে তদন্তকে ভিন্ন দিকে নেওয়ার পরিবর্তে ঘটনার মূল কারণ খুঁজে বের করা দরকার বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
চট্টগ্রাম বন্দরের মুখপাত্র সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ যে ২৫০টি কনটেইনারের হদিস চেয়েছিল, সেগুলোর অবস্থান জানিয়ে কাস্টমসকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কাস্টমস এখনো কনটেইনারগুলো খুঁজে পায়নি—এমন কোনো লিখিত তথ্য বন্দর কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়নি। তাই বন্দর কর্তৃপক্ষের ধারণা, কনটেইনারগুলো বন্দরের বিভিন্ন স্থানে সংরক্ষিত আছে। গত এক বছরে নিখোঁজ হওয়া পাঁচটি কনটেইনার উদ্ধারে কাজ চলছে। এ ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। শিগগিরই কমিটি প্রতিবেদন দেবে এবং সেই সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
