কাগজে-কলমে নিবন্ধিত, প্রধান কার্যালয় ও বিভাগীয়-জেলা অফিসের ঠিকানাসহ সব আনুষ্ঠানিকতা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে অস্তিত্বহীন ১৪টি প্রতিষ্ঠানের নামে ২৩টি ঋণ দেখিয়ে ৪৭৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড (আইএলএফএসএল) এসব ঋণ বিতরণ করে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে আলোচিত পি কে হালদারসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
দুদকের সূত্র বলেছে, অনুসন্ধান শেষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ১৪টি পৃথক মামলা করার সুপারিশ করা হবে। অভিযোগ রয়েছে, পি কে হালদার ২০১৬ সালে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর নামে-বেনামে সেখান থেকে দেড় হাজার কোটির বেশি টাকা বের করে নেন। দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং পাচারের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন।
দুদকের সূত্র অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে নামসর্বস্ব ১৪টি প্রতিষ্ঠানের নামে মোট ২৩টি ঋণের মাধ্যমে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বের করে নেওয়া হয়, যা পরে বিভিন্ন কৌশলে আত্মসাৎ ও পাচার করা হয়েছে। এ ঘটনায় ৪৭৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদকের উপপরিচালক মো. মশিউর রহমানের নেতৃত্বাধীন একটি টিম। তিনি জানান, ১৪টি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া ২৩টি ঋণের মাধ্যমে এই অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং অনুসন্ধান শেষে পি কে হালদারসহ সংশ্লিষ্ট অর্ধশতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ১৪টি পৃথক মামলা করার সুপারিশ করা হবে।
দুদকের সূত্র জানায়, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস থেকে কাগুজে ও নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ দিতে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি ও মিথ্যা তথ্য ব্যবহার করা হয়। যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটির একশ্রেণির কর্মকর্তা এসব নথির ভিত্তিতে ঋণ অনুমোদন করেন এবং পরে পারস্পরিক যোগসাজশে ঋণের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২৩টি ঋণের মধ্যে রেপটাইলস ফার্মা লিমিটেডের নামে দুটি ঋণের মাধ্যমে যথাক্রমে ৩০ কোটি এবং ২৭ কোটি ৮৬ লাখ ৫৩ হাজার ৬৯০ টাকা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া নর্দান জুট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেডের নামে নেওয়া হয়েছে ২৯ কোটি ৬৪ লাখ ৯৯ হাজার ৪৩৩ টাকা।
পি অ্যান্ড এল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের নামে ৪৯ কোটি ৭৪ লাখ ৯৮ হাজার ২৮৩ টাকা, এমএসটি ফার্মা অ্যান্ড হেলথকেয়ার লিমিটেডের নামে ৫৬ কোটি ৪৪ লাখ ৯২৭ টাকা, ক্রসরোড করপোরেশন লিমিটেডের নামে তিনটি ঋণের মাধ্যমে যথাক্রমে ২২ কোটি, ২৭ কোটি ৫০ লাখ ৯০ হাজার ও ৯ কোটি টাকা এবং ডিজাইন অ্যান্ড সোর্স লিমিটেডের নামে দুটি ঋণের মাধ্যমে নেওয়া হয় যথাক্রমে ১০ কোটি ৪৫ লাখ ও ৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া পদ্মা ওয়েভিং লিমিটেডের নামে ৬৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, এমওএইচ ফ্যাশন লিমিটেডের নামে ১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা, শাহাদাত ট্রেডার্সের নামে দুটি ঋণের মাধ্যমে ২৯ কোটি ৭৩ লাখ ও ৩০ কোটি টাকা, জেড এ অ্যাপারেলস লিমিটেডের নামে ২৫ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়।
সুপিরিয়র টেক্সটাইল লিমিটেডের নামে ৪২ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, সিমটেক্স টেক্সটাইল লিমিটেডের নামে দুটি ঋণে যথাক্রমে ২৩ কোটি ৮১ লাখ ও ২৭ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, এম জে ট্রেডিংয়ের নামে দুটি ঋণে ৩০ কোটি ও ১৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা এবং সন্দীপ করপোরেশনের নামে দুটি ঋণে যথাক্রমে ২৭ কোটি ও ২৮ কোটি টাকা নেওয়া হয়। দুদক জানিয়েছে, সুদসহ বর্তমানে এসব ঋণের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৭৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এছাড়া পি কে হালদার ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে অর্ধশতাধিক মামলা রয়েছে এবং একটি দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের মামলায় ২০২৩ সালে ঢাকার একটি আদালত তাঁকে ২২ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন।
দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নামে-বেনামে কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেওয়ার ঘটনা দেশের আর্থিক খাতের বড় ব্যর্থতা। অতীতে আর্থিক অনিয়মের মাধ্যমে দেশের অর্থ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। এর থেকে উত্তরণে জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা ও সুশাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
