নারায়ণগঞ্জের প্লামি ফ্যাশন্স লিমিটেডের কাছে আইএফআইসি ব্যাংকের পাওনা প্রায় ২৬৭ কোটি টাকা। দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকটের কারণে ঋণটি ব্যাংকের খাতায় ‘ব্যাড/লস’ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক সুদ ও অন্যান্য চার্জ বাবদ প্রায় ১৩৩ কোটি টাকা মওকুফ চেয়ে বাকি প্রায় ১৩৪ কোটি টাকা এককালীন পরিশোধের মাধ্যমে ঋণ নিষ্পত্তির প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত। একদিকে প্লামি ফ্যাশন্স সমঝোতার মাধ্যমে ঋণ পরিশোধ করতে চাইছে, অন্যদিকে ঋণ আদায়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে আইএফআইসি ব্যাংক। ব্যাংকের করা মামলায় প্রায় ২৬২ কোটি ৫২ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছে। ফলে প্রস্তাবিত সমঝোতা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করছে ব্যাংকের সিদ্ধান্তের ওপর।
প্লামি ফ্যাশন্সের কারখানা নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার উত্তর নরসিংপুরে। প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাংকের মোট পাওনা ২৬৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে মামলা চলা কালীন সুদ, সাসপেন্সে থাকা সুদ এবং আয় হিসেবে স্থানান্তর করা সুদ মিলিয়ে প্রায় ১৩২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা মওকুফ চাওয়া হয়েছে। বাকি ১৩৪ কোটি ৩ লাখ টাকা এককালীন পরিশোধের মাধ্যমে ঋণ নিষ্পত্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। গত ১০ আগস্ট অনুষ্ঠিত পরিচা লনা পর্ষদের সভায় কারখানা বিক্রির মাধ্যমে ঋণের মূল টাকা পরিশোধের সিদ্ধান্ত হয়।
নথিতে প্লামি ফ্যাশন্সের আর্থিক সংকটে পড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব কারখানা স্থাপনে প্রত্যাশার তুলনায় বেশি বিনিয়োগ করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। সেই বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত বাড়তি দাম মেলেনি ক্রেতাদের কাছ থেকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা। মন্দার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের অর্ডার কমে যায়। ফলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক আয় কমতে থাকে। ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে আইএফআইসি ব্যাংকের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি ও ব্যবসায়িক লেনদেন বন্ধ রয়েছে। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ৩০ জুন প্লামি ফ্যাশন্সের ঋণ ‘ব্যাড/লস’ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা হয়।
আর্থিক সংকটের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা কাঠামো পরিবর্তনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। গত ১৬ জুন নতুন ক্রেতাদের কাছে শেয়ার হস্তান্তরের জন্য আইএফআইসি ব্যাংকের কাছে অনাপত্তিপত্র বা এনওসি চায় প্লামি ফ্যাশন্স। তবে ব্যাংক ২২ জুন সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। এরপর পরিস্থিতি আরও জটিল হলে কারখানা বিক্রি করে ঋণের মূল টাকা পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেয় পরিচালনা পর্ষদ।
সংকটের নেপথ্যে
পরিবেশবান্ধব গ্রিন ফ্যাক্টরি হিসেবে সুনাম থাকলেও প্লামি ফ্যাশন্সের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে। নথি অনুযায়ী, সবুজ কারখানা গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠানটি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি অর্থ বিনিয়োগ করলেও এর সুফল পায়নি। পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের জন্য ক্রেতাদের কাছ থেকে যে বাড়তি দাম প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তাও আদায় করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতির মন্দার প্রভাবে পোশাক খাতে ক্রয়াদেশ কমে যায়। উৎপাদন ব্যয় ও ব্যাংকঋণের কিস্তি অপরিবর্তিত থাকলেও আয় কমতে থাকায় নগদ অর্থপ্রবাহে সংকট তৈরি হয় এবং একপর্যায়ে ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয় ২০২৪ সালের নভেম্বরে, যখন আইএফআইসি ব্যাংকের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি ও অন্যান্য ব্যবসায়িক লেনদেন বন্ধ হয়ে যায়। এতে স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম আরও ব্যাহত হয়। ধারাবাহিক সংকটের মধ্যে ২০২৫ সালের ৩০ জুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটির ঋণ ‘ব্যাড/লস’ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করে, যা ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের সর্বোচ্চ শ্রেণি। এরপর ঋণ নিষ্পত্তির উদ্যোগ জোরালো হয়। একসময় পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে পোশাকশিল্পে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হলেও বড় অঙ্কের ঋণ খেলাপি হওয়ায় এখন প্লামি ফ্যাশন্সের টিকে থাকা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
কারখানা বিক্রির উদ্যোগ
সংকট মোকাবিলায় প্রথমে মালিকানা কাঠামো পরিবর্তনের চেষ্টা করে প্লামি ফ্যাশন্স। গত ১৬ জুন নতুন ক্রেতাদের কাছে শেয়ার হস্তান্তরের জন্য আইএফআইসি ব্যাংকের কাছে অনাপত্তিপত্র বা এনওসি চাওয়া হয়। তবে ২২ জুন ব্যাংক সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। ফলে মালিকানা হস্তান্তরের মাধ্যমে সংকট সমাধানের পথ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বিকল্প হিসেবে পুরো কারখানা বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয় প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ। গত ১০ আগস্টের পর্ষদ সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কারখানা বিক্রি করে পাওয়া অর্থ দিয়ে ব্যাংকের ঋণের মূল টাকা এককালীন পরিশোধ করা হবে। এ বিষয়ে পরদিনই আইএফআইসি ব্যাংককে চিঠি দেয় প্লামি ফ্যাশন্স। চিঠিতে জানানো হয়, কারখানা বিক্রির উদ্যোগ ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে। বিক্রয়মূল্য থেকে মূল ঋণ পরিশোধ এবং সুদ ও অন্যান্য চার্জ মওকুফের মাধ্যমে পুরো ঋণ নিষ্পত্তির পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়। তবে কারখানা বিক্রির প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। বিক্রি সম্পন্ন না হলে প্রস্তাবিত সমঝোতা পরিকল্পনা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে পারে। একই সঙ্গে কারখানাটির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম কীভাবে চলবে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
ব্যাংকের মামলা
একদিকে সমঝোতার প্রস্তাব, অন্যদিকে আইনি পদক্ষেপ—দুই পথেই এগিয়েছে আইএফআইসি ব্যাংক। ঋণ আদায়ে গত ৮ জুলাই নারায়ণগঞ্জের অর্থঋণ আদালতে প্লামি ফ্যাশন্সের বিরুদ্ধে মামলা করে ব্যাংক, যার নম্বর ১৭৩/২০২৬। মামলায় ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রায় ২৬২ কোটি ৫২ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছে। তবে আদালতে দাবিকৃত অর্থের সঙ্গে প্লামি ফ্যাশন্সের প্রস্তাবিত পরিশোধের অঙ্কে বড় ব্যবধান রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১৩৪ কোটি টাকা এককালীন পরিশোধ করে ঋণ নিষ্পত্তির প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংক আদালতে প্রায় দ্বিগুণ অর্থ আদায়ের দাবি জানিয়েছে। ফলে সমঝোতা ও মামলা—দুই প্রক্রিয়া একসঙ্গে চলায় চূড়ান্ত ফলাফল কী হবে, তা এখনই বলা কঠিন।
ব্যাংকের নথি অনুযায়ী, আদালতের বাইরে প্রস্তাবিত প্রায় ১৩৪ কোটি টাকা আদায় করা সম্ভব হলে খেলাপি ঋণটি নিষ্পত্তি হবে এবং ব্যাংকের সামগ্রিক খেলাপি ঋণের অনুপাতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে সমঝোতা ব্যর্থ হলে মামলার মাধ্যমেই ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে হবে ব্যাংককে। এ ক্ষেত্রে ঋণ আদায়ে আরও সময় লাগতে পারে এবং প্রক্রিয়াটি ব্যয়বহুলও হতে পারে।
বন্ধকী সম্পদের দাম নিয়ে প্রশ্ন
প্লামি ফ্যাশন্সের ঋণের বিপরীতে বন্ধক রাখা সম্পদের মূল্য নিয়েও বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। ব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির ২৩৭ দশমিক ৫০ ডেসিমেল জমি ও ভবনের বাজারমূল্য প্রায় ৪৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। কারখানার যন্ত্রপাতির বাজারমূল্য প্রায় ৭২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে জমি, ভবন ও যন্ত্রপাতির মোট বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১২২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অথচ ব্যাংকের পাওনা প্রায় ২৬৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ বন্ধকী সম্পদের বাজারমূল্য পাওনার প্রায় অর্ধেক। শুধু বাজারমূল্য নয়, দ্রুত বিক্রি বা দুর্যোগজনিত পরিস্থিতিতে এসব সম্পদ থেকে পাওয়া যেতে পারে এমন মূল্য আরও কম।
ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বন্ধকী সম্পদের ডিস্ট্রেস ভ্যালু বা দ্রুত বিক্রয়মূল্য ৯৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। পাওনা ও সম্পদের মূল্যের এই বড় ব্যবধান ব্যাংকের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন করে তুলেছে। বন্ধকী সম্পদ বিক্রি করেও পুরো পাওনা আদায় করা কঠিন হতে পারে। ফলে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া হবে, নাকি প্লামি ফ্যাশন্সের প্রস্তাব অনুযায়ী এককালীন অর্থ আদায়ের মাধ্যমে ঋণ নিষ্পত্তি করা হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
পুরো পাওনা আদায় নাকি মওকুফ
আইএফআইসি ব্যাংকের জন্য বিষয়টি শুধু একটি ঋণ হিসাবের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে খেলাপি ঋণের পরিমাণ, বন্ধকী সম্পদের প্রকৃত মূল্য এবং মামলা পরিচালনার সময় ও খরচের বিষয়ও জড়িত। প্লামি ফ্যাশন্সের কাছে ব্যাংকের মোট পাওনা ২৬৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রায় ১৩২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা সুদ ও সংশ্লিষ্ট খাতে মওকুফ চাওয়া হয়েছে। বিপরীতে ১৩৪ কোটি ৩ লাখ টাকা এককালীন পরিশোধের প্রস্তাব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে ব্যাংককে পাওনার বড় একটি অংশ ছাড় দিতে হবে। তবে এককালীন প্রস্তাবিত অর্থ আদায় করা গেলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। অন্যদিকে আদালতের মাধ্যমে মামলা চালিয়ে বন্ধকী সম্পদ বিক্রি করে অর্থ আদায়ে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। তাছাড়া বন্ধকী সম্পদের ডিস্ট্রেস ভ্যালু মাত্র ৯৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকা হওয়ায় আদালতের মাধ্যমে সম্পদ বিক্রি করলেও ব্যাংকের পুরো পাওনা আদায় সম্ভব হবে না। ফলে সমঝোতা নাকি মামলা—কোন পথে গেলে ব্যাংকের জন্য বেশি কার্যকর হবে, তা নিয়ে বিশ্লেষণ করছে কর্তৃপক্ষ।
সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
প্লামি ফ্যাশন্সের পক্ষ থেকে প্রায় ১৩৩ কোটি টাকা সুদ ও অন্যান্য চার্জ মওকুফ করে প্রায় ১৩৪ কোটি টাকা এককালীন পরিশোধের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ঋণ আদায়ে আদালতে মামলা করেছে আইএফআইসি ব্যাংক। ফলে এখন প্রস্তাবিত অর্থ এককালীন আদায়ের মাধ্যমে ঋণ নিষ্পত্তি করা হবে, নাকি আদালতের চলমান প্রক্রিয়াই অব্যাহত থাকবে—তা নিয়ে সিদ্ধান্তের বিষয়টি সামনে এসেছে।
কারখানা বিক্রির চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ব্যাংকের পাওনা আদায়ের পথ সহজ হতে পারে। তবে বিক্রির প্রক্রিয়া শেষ না হলে বা প্রস্তাবিত অর্থ আদায় করা সম্ভব না হলে ঋণ নিষ্পত্তি আবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে পারে। এর সঙ্গে বন্ধকী সম্পদের বাজারমূল্য ও ডিস্ট্রেস ভ্যালুর তুলনায় ব্যাংকের মোট পাওনার বড় ব্যবধান থাকায় বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
