ভ্যাট-শুল্ক-কর সংস্কারে ব্যবসার বাধা কমানোর লক্ষ্য

বাজেট ২০২৬-২৭

আসন্ন জাতীয় বাজেটে ব্যবসায়ীদের জন্য বড় স্বস্তির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। নতুন কর আরোপের বদলে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিদ্যমান বাধা দূর করা এবং ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন জোরদারে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত সংস্কারের মধ্যে রয়েছে মাসিকের পরিবর্তে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সুযোগ, সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ভ্যাট নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু এবং বন্দর ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়া আরও সহজ ও দ্রুত করা।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে মাসিক ভ্যাট পরিশোধের নিয়ম বহাল থাকলেও রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে তিন মাস পরপর জমা দেওয়ার সুযোগ চালু হতে পারে। ফলে বছরে ১২টির পরিবর্তে মাত্র ৪টি ভ্যাট রিটার্ন জমা দিলেই হবে, যার আওতায় প্রায় ৫ লাখ প্রতিষ্ঠান আসতে পারে। পাশাপাশি এনবিআর অনুমোদিত ইআরপি সফটওয়্যার ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য ভ্যাট রিটার্ন ও অডিট-সংক্রান্ত কাগজপত্রের হার্ড কপি জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া অনলাইন ভ্যাট নিবন্ধন প্রক্রিয়াও সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় করা হতে পারে, যাতে কর্মকর্তার অনুমোদন ছাড়াই দ্রুত নিবন্ধন সম্পন্ন করা যায়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো, বন্দরে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স সময় ব্যাপকভাবে কমানো। বর্তমানে আমদানি করা পণ্য ও রাসায়নিক নমুনা শুধু বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এবং বাংলাদেশ অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনে পরীক্ষা করা যায়। এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে প্রায় দুই সপ্তাহ পর্যন্ত সময় ব্যয় হয়। প্রস্তাবিত পরিবর্তনের আওতায় আন্তর্জাতিক মান সংস্থা (আইএসও) এবং বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড (বিএবি) অনুমোদিত যেকোনো প্রতিষ্ঠানেও নমুনা পরীক্ষা করা যাবে। কর্মকর্তাদের মতে, এতে বিলম্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে।

এনবিআর অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর (এইও) সনদ পাওয়ার শর্ত শিথিল করার বিষয়টিও বিবেচনা করছে, যাতে আরও বেশি প্রতিষ্ঠান ‘ট্রাস্টেড ট্রেডার’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে দ্রুত কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স সুবিধা পায়। এইও সনদধারীদের ক্ষেত্রে পণ্যের ফিজিক্যাল পরীক্ষার শর্তও আরও শিথিল হতে পারে। চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদনে কতটুকু কাঁচামাল ব্যবহার হয় তা নির্ধারণকারী ইনপুট-আউটপুট কো-এফিশিয়েন্ট সংক্রান্ত ঘোষণাপত্র ও অনুমোদনের বিদ্যমান শর্তও শিথিল করা হতে পারে।নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, যেসব জায়গায় বাণিজ্যে বাধা রয়েছে, সেগুলো সহজ করার পরিকল্পনা আছে এই বাজেটে… এটি হবে ‘নো ইমপোজিশন, লিটল এক্সেম্পশন—অনলি ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন’ বাজেট।

এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান মার্চ ও এপ্রিল মাসে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে আসন্ন বাজেটে ব্যবসা-বাণিজ্যের বাধা দূরকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে বহুল সমালোচিত ‘মিনিমাম ট্যাক্স’ বা ন্যূনতম কর ব্যবস্থা থেকে সরে আসার চিন্তাও রয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে নির্দিষ্ট সময় পর করদাতা যোগ্য হলে অগ্রিম কর বা উৎসে কাটা অর্থ ফেরত দেওয়ার বিধান থাকতে পারে। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় একটি আরও পূর্বানুমানযোগ্য কর ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি থাকতে পারে এবং ব্যক্তি ও কোম্পানিভিত্তিক করদাতাদের জন্য নতুন করহার পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য নির্ধারণের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

দ্রুত নমুনা পরীক্ষা ও কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স

বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী আমদানি করা পণ্য বা রাসায়নিকের শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার প্রয়োজন হয়, যা শুধু বিএসটিআই ও বাংলাদেশ অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের মধ্যেই সীমিত। এর ফলে প্রায়ই পণ্য ঢাকায় পরীক্ষার জন্য পাঠাতে হয়। এতে চালান বন্দরে আটকে থাকে এবং আমদানিকারকদের ডেমারেজ চার্জ গুনতে হয়।প্রস্তাবিত সংস্কারের আওতায় আইএসও সার্টিফায়েড এবং বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড (বিএবি) অনুমোদিত যেকোনো প্রতিষ্ঠানেও পরীক্ষা করা যাবে। কর্মকর্তারা আশা করছেন, এতে পরীক্ষার সময় কমবে, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স দ্রুত হবে এবং ব্যবসার খরচ কমবে।

২০১৯ সালে চালু হওয়া অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর (এইও) কর্মসূচির আওতায় বিশ্বস্ত আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকরা তাৎক্ষণিক পরীক্ষার ছাড়াই বন্দরের পণ্য সরাসরি গুদামে নিতে পারেন। তবে সুবিধা থাকা সত্ত্বেও গত ছয় বছরের বেশি সময়ে মাত্র ২০টি প্রতিষ্ঠান এইও লাইসেন্স পেয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, যোগ্যতার শর্ত এখনও অনেক কঠিন, যার কারণে অংশগ্রহণ সীমিত। তাই বাজেটে এসব শর্ত শিথিল করা এবং সার্টিফায়েড প্রতিষ্ঠানের ফিজিক্যাল পরীক্ষা কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

কনসাইনমেন্ট দ্রুত ছাড়ের দাবি ব্যবসায়ীদের

পরীক্ষার সুযোগ বাড়ানোর প্রস্তাবকে স্বাগত জানালেও ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হবে পরীক্ষা চলাকালীন সময়েই বন্দরের কনসাইনমেন্ট ছাড়ের ব্যবস্থা করা। দেবব্রত রায় চৌধুরী জানান, কনসাইনমেন্ট বন্দরে রেখে নমুনা পরীক্ষা করলে রিপোর্ট পেতে প্রায় ১৫ দিন সময় লাগে, অথচ চার দিন পর থেকেই ডেমারেজ গণনা শুরু হয়। এর ফলে শুধু তাদের প্রতিষ্ঠানকেই বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকা ডেমারেজ গুনতে হয়। তিনি আরও বলেন, নমুনা পরীক্ষার সময়ই যদি এনবিআর কনসাইনমেন্ট ক্লিয়ার করার অনুমতি দেয়, তাহলে আমদানিকারকদের অতিরিক্ত ডেমারেজ দিতে হবে না এবং এটি আরও কার্যকর সমাধান হবে। একই মত প্রকাশ করে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, দ্রুত কনসাইনমেন্ট ছাড় নিশ্চিত করা গেলে খরচ কমবে এবং বাণিজ্যের দক্ষতা বাড়বে।