আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সব সুপারিশ অন্ধভাবে মানা হবে না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, আইএমএফের পরামর্শ অনুযায়ী সব ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ একক ভ্যাট (সব পণ্য ও সেবায় অভিন্ন হারে মূল্য সংযোজন কর) আরোপ করা হলে দেশের প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবে। তাই দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনা করেই আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের ভ্যাট ও রাজস্ব নীতি নির্ধারণ করা হবে।
‘জাতীয় বাজেট ২০২৬–২৭: প্রত্যাশা, অগ্রাধিকার ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এ কথা বলেন। ‘দ্য বাংলাদেশ ডায়ালগ’ নামের একটি সংস্থা আসন্ন বাজেট উপলক্ষে এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। আজ শনিবার রাজধানীর দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
গোলটেবিল আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, আসন্ন জাতীয় বাজেটে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ জোরদার করতে কর কাঠামোর স্থিতিশীলতা অন্তত পাঁচ বছর বজায় রাখা হবে। তিনি বলেন, করের হার বাড়ানোর পরিবর্তে করযোগ্য মানুষের সংখ্যা ও করের আওতা সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে এসআরও নির্ভরতা কমিয়ে হয়রানি বন্ধে ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা চালু এবং পুরো রাজস্ব ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব সংস্কার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের গণতান্ত্রিক ও মানবিক কল্যাণ রাষ্ট্রে উন্নীত করার লক্ষ্যেই গ্রহণ করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করে বলেন, বিনিয়োগকারীরা মূলত পাঁচটি বিষয় চান, যার প্রতিফলন আগামী বাজেটে দেখা যাবে। প্রথমটি হলো নীতির ধারাবাহিকতা—উদ্যোক্তাদের সুবিধার্থে করকাঠামো ন্যূনতম পাঁচ বছর অপরিবর্তিত রাখা হবে। দ্বিতীয়ত, কলকারখানার জন্য বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মতো জ্বালানির নিশ্চয়তা দেওয়া হবে। তৃতীয়ত, ব্যাংক খাতের সংস্কারের মাধ্যমে অর্থায়নের সঠিক ব্যবস্থা করা হবে। এ ছাড়া সবার জন্য সমান সুযোগ ও বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা তৈরি করা হবে।
অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণে বাংলাদেশের নিজস্ব ও ঐতিহাসিক উদ্ভাবনী মডেলের কথা উল্লেখ করে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘১৯৭১ সালের তথাকথিত বাস্কেট কেস বা ১৯৭৫ সালের চরম সংকটকালীন যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতিকে কেতাবি কায়দায় নয়; বরং এদেশীয় সৃজনশীলতায় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান পুনরুদ্ধার করেছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যের উদ্বৃত্ত পুঁজি ও বাংলাদেশের উদ্বৃত্ত শ্রমের মেলবন্ধন ঘটিয়ে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোটা–সুবিধা কাজে লাগিয়ে তৈরি পোশাক খাতের যে সূচনা তিনি করেছিলেন, তা কোনো কেতাবি তত্ত্বে ছিল না। বর্তমান সরকারও সেই দেশজ ও বাস্তবমুখী কায়দায় সংকট উত্তরণের পথে হাঁটছে।’
শিল্প ও জ্বালানি খাতের সংস্কার প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, বিগত দিনের স্থবিরতা কাটিয়ে দেশে আবার ‘শিল্পনীতি’ ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। এখন শুধু সোলার প্যানেল বা বিদ্যুৎ আমদানি নয়, দেশে ইলেকট্রিক বাস ও রেলওয়ের লোকোমোটিভ উৎপাদনের মতো স্বনির্ভর শিল্পায়নে জোর দেওয়া হচ্ছে। অলিগার্কের কারণে জ্বালানি আমদানির যে উচ্চ ব্যয় হতো, তা কমাতে বড় জাহাজ ভেড়ার সুবিধা ও কৌশলগত মজুতের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এর ফলে এলএনজি ও এলপিজির দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে আসবে এবং এর সুফল প্রান্তিক মানুষ পাবে।
আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থার বৈষম্যের সমালোচনা করে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘একটি গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র হওয়ার কারণে ভূরাজনৈতিক বৈশ্বিক সংকটের জন্য বাংলাদেশকে অতিরিক্ত ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার মাশুল গুনতে হচ্ছে, যার জন্য আমরা দায়ী নই। অথচ আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা সুশীল সমাজ এই বড় আর্থিক বিপর্যয় নিয়ে নীরব। মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বমানবতার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব পালন করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত আমাদের ওপর এই বাড়তি ঋণের চাপ কমানো এবং ঋণ স্থগিতকরণ (ডেট সাসপেনশন) বা করোনাকালীন অব্যবহৃত এসডিআরের সুবিধা দেওয়া।’
অর্থ উপদেষ্টা আরও জানান, উত্তরবঙ্গের উদ্বৃত্ত শস্য, ফল ও দুগ্ধজাত পণ্যের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বন্ধ থাকা বিজিএমসি, বিটিএমসি, স্টিল ও কেমিক্যাল করপোরেশনের কারখানাগুলোয় দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ওষুধ, চামড়া, ইলেকট্রনিকস, খেলনা ও আইসিটি খাতের পাশাপাশি ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকার তিন ধাপের (রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন) মহাপরিকল্পনা নিয়েছে। পুঁজিবাজারে গভীরতা বাড়াতে বিমানসহ বিভিন্ন খাতের বন্ড ছাড়ার ইনোভেশন আনা হচ্ছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজের মতো বাস্তবসম্মত উন্নয়ন পরিকল্পনাও সরকারের হাতে রয়েছে।
