স্থানীয় নির্বাচনে পোস্টাল ভোট না রাখার চিন্তা ইসির

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ না রাখার বিষয়টি বিবেচনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে এই পদ্ধতিতে প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়া এবং উচ্চ ব্যয় এড়ানোর লক্ষ্যেই এমন ভাবনা তাদের। তবে এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি সাংবিধানিক সংস্থাটি। ইসি কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে প্রথমে প্রবাসী বাংলাদেশি এবং পরে দেশের অভ্যন্তরে তিন শ্রেণির ভোটারের জন্য আইটি-সমর্থিত পোস্টাল ব্যালট চালু করা হয়েছিল। কিন্তু এতে আশানুরূপ সাড়া মেলেনি। বিশেষ করে প্রবাসী ভোটারদের আগ্রহ ছিল তুলনামূলক কম। সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশে কিছুটা উৎসাহ দেখা গেলেও অধিকাংশ দেশের প্রবাসীরা এ পদ্ধতির প্রতি তেমন গুরুত্ব দেননি।

আবার এতে সংশ্লিষ্ট ভোটারদের যেটুকু সাড়া মিলেছে, সেটা বাস্তবায়ন করতে গিয়েও বিশাল অংকের অর্থের অপচয় হয়েছে। নিবন্ধন করেও অনেকে ভোট না দেওয়ায় এবং প্রক্রিয়াগত জটিলতায় এমন পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। এছাড়া জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে পোস্টাল ব্যালটে ভোটদানের ক্ষেত্রে যেটুকু উৎসাহ ছিল, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেটাও নেই। এসব কারণে পরিকল্পনায় থাকা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিশেষত প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালটে ভোটগ্রহণ থেকে সরে আসতে চাইছে ইসি।

প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুতি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সুপারিশের প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) পোস্টাল ব্যালটে ভোটের সুযোগ দিতে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন করে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে আইটি-সমর্থিত পোস্টাল ব্যালট প্রকল্প গ্রহণ করা হয় এবং অতিরিক্ত ৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপ চালু করা হয়। প্রাথমিকভাবে প্রবাসী ভোটারদের জন্য চালু করা হলেও পরে দেশের ভেতরে ভোটের দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং আইনি হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের (কারাবন্দি)ও এই ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়। প্রবাসীদের ক্ষেত্রে ডাক বিভাগের মাধ্যমে ব্যালট পাঠানো ও ফেরত আনার পুরো প্রক্রিয়ায় প্রতি ভোটারের জন্য প্রায় ৭০০ টাকা ব্যয় ধরা হয়। আর দেশের অভ্যন্তরে প্রতিটি ভোটারের জন্য ব্যয় নির্ধারণ করা হয় প্রায় ৫০ টাকা।

ইসি সূত্র বলছে, গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে মোট ১৫ লাখ ২৮ হাজার ১৩১ জন ভোটার নিবন্ধন করেন। এর মধ্যে প্রবাস থেকে ৭ লাখ ৬৭ হাজার ২৩৩ জন এবং দেশের ভেতরে ৭ লাখ ৬০ হাজার ৮৯৮ জন নিবন্ধিত হন। তাদের ভোট দিতে ডাকযোগে ব্যালট পাঠানো হয়েছিল। তবে দেশ-বিদেশ মিলিয়ে ১২ লাখ ২৪ হাজার ১৮৮ জন ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে প্রবাস থেকে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৩৭২ জন এবং দেশের ভেতর ৬ লাখ ৮০ হাজার ১১৬ জন ভোট দিয়েছেন। ভোট পড়েছে নিবন্ধিতদের ৮০ দশমিক ১১ শতাংশ।

এদিকে, পোস্টাল ব্যালটে ভোটের ক্ষেত্রে অর্থের অপচয়ও ঘটেছে অনেকটাই। ইসির হিসেবেই ব্যালট পাঠালেও ভোট দেননি ২ লাখ ২২ হাজার ৮৬১ জন প্রবাসী। এক্ষেত্রে পুরোপুরি অপচয় হয়েছে ১৫ কোটি ৬০ লাখ টাকার বেশি। আবার ভোট দিয়ে ফেরত পাঠালেও সঠিকভাবে ভোট না দেওয়ায় বাতিল হওয়ায় প্রবাসীদের ২ লাখ ৯৫ হাজার ২৬০টি ব্যালটও কোনো কাজে আসেনি। এতে অপচয় হয় ২০ কোটি ৬৬ লাখ ৮২ হাজার টাকা। একইভাবে দেশের অভ্যন্তরে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৩৭৪টি ব্যালট কোনো কাজে আসেনি। ফলে গচ্চা গেছে প্রায় ৮০ লাখ টাকা।

ইসি কর্মকর্তাদের মতে, শুরুতে বিশ্বের ১৪০টি দেশ থেকে প্রায় ৫০ লাখ প্রবাসী পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটে অংশ নেবেন—এমন প্রত্যাশা ছিল। এ লক্ষ্য সামনে রেখে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারসহ ইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিভিন্ন দেশে গিয়ে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন ও প্রবাসীদের উদ্বুদ্ধ করার উদ্যোগ নেন। পরবর্তীতে নিবন্ধনের ধারা দেখে ধারণা করা হয়েছিল, অন্তত ১০ লাখ প্রবাসী ভোটার এতে যুক্ত হবেন। দেশি ভোটারদের সঙ্গে মিলিয়ে এ সংখ্যা ২০ লাখে পৌঁছাতে পারে বলেও আশা করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তবুও প্রবাস ও দেশে প্রচলিত ডাকযোগে ভোটের পরিবর্তে আইটি-সমর্থিত পোস্টাল ব্যালট চালু করতে পারাকে আংশিক সাফল্য হিসেবে দেখছে নির্বাচন কমিশন।

জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবির ভিত্তিতেই মূলত আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট ভোটিংয়ের ব্যবস্থা নিয়েছিল ইসি। কিন্তু সেই অর্থে সাড়া মেলেনি। এছাড়া এই প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ অর্থব্যয় যেমন হয়েছে, তেমনি ভোটারদের অজ্ঞতাসহ নানা কারণে বরাদ্দকৃত অর্থের অপচয় হয়েছে। তিনি বলেন, এখন বাস্তবতা হচ্ছে- জাতীয় নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটে ভোটের আইন হয়ে যাওয়ায়, সেখানে এটা আর বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে জাতীয় নির্বাচনে অনেক ব্যয়ের তুলনায় সাড়া কম এবং ভোটারদের আগ্রহ কম থাকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটে ভোটের ব্যবস্থা না রাখার কথা ভাবা হচ্ছে। ইসির বৈঠকেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে নেওয়া হতে পারে।