আসন্ন জাতীয় বাজেটে উত্তরাধিকার কর আইন চালু করার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই বলে জানিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। শুক্রবার রাতে এনবিআর ভবনে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (ট্যাকসেশন) অ্যাসোসিয়েশনের নবনির্বাচিত কমিটির অভিষেক ও শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এই তথ্য জানান।

উত্তরাধিকার কর নিয়ে জনমনে এবং রাজনৈতিক মহলে সৃষ্ট বিভ্রান্তি দূর করে চেয়ারম্যান বলেন, এবার আমরা একটা বড় পদক্ষেপ নিচ্ছি, যদিও পত্র-পত্রিকায় উল্টাপাল্টা আসছে। আজকে সকালে এক মন্ত্রী মহোদয় ফোন করে বললেন, ‘রহমান, তুমি নাকি উত্তরাধিকার ট্যাক্স বসাচ্ছ? খবরদার এটা করা যাবে না।’ আমি বললাম যে এরকম কোনো চিন্তাভাবনা আমাদের নেই। আমাদের যে টাস্কফোর্স গঠন করেছিলাম, কর বাড়ানোর তাঁদের অনেকগুলো পরামর্শের মধ্যে একটি পরামর্শ ছিল, আমরা উত্তরাধিকার করে যেতে পারি। আমি শুরু থেকেই বলেছি যে না, বাংলাদেশের অবস্থা এখনো সেই পর্যায়ে যায়নি, এটা হতে সময় লাগবে।

উত্তরাধিকার কর নাকচ করলেও এনবিআর চেয়ারম্যান একটি ‘কমপ্লিট ডাটাবেসড ওয়েলথ ট্যাক্স সিস্টেম’ বা সম্পদ কর ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে অত্যন্ত আশাবাদী। তিনি বলেন, আমরা খুব অ্যাক্টিভলি চিন্তা করছি একটি কমপ্লিট ডাটাবেসড ওয়েলথ ট্যাক্স সিস্টেম চালু করতে। এটি ই-রিটার্নের সঙ্গেই একটি ওয়েলথ ট্যাক্স রিটার্ন প্যাকেজ আকারে সাবমিট হয়ে যাবে। আগে যে কারণে ওয়েলথ ট্যাক্স বাতিল হয়ে গিয়েছিল সেটি হলো ভ্যালুয়েশন নিয়ে হিউজ লিটিগেশন তৈরি হতো। আমরা এই ভ্যালুয়েশনকে আইনে ফার্ম করে দেব এবং ক্যালকুলেশনটা অটোমেটেড হবে। ফলে এখান থেকে আমরা ভালো রেভিনিউ পাব বলে আশা করি।

দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কর প্রশাসনের বদ্ধমূল কার্যপদ্ধতি থেকেও বের হওয়ার তাগিদ দেন এনবিআর প্রধান। কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমাদের কিছু কম্পার্টমেন্টাল কাজ আছে, খুবই কম্পার্টমেন্টাল। যে কারণে নিজেদের মধ্যে ইন্টার্যাকশন কম এবং বাইরে তো নেই-ই। একারণে সবচেয়ে ব্রিলিয়ান্টরা আসার পরেও তারা কেন জানি চুপচাপ হয়ে যায়, কারণ কাজের নেচারটাই এমন, সারাজীবন কেবল ফাইল দেখতে হয় এ টু জেড। এখান থেকেও আসলে একটু বের হতে হবে।

তিনি কর্মকর্তাদের আন্তর্জাতিক কানেক্টিভিটি বাড়ানো এবং বৈশ্বিক জ্ঞান অর্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, সারা দুনিয়াতে দেখেছি, যেকোনো জায়গায় গেলে যদি মাথায় কিছু নিয়ে যাওয়া হয় যে এবার এখান থেকে আমি এই জিনিসটি নিয়ে আসব। যখনই আমাদের কোনো সিনিয়র অফিসার কোনো না কোনো ফোরামে যাবেন, তাদের চেষ্টা থাকবে একটা পার্মানেন্ট এনগেজমেন্ট করে ফেলার। আমরা রেগুলার হয়ে যাব, তাদের যদি চাঁদা দেওয়া লাগে চাঁদা দেব, মেম্বার হওয়া লাগে মেম্বার হব। এগুলো রাষ্ট্রীয় পয়সা থেকে যাবে, তাতে তো কোনো সমস্যা নেই। কানেক্টিভিটিগুলো তৈরি করে ফেললে আমাদের বাইরের এক্সপোজার বাড়বে। ইনডাইরেক্ট ট্যাক্স থেকে ডিরেক্ট ট্যাক্সের ইমপরট্যান্স সারা দুনিয়ায় অনেক বেশি, বলেন আবদুর রহমান খান।

বিদায়ী সুর ভেসে ওঠে চেয়ারম্যানের বক্তব্যে যখন তিনি ই-টিডিএস সিস্টেমকে আগামীর ‘রেভিনিউ মেশিন’ হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, আমার যাওয়ার সময় হয়ে গেছে, আমি একরকম বিদায় ভাষণ দিচ্ছি। কারণ এই পরিসরে আর আমার কারও সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগ কম। আমাদের ছেলেমেয়েরাই খুব কষ্ট করে ই-টিডিএস একটি সিস্টেম চালু করেছিল। আমি এখনো মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি নেক্সট রেভিনিউ মেশিন হচ্ছে ইনকাম ট্যাক্সের এই ই-টিডিএস সিস্টেমটা। ই-টিডিএস সিস্টেমটাকে যদি পুরোপুরি কার্যকর করতে পারি, যেখানে প্রত্যেক উইথহোল্ডিং অথরিটির জন্য আইনের বাধ্যবাধকতা থাকবে যে এটি ব্যবহার করতে হবে এবং সবকিছু রেকর্ড হয়ে যাবে। উইথহোল্ডিং ট্যাক্স রিটার্নের সঙ্গে আমার ইনকাম ট্যাক্স কানেক্টেড হয়ে যাবে। যখনই আমরা কেউ রিটার্ন সাবমিশনের জন্য লগইন করব, যে যে জায়গায় আমার ট্যাক্স জমা হয়েছে ইনকাম ফিল্ডগুলো অটোমেটিক ট্যাক্সসহ চলে আসবে।

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, আগে অ্যাসেসমেন্ট করার সময় ইমপোর্ট স্টেজে ট্যাক্স ক্রেডিট দেওয়া ছিল জটিল প্রক্রিয়া। ইন্সপেক্টর নিয়োগ দেওয়া হতো, তারা চট্টগ্রাম পোর্টে গিয়ে রেকর্ড দেখে রিপোর্ট দিলে ক্রেডিট দেওয়া হতো, নাহলে হতো না। দেখা যেত প্রথমবার ডেপুটি কমিশনার ক্রেডিট দিলেন কিন্তু অ্যাপিল অর্ডারে ডিমান্ড কমে রিফান্ড আসার সময় দেখা যেত রিফান্ড আটকাতে ক্রেডিট দেওয়া হতো না। এটি একেবারেই অসদাচরণ। রিফান্ড হলে হবে, আমি তো রিফান্ড ক্রিয়েট করিনি। অ্যাপিল অর্ডার এক্সিকিউট করার কারণে রিফান্ড হয়েছে, আমি রিফান্ড দেব।

এনবিআরে যখন এটি অ্যানালাইসিসের জন্য আসবে, মেম্বার মহোদয় যদি দেখেন পলিসির কোনো ভুলের কারণে আমরা অহেতুক মানুষের কাছ থেকে বেশি ট্যাক্স নেই এবং রিফান্ড দেওয়া লাগে, তবে তিনি পলিসি মেম্বারকে সংশোধনের কথা বলবেন। অথবা অ্যাসেসমেন্টের কোয়ালিটিতে তফাৎ হলে ট্রেনিংয়ের সময় এ বিষয়টি খেয়াল রাখতে বলবেন, বলেন তিনি। তিনি আরও বলেন, এখন আমরা যেটি করেছি, ইমপোর্ট স্টেজে ট্যাক্সপেয়াররা যে ট্যাক্স দিয়ে আসে, তা রিটার্ন সাবমিশনের সময় অটোমেটিক ক্রেডিট হয়ে গেছে। আমরা ট্যাক্স অফিসারদের অ্যাসাইকুডা ডাটাবেসে ফুল এক্সেস দিয়েছি। ফলে এখন প্রত্যেক ট্যাক্সপেয়ারের ইনপুট দেখে তারা অ্যাসেসমেন্ট মিলাতে পারবে এবং আমরা নির্দেশ দিয়েছি প্রত্যেক অফিসারকে এ সিস্টেমে এক্সেস দিয়ে ক্রেডিট দিয়ে দিতে হবে। এগুলো করতে পারলে করদাতার জীবন অনেক সহজ হয়ে যাবে। আমাদের নানা কারণে করদাতাদের সঙ্গে সম্পর্ক তিক্ত হয়ে গেছে। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। যে যে কারণে সিচুয়েশন তিক্ত হয় আমরা তা অ্যাড্রেস করার চেষ্টা করছি। যেমন অডিট সিলেকশন। একজনের ১০ বছর অডিট হয় আরেকজনের ৩০ বছরেও হয় না। অডিট করার জন্য লোকজন মনে করে করদাতারা দুর্নীতির আশ্রয় নেয়, বলেন আবদুর রহমান খান।
** নতুন সভাপতি আহসান, ফের মহাসচিব মহিদুল
** আগামী বাজেটে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন থাকবে
** প্রত্যক্ষ কর বিষয়ক বাজেট প্রস্তাবনা এনবিআরের
** ঋণের সুদে বাড়ছে বাজেটের চাপ
** আগামী বাজেটের আকার বাড়ছে ৯৩,০০০ কোটি টাকা
** ৩১ মার্চ এনবিআরের প্রাক্–বাজেট আলোচনা শুরু
** বাজেটে সোনা-হীরায় ব্যাপক করছাড়ের দাবি বাজুসের
** ‘বাজেটে ব্যবসায়ীদের ওপর খড়গ নামবে না’
** এমন বাজেট দেওয়া ঠিক হবে না যাতে মূল্যস্ফীতি বাড়ে
** আসছে ৯,৩০,০০০ কোটি টাকার বাজেট
** বাজেটে বিড়ি শিল্পে শুল্ক না বাড়ানোসহ ৫ দাবি
** বাজেটে কর-ছাড় ও ভর্তুকি তুলে দেওয়ার পরামর্শ
