পাউরুটি উৎপাদনের পর বাজারজাত ও প্যাকেটজাত করার সময় পটাশিয়াম ব্রোমেট সংক্রান্ত সতর্কবার্তা এবং ব্যবহৃত উপকরণের নাম বাধ্যতামূলকভাবে উল্লেখ নিশ্চিত করার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পাউরুটিতে ক্যানসার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক পটাশিয়াম ব্রোমেটের ব্যবহার বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়। রিট দায়েরের পর মুভমেন্ট ফর হিউম্যান রাইটস ও গুড গভর্নেন্স ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান কবীর আলমগীর জানান, সম্প্রতি ‘পাউরুটিতে মিলছে ক্যান্সারের উপাদান’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি সংবাদ প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই এই রিটটি করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডসহ বিশ্বের ৪০টি দেশে পটাশিয়াম ব্রোমেট নিষিদ্ধ। বাংলাদেশের নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ২০২২ সালে খাদ্যপণ্যে পটাশিয়াম ব্রোমেটের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। তারপরও পটাশিয়াম ব্রোমেটের ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। আমরা চাই না অনিরাপদ খাদ্যের কারণে মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ুক। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এসব কারণে রিটটি দায়ের করেছি।
রিট আবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভেজাল খাদ্যের কারণে দেশে প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। বাংলাদেশে প্রতিবছর ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে; বছরে প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার মানুষ এ রোগে মৃত্যুবরণ করেন এবং নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন এক লাখ ৬৭ হাজারেরও বেশি। বর্তমানে দেশে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা প্রায় তিন লাখ ৪৬ হাজারে পৌঁছেছে। এছাড়া দেশের প্রায় ১৬ শতাংশ মানুষ কিডনি জটিলতায় ভুগছেন বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় কোনো ধরনের নিয়মনীতি অনুসরণ না করে অপরিকল্পিতভাবে বেকারিতে পাউরুটি উৎপাদন করা হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
রিটকারীর আইনজীবী সঞ্জয় মণ্ডল বলেন, ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে নিজেদের সহায়-সম্বল ও ভিটামাটি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন—এই পরিস্থিতির অবসান প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, খাদ্যের মাধ্যমে যেন কোনোভাবেই প্রাণঘাতী ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান মানুষের শরীরে প্রবেশ না করে, সেটিই তাদের মূল দাবি। এই প্রেক্ষিতে পাউরুটিতে পটাশিয়াম ব্রোমেটের ব্যবহার নিষিদ্ধের নির্দেশনা চেয়ে জনস্বার্থে রিটটি দায়ের করা হয়েছে। তিনি জানান, চলতি সপ্তাহের যেকোনো দিন বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে এ বিষয়ে শুনানি হতে পারে।
২০২১ সালের ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় পাউরুটিতে অতিরিক্ত মাত্রায় পটাশিয়াম ব্রোমেট ব্যবহারের প্রমাণ মেলে। পটাশিয়াম ব্রোমের বিরুদ্ধে ওই বছর প্রচার কার্যক্রম চালায় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। ওই বছর ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকা ১৯টি পাউরুটির নমুনা পরীক্ষা করে ১৬টির ক্ষেত্রে বা ৮৪ শতাংশে মাত্রাতিরিক্ত পটাশিয়াম ব্রোমেট পাওয়া যায়। পাউরুটিগুলোতে পটাশিয়াম ব্রোমেটের মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৩১ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন) থেকে ১২ দশমিক ৯১ পিপিএম। অর্থাৎ ব্যবহৃত আটার ১০ লাখ ভাগের ৩ দশমিক ৩১ থেকে ১২ দশমিক ৯১ ভাগ পটাশিয়াম ব্রোমেট।
পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে রুটি, পাউরুটি ও অন্যান্য বেকারি পণ্যে পটাশিয়াম ব্রোমেট ও পটাশিয়াম আয়োডেটের ব্যবহার বন্ধে নির্দেশনা দিয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। এতে পাউরুটি ও বেকারি খাদ্যে সংযোজক হিসেবে পটাশিয়াম ব্রোমেট (KBrO₃) এবং পটাশিয়াম আয়োডেট (KIO₃) ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সংস্থাটি জানায়, পটাশিয়াম ব্রোমেট মানবদেহে থাইরয়েডজনিত সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে এবং এটি ক্লাস টু-বি কার্সিনোজেন হিসেবে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। পাশাপাশি এটি একটি জেনোটক্সিক কার্সিনোজেন, যা জিনগত পরিবর্তন ও মিউটেশনের কারণ হতে পারে। এ ছাড়া ডায়রিয়া, বমিভাব ও পেটের সমস্যাসহ বিভিন্ন উপসর্গও দেখা দিতে পারে। এ কারণে বেকারি খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের পণ্যে এসব রাসায়নিকের ব্যবহার দ্রুত বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নেওয়া কিছু নমুনায় পটাশিয়াম ব্রোমেটের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এ নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট ও ডাটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে। এ ছাড়া তিনটি নমুনা পরীক্ষায় ক্যালসিয়াম প্রোপিওনেট পাওয়া গেছে। যা থাকার কথা ০.৭ শতাংশ, সেখানে মিলেছে ১ দশমিক ৫৭ শতাংশ। যা মানবদেহ ও স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। পটাশিয়াম ব্রোমেট এবং পটাশিয়াম আয়োডেট এই দুই উপদান মেশানো রুটি, পাউরুটি এবং বেকারি পণ্য মোড়কহীন কিংবা মোড়কে মজুদ, পরিবহন ও বিক্রি থেকে বিরত থাকার নির্দেশনাও দেওয়া হয়।
পাউরুটি উৎপাদনের জন্য ২০১৬ সালে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) একটি মান নির্ধারণ করে। সে সময় পাউরুটি ইমপ্রুভার হিসেবে অ্যামোনিয়াম পারসালফেট, পটাশিয়াম ব্রোমেট, পটাশিয়াম আয়োডেট, ক্যালসিয়াম কার্বনেট, অ্যাসিড ক্যালসিয়াম ফসফেট ও ক্যালসিয়াম ফসফেট ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি প্রতি কেজি পাউরুটিতে সর্বোচ্চ ৫ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম ব্রোমেট ব্যবহারের সীমাও নির্ধারণ করা হয়। তবে পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে এই রাসায়নিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ হওয়ায়, ২০১৮ সালে বিএসটিআই পাউরুটিতে পটাশিয়াম ব্রোমেট ও পটাশিয়াম আয়োডেটের ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
বহুল ব্যবহৃত পাউরুটিতে শুরু থেকেই ইস্ট ব্যবহার করে এটি ফুলানো হতো। কিন্তু দাম বেশি হওয়ায় এর ব্যবহার কমে যায়। এরপর বাংলাদেশ, ভারতসহ কিছু দেশে রুটি ফুলাতে খাবার সোডা ব্যবহৃত হতে থাকে। তবে নব্বইয়ের দশক থেকে অনেক দেশে আটার খামিরকে দীর্ঘ সময় রেখে দেওয়ার জন্য বেকারির মালিকেরা পটাশিয়াম ব্রোমেট ব্যবহার উৎসাহিত করেন। এটি দামেও সস্তা এবং পাউরুটিকে আকর্ষণীয়ভাবে ফোলানো ও নানা আকৃতি দেওয়ায় ওই বিষাক্ত উপাদানটি বেশ কার্যকর।
