হামের চিকিৎসায় ৮৯% পরিবার ঋণগ্রস্ত

হামের প্রাদুর্ভাব কেবল জনস্বাস্থ্যের জন্যই নয়, নিম্ন আয়ের অসংখ্য পরিবারের জন্য বড় ধরনের আর্থিক সংকটও তৈরি করেছে। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে হলেও ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যাতায়াত, খাবার ও হাসপাতালে অবস্থানের আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে গিয়ে আক্রান্ত পরিবারের প্রায় ৮৯ শতাংশকেই ঋণ নিতে হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ১০টি পরিবারের মধ্যে প্রায় ৯টিই চিকিৎসা ব্যয় সামলাতে ধারদেনার ওপর নির্ভর করেছে। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস) এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (আইএফআরসি) পরিচালিত এক জরিপে এ চিত্র উঠে এসেছে। সোমবার প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দেশের ১২টি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া হামে আক্রান্ত ২ হাজার ৭৪৬টি পরিবারের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ ফলাফল পাওয়া গেছে।

জরিপে দেখা গেছে, চিকিৎসার খরচ জোগাতে ৬১ শতাংশ পরিবার নিজেদের সঞ্চয় ভেঙেছে। ৪ শতাংশ পরিবার সম্পদ বিক্রি করেছে এবং ৩ শতাংশ পরিবার দান বা মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভর করেছে। হামের আর্থিক অভিঘাত শুধু চিকিৎসা খরচের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; অনেক অভিভাবক অসুস্থ সন্তানের পাশে হাসপাতালে থাকতে গিয়ে নিয়মিত কাজে যেতে পারেননি। ফলে দৈনিক মজুরি হারিয়েছেন, মাসিক আয় বন্ধ হয়েছে। কেউ কেউ দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে চাকরিও হারিয়েছেন। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।

জরিপ অনুযায়ী, একজন হামে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট খাতে গড়ে খরচ হয়েছে ১৫ হাজার ৬১১ টাকা, যা প্রায় ১৬ হাজার টাকার সমান। কোনো কোনো পরিবারের ক্ষেত্রে এই ব্যয় ৬৫ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারের মধ্যে ৭৮ শতাংশের প্রধান উপার্জনকারী অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। পারিবারিক আয়ের চিত্রও উদ্বেগজনক। ৪০ শতাংশ পরিবারের মাসিক আয় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা, ৩২ শতাংশের আয় ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা, ১৬ শতাংশের আয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা এবং ১২ শতাংশ পরিবারের মাসিক আয় ৬ হাজার টাকার কম।

আক্রান্তদের বয়স বিশ্লেষণে দেখা যায়, হামে আক্রান্তদের মধ্যে ৭৫ শতাংশই চার বছরের কম বয়সী শিশু; ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী রোগী ১৯ শতাংশ এবং ১৮ বছরের বেশি বয়সী মাত্র ৬ শতাংশ। অর্থাৎ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে অল্পবয়সী শিশুরা, যাদের অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। ভৌগোলিক দিক থেকে জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারের মধ্যে ৩২ শতাংশ ঢাকার, ২২ শতাংশ চট্টগ্রামের, ২০ শতাংশ বরিশালের, ১৮ শতাংশ ময়মনসিংহের; রাজশাহী ও রংপুরের ৩ শতাংশ করে, খুলনার ২ শতাংশ এবং সিলেটের ১ শতাংশ পরিবার অন্তর্ভুক্ত ছিল। জরিপে অংশ নেওয়া সব পরিবারই কোনো না কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে ৩৫ শতাংশ পরিবার ওষুধকে সবচেয়ে জরুরি সহায়তা হিসেবে উল্লেখ করেছে, ৩৩ শতাংশ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ), ২২ শতাংশ খাদ্য, ১১ শতাংশ যাতায়াত ব্যয়, ৩ শতাংশ বাড়ি ভাড়া এবং ২ শতাংশ যোগাযোগ ব্যয়ের সহায়তা চেয়েছে; তবে সামগ্রিকভাবে সবাই সরাসরি আর্থিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।

জরিপটির উদ্দেশ্য ছিল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে শনাক্ত করে তাদের জরুরি সহায়তার আওতায় আনা। এ মূল্যায়নের ভিত্তিতে ২ হাজার ৭৪৬ পরিবারের মধ্য থেকে ২ হাজার ৪০০টি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে বাছাই করা হয়েছে, যাদের প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা দেওয়া হবে। রংপুরের হাজেরা খাতুনের অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতারই প্রতিফলন। গত জুনে ১১ মাস বয়সী মেয়েকে নিয়ে তিনি ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসেন। এ পর্যন্ত তাদের পরিবারের খরচ ৭০ হাজার টাকার বেশি হয়েছে। তিনি জানান, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে হলেও অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, খাবার ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে বড় অঙ্কের ব্যয় বহন করতে হয়েছে, যা সামলাতে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার নিতে হয়েছে। এদিকে তার স্বামী সৌদি আরবে কর্মরত থাকলেও ওই মাসে বেতন না পাওয়ায় আর্থিক সংকট আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সেক্রেটারি জেনারেল ড. কবির এম আশরাফ আলম বলেন, মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, অনেক পরিবার শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকিতেই নয়; বড় ধরনের আর্থিক সংকটেও পড়েছে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নগদ সহায়তার পাশাপাশি কমিউনিটিতে সচেতন করা হচ্ছে। বাংলাদেশে আইএফআরসির হেড অব ডেলিগেশন আলবার্তো বোকানেগ্রা বলেন, হামের প্রভাব হাসপাতালের দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অসুস্থ শিশু বা পরিবারের সদস্যের পরিচর্যা করতে গিয়ে বহু পরিবার আয় হারাচ্ছে এবং আর্থিক সংকটে পড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মানবিক সহায়তার পাশাপাশি শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাও জরুরি।