** চট্টগ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ মাসুদ এলাহীর প্রতিষ্ঠান থেকে পার্টস আমদানি করা হয়
** পার্টসের মধ্যে বিশেষ কায়দায় ঘোষণা বর্হিভূত ৪ কোটি টাকার সিগারেট আমদানি
** কাস্টমস বলছে, রপ্তানিকারক ছাড়া অন্য কেউ প্যাকিং করে না, মাসুদের প্রতিষ্ঠান-ই সিগারেট পাঠিয়েছে
** মৈত্রী অটোমোবাইলস পানগাঁও কাস্টম হাউস দিয়ে সিঙ্গাপুর ও জাপান থেকে পাঁচবার পার্টস আমদানি করেছে, কিন্তু প্রথমবার দুবাই থেকে পার্টস আমদানি করে, যার মধ্যে আসে সিগারেট
** সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মিতুল ট্রেড সব কন্টেইনার আইসিডি দিয়ে খালাস করে, কেবল সিগারেট চালানের সেই কন্টেইনার পানগাঁও যায়
** সিগারেট চোরাচালানের অভিযোগে জড়িত আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের চারজনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছে
** আমদানিকারক, রপ্তানিকারকের কাস্টমস আইনে বিচার চলমান রয়েছে, আমদানিকারক জামিন নিয়েছেন
** পণ্য আসার কথা আইসিডি কমলাপুর, চোরাচালান করতে এলসি ও আইজিএম সংশোধন করে পানগাঁও নিয়ে আসা হয়
** আমদানিকারকের দাবি, ১২ বছর ধরে ব্যবসা করের, এই ধরনের কিছুর সঙ্গে তিনি জড়িত নন
৪০ ফিট কন্টেইনারে সাধারণত ২৬-২৭ টন পণ্য আমদানি করা যায়। ৪০ ফিটের কন্টেইনারে গাড়ির পার্টস আমদানি হয়েছে, কিন্তু ওজন ছিলো অনেক কম (৭ হাজার কেজি বা ৭ টন)। মাত্র ৩০ লাখ টাকার গাড়ির পার্টস আমদানি হয়েছে, কিন্তু পার্টসের মধ্যে ছিলো প্রায় ৪ কোটি টাকার চোরাচালানের সিগারেট। আর চতুর আমদানিকারক দুবাই থেকে প্রথমবার পানগাঁও বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি করেছেন, যাতে প্রথমবার-ই সিগারেট চোরাচালানের দায়ে ধরা খেয়েছেন। আমদানিকারকের বাড়ি চট্টগ্রাম। আর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট তো আরো চতুর, তিনি সব চালান আইসিডি কমলাপুর দিয়ে খালাস করেন। কিন্তু পার্টস ঘোষণার সিগারেটের চালান খালাস করেছেন পানগাঁও দিয়ে! সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের বাড়িও চট্টগ্রাম। আর পার্টস রপ্তানিকারক তো আরো চতুর। আবার রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের মালিকের বাড়িও চট্টগ্রাম। তিনি দুবাইয়ে পুরাতন পার্টস বিক্রির লাইসেন্স নিয়েছেন। আমদানিকারক-রপ্তানিকারকের যোগসাজস না থাকলে কিভাবে ৩০ লাখ টাকার পার্টসের মধ্যে ৪ কোটি টাকার সিগারেট আসে! চালানটি আসার কথা আইসিডি কমলাপুর। কিন্তু এলসি ও আইজিএম পরিবর্তন করে আনা হয় পানগাঁও বন্দরে। আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট-তিনজনের বাড়ি চট্টগ্রাম। মানে যোজসাজস। মূলত আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের যোগসাজসে ৩০ লাখ টাকার পার্টসের মধ্যে ৪ কোটি টাকার সিগারেট আমদানি করে খালাসের চেষ্টা করেছেন। হ্যাঁ, পুরাতন পার্টসের মধ্যে সিগারেট চোরাচালানের এই ঘটনা ঘটেছে পানগাঁও কাস্টম হাউসে। এই ঘটনায় আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের চারজনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করেছে পানগাঁও কাস্টম হাউস। পাশাপাশি কাস্টম হাউস বিষয়টি তদন্ত করছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা বিজনেস বার্তাকে জানিয়েছেন, চট্টগ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ মাসুদ এলাহী। তিনি দুবাইয়ে পুরাতন পার্টস বিক্রির ট্রেড লাইসেন্স নিয়েছেন। তার প্রতিষ্ঠান থেকে চট্টগ্রামের পার্টস আমদানিকারক মৈত্রী অটোমোবাইলস পার্টস আমদানি করেছেন। এই আমদানিকারক পানগাঁও কাস্টম হাউস দিয়ে পাঁচবার পার্টস আমদানি করেছে। এর মধ্যে সিঙ্গাপুর ও জাপান থেকে পার্টস আমদানি করেছেন। কিন্তু প্রথমবার দুবাই থেকে একটি চালান আমদানি করেছে, তাতে পার্টসের মধ্যে বিশেষ কায়দায় প্রায় ৪ কোটি টাকার সিগারেট আমদানি করা হয়েছে। আর চালানটি আসার কথা আইসিডি কমলাপুর। কিন্তু সুযোগ বুঝে এলসি ও আইজিএম পরিবর্তন করে পানগাঁও আনা হয়েছে। মানে আইসিডি দিয়ে হয়ত চোরাচালানের সিগারেট খালাসের সিগন্যাল পায়নি! রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ছাড়া পণ্য প্যাকিং করে না। আর আমদানিকারক তো অবশ্যই জানে তার কি পণ্য আসছে। এর মানে হলো, আমদানি ও রপ্তানিকারক-দুজনের যোগসাজস রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি যোগসাজস রয়েছে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের। কারণ, সে সব কন্টেইনার আইসিডি কমলাপুর দিলেও এই কন্টেইনার কেন পানগাঁও দিলো! সব বিষয় মাথায় রেখে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান কর্মকর্তারা।
দুবাইয়ের যে প্রতিষ্ঠান থেকে পার্টসের মধ্যে সিগারেট আসে, তার মালিকের বাড়ি চট্টগ্রাম
অনুসন্ধান বলছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা দুবাইয়ের শারজাহ অবস্থিত ‘বাব মাসকাট ইউজড কারস অ্যান্ড স্পেয়ার পার্টস ট্রেডিং’ নামক প্রতিষ্ঠান থেকে পার্টসগুলো আমদানি করা হয়েছে। এই পার্টসের মধ্যে লুকিয়ে এই সিগারেট আনা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্সের তথ্যানুযায়ী, এই প্রতিষ্ঠানের মালিকায় রয়েছে আলী আবদেল রহমান ও মোহাম্মদ মাসুদ এলাহী। এর মধ্যে মোহাম্মদ মাসুদ এলাহীর বাড়ি চট্টগ্রামের চকবাজার এলাকায়। এই প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স ও নথিপত্র বিশ্লেষণ দেখা গেছে, বাব মাসকাট ইউজড কারস অ্যান্ড স্পেয়ার পার্টস ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানটি মূলত অটোমোবাইল বা মোটর গাড়ি খাতের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। লাইসেন্সের অনুমতি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি পুরোনো বা সেকেন্ড-হ্যান্ড যাত্রীবাহী গাড়ি কেনা এবং বিক্রির ব্যবসা করতে পারে। অথবা গাড়ি কেনাবেচার পাশাপাশি বিভিন্ন গাড়ির পুরোনো বা ব্যবহৃত খুচরা যন্ত্রাংশ কেনাবেচা ও সরবরাহের ব্যবসা করার সঙ্গেও জড়িত থাকতে পারে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি সেকেন্ড-হ্যান্ড গাড়ি এবং গাড়ির পুরোনো পার্টস কেনাবেচার ব্যবসা করে। দুবাইয়ের সারজায় জনতা ব্যাংকের শাখায় বাব মাসকাট ইউজড কারস অ্যান্ড স্পেয়ার পার্টস ট্রেডিং এর ব্যাংক হিসাব রয়েছে। ব্যাংক হিসাবের তথ্যানুযায়ী, এই প্রতিষ্ঠানের ৫১ শতাংশ আলী আবদেল রহমান, ২৫ শতাংশ মোহাম্মদ মাসুদ এলাহী ও ২৪ শতাংশ মোহাম্মদ আবদুল মান্নান নামের এক ব্যক্তির মালিকানা রয়েছে। আমদানিকারক মৈত্রী অটোমোবাইলস এর ব্যাংক হিসাব রয়েছে চট্টগ্রামে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকে সিটিএসবি, চট্টগ্রাম হাব শাখায়। আমদানিকারক মৈত্রী অটোমোবাইলস এই পার্টস আমদানি করতে ৩ ফেব্রুয়ারি শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের এই শাখায় ৪৩৮২ ডলারের (প্রায় ৫ লাখ ৩৭ হাজার টাকা) এলসি খোলে। এই এলসির টাকা শারজাহ জনতা ব্যাংকের রপ্তানিকারকের হিসাবে পণ্য আমদানির টাকা পাঠানো হয়েছে। তবে, পার্টসের মধ্যে শুল্ককর ফাঁকি ও মিথ্যা ঘোষণার সিগারেট চট্টগ্রামের এই ব্যক্তির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান থেকে পাঠানো হয়েছে কিনা-তা তদন্ত চলছে।
এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে বাব মাসকাট ইউজড কারস অ্যান্ড স্পেয়ার পার্টস ট্রেডিং এর মালিক মোহাম্মদ মাসুদ এলাহী বিজনেস বার্তার পক্ষ থেকে ই-মেইল করা হয়েছে। কিন্তু কোন জবাব দেওয়া হয়নি।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক কাস্টমস কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এলাহী নামের এই ব্যক্তির প্রতিষ্ঠান থেকে যেহেতু পার্টস আমদানি করা হয়েছে। সেহেতু এই পার্টসের মধ্যে অন্য কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সিগারেট ঢুকানোর সুযোগ নেই। কারণ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান সব পণ্য নিজেরা প্যাকিং করে শিপমেন্ট করে। আর দুবাইয়ের রপ্তানিকারকদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে-ই ঝামেলা রয়েছে। আর আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক-দুজনই চট্টগ্রামের। সেক্ষেত্রে যোজসাজস না থাকলে এটা রপ্তানি সম্ভব হতো না।
কর্মকর্তারা আরো জানিয়েছেন, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান আর কখনো পানগাঁও বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি করেনি। সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টও সেভাবে এই বন্দর দিয়ে পণ্য খালাস করে না। সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট আইসিডি কমলাপুর পোর্ট ও কাস্টম হাউস দিয়ে পণ্য খালাস করে না। সুযোগ বুঝে বা কোন চক্রের প্ররোচনায় পানগাঁও দিয়ে সিগারেটের এই বিশাল চালান খালাসের চেষ্টা করেছে। তবে পানগাঁও কাস্টম হাউসের কর্মকর্তাদের তৎপরতার কারণে এই চালান বের করা সম্ভব হয়নি। বেশিরভাগ চোরাচালানের পণ্য আটক হলে কোন রপ্তানিকারক থেকে পণ্য আমদানি হলো, প্রতিষ্ঠানের মালিক কে, কিভাবে আমদানি হলো, টাকা কিভাবে গেলো-তা কাস্টম হাউসগুলো যাচাই করে না। তবে পানগাঁও দিয়ে আমদানি করা এই সিগারেট চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত সব বিষয় আমরা তদন্ত করতেছি বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
পণ্যের গন্তব্য ছিলো আইসিডি, সুযোগ বুঝে এলসি সংশোধন করে আসে পানগাঁও
পানগাঁও কাস্টম হাউস সূত্রমতে, মৈত্রী অটোমোবাইলস পুরাতন পার্টস আমদানি করতে এলসি খুলতে প্রথমে পণ্যের গন্তব্য দেওয়া হয় আইসিডি কমলাপুর কাস্টম হাউস। কিন্তু পরে এলসি সংশোধন করে পানগাঁও কাস্টম হাউস দেয়া হয়। কর্মকর্তারা বলছেন, প্রথম হয়ত আইসিডি দিয়ে সিগারেট খালাস করতে চেয়েছিলো। কোন কারণে সেখানে বনিবনা হয়নি। শেষে এলসি সংশোধন করে পানগাঁও দেওয়া হয়। পানগাঁও হয়ত কোন সিন্ডিকেট সিগারেট খালাস করা যাবে-এমন সিগন্যাল দিয়েছে। শেষ রক্ষা হয়নি। তবে আমদানিকারক এলসি সংশোধনের ব্যাখ্যা দিয়ে চোরাচালানের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। পানগাঁও কাস্টম হাউস কমিশনারকে দেওয়া ব্যাখ্যায় আমদানিকারক বলেছেন, মালবাহী ট্রেনের সংকট থাকায় আইসিডিতে পণ্য আসতে সময় লাগে। এতে বিলম্ব ও ডেমারেজ চার্জ এড়াতে ১৬ ফেব্রুয়ারি এলসি সশোধন করে পানগাঁও দেওয়া হয়। এতে তাদের কোনো গোপন প্রক্রিয়া ছিলো না।

রপ্তানিকারকের সাফাই: আফ্রিকান গ্রাহককে সিগারেট পাঠাতে ভুলে বাংলাদেশে আসে
কাস্টমস সূত্রমতে, কোন পণ্য রপ্তানির অর্ডার করা হলে রপ্তানিকারক পণ্য প্যাক করে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট বা সহায়তাকারীর সহায়তায় তা পোর্ট বা বন্দরে পাঠায়। সেখান থেকে আমদানিকারকের কাছে চলে আসে। এক্ষেত্রে প্যাকিং রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান-ই করে। তবে কিছু ক্ষেত্রে থার্ড পার্টিকে দেওয়া হয়। কিন্তু কি কি পণ্য প্যাকিং হয়, কিভাবে হয়-তা রপ্তানিকারক বা তাদের প্রতিনিধি তদারকি করেন। আমদানিকারক মৈত্রী অটোমোবাইলস রপ্তানিকারক বাব মাসকাট ইউজড কারস অ্যান্ড স্পেয়ার পার্টস ট্রেডিং থেকে পুরাতন পার্টস ক্রয় করে। দুবাই থেকে চালানটি চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে পানগাঁও কাস্টম হাউসে আসে। সেখানে গাড়ির দরজার মধ্যে বিশেষ কায়দায় সিগারেট আসে। আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট-তিনজনের বাড়ি চট্টগ্রাম। মৈত্রী অটোমোবাইলস নিয়মিতভাবে এই রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান থেকে পার্টস আমদানি করে। এর আগে কোন চালানে সিগারেট বা চোরাচালানের পণ্য আসছে কিনা-তা যাচাই হয়নি। এই চালানে আটক হওয়ার পর রপ্তানিকারক বলছে ভুলে চলে আসছে। কাস্টম হাউসকে ই-মেইলে পাঠানো রপ্তানিকারকের দাবি, অনাকাঙ্খিত পণ্য বা ৩০ লাখ ৮৪ হাজার ৮০০ শলাকা সিগারেট রপ্তানির সঙ্গে রপ্তানিকারকের কোন সম্পৃক্ততা নেই। তাদের থার্ড পার্টি লোডিং ইয়ার্ডের সুপারভাইজারের একটি অনিচ্ছাকৃত ও মারাত্মক ভুল ছিল। আফ্রিকান এক গ্রাহকের জন্য নির্ধারিত মালামাল ভুলবশত এই আমদানিকারকের কন্টেইনারে লোড করা হয়েছে। রপ্তানিকারকের এই ভুলের দায় আমদানিকারক নিতে চায় না। তবে কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, এটা কোনদিন সম্ভব না। রপ্তানিকারক যেখানে ১ টাকার জিনিস বেশি দিতে চায় না, সেখানে প্রায় ৪ কোটি টাকার সিগারেট পাঠাবে? এতে আমদানিকারক-রপ্তানিকারক এবং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট-তিনজনই জড়িত। আর পার্টসের মধ্যে সিগারেট রাখার প্রশ্নই আসে না। রপ্তানিকারক তো পার্টসের ব্যবসা করে, সিগারেটের নয়। তাহলে রপ্তানিকারক আফ্রিকান গ্রাহকের জন্য পার্টস না পাঠিয়ে সিগারেট পাঠাবে? রপ্তানিকারক জেনে-বুঝে এই সিগারেট পাঠিয়ে। আর আমদানিকারক পার্টসের টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠিয়েছে, কিন্তু সিগারেটের টাকা কিভাবে পাঠিয়েছে-তা তদন্ত করা হচ্ছে।
চোরাচালানের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি অস্বীকার করেন আমদানিকারক মৈত্রী অটোমোবাইলসের পার্টনার সাজ্জাদ হোসেন। আমদানিকারক-রপ্তানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ জড়িত-এমন অভিযোগ অস্বীকার তিনি বলেন, সাপ্লাইয়ারের বাড়ি চট্টগ্রাম হলেও সে তো বাইরে ব্যবসা করে। এই ব্যবসায় হয়ত তার ১০ বা ২০ শতাংশ শেয়ার আছে। এত বড় আরবি একটি কোম্পানি, সে তো এত বছর লোকসান করতে পারবে না। কোম্পানি এখন বিপদে আছে। আমার মতো তারও ব্যবসা বন্ধ হয়ে আছে। প্রথমবার দুবাই থেকে আমদানি, যাতে সিগারেট পাওয়া গেছে-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমার ১২ বছরের ব্যবসা। ভারত থেকে আসছে, এখনো একটা পোর্টে আছে। চেক করেছে, সেটাতে কিছু পায়নি। সাপ্লাইয়ারের ভুলে এই মাল এসেছে। এটা আফ্রিকার একটি দেশে যাওয়ার কথা। ভুলে বাংলাদেশে চলে এসেছে। থার্ডপার্টি লোড করেছে। যুদ্ধের আগে আগে সুপারভাইজার লোড করেছে। আফ্রিকায় যেতে কোন এলসি লাগে না। কন্টেইনার লোড করে পাঠিয়ে দেয়। রপ্তানিকারক আফ্রিকার কোন দেশে ভুলে পাঠিয়েছে, যাদের কাছে পাঠিয়েছে, তাদের কোন ডকুমেন্ট আপনাকে দিয়েছে-এমন প্রশ্নে সাজ্জাদ বলেন, কোন ডকুমেন্ট দেয়নি। যোগাযোগ করার পর ই-মেইল দিয়েছে। আমি ২০ টন পার্টস কিনেছি, দিয়েছে ১২ টন। আমি দরজার কিনেছি ৮০টার মতো, পাঠিয়েছে প্রায় ২৫০। আমার অনেক পণ্য দেয়নি। সিগারেট পাঠানোতে পুরাই রপ্তানিকারকের দোষ। এলসি সংশোধনের বিষয়ে সাজ্জাদ হোসেন বলেন, শিপমেন্ট করার আগে এলসি সংশোধন করা হয়েছে। কারণ আইসিডিতে সময় লাগে। সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও রপ্তানিকারক জড়িত কিনা-এমন প্রশ্নে সাজ্জাদ বলেন, জড়িত থাকতে পারে।

সিগারেট চোরাচালানে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট জড়িত!
অনুসন্ধান বলছে, মৈত্রী অটোমোবাইলস এর পণ্য খালাসের দায়িত্বে ছিলো দক্ষিণ কমলাপুর মতিঝিল এর মিতুল ট্রেড লিমিটেড। মিতুল ট্রেড লিমিটেডের চেয়ারম্যান নোমান সিদ্দিকী। এই সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট বেশিরভাগ সময় আইসিডি কমলাপুর কাস্টম হাউস দিয়ে পণ্য খালাস করে। পানগাঁও কাস্টম হাউস দিয়ে এই সিঅ্যান্ডএফ তেমন কাজ করেন না। সম্প্রতি কমলাপুর কাস্টম দিয়ে ২০-২৪টি কন্টেইনার খালাস করেছে। আর পানগাঁও দিয়ে একটি মাত্র কন্টেইনার পণ্য খালাস করার চেষ্টা করেছে, যাতে পার্টসের মধ্যে বিশেষভাবে লুকায়িত প্রায় ৪ কোটি টাকার সিগারেট চোরাচালানের চেষ্টা করা হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক কাস্টমস কর্মকর্তা বিজনেস বার্তাকে জানিয়েছেন, আইসিডি কাস্টম হাউস দিয়ে এতগুলো কন্টেইনার খালাস করেছে, তাতে কিছু পাওয়া যায়নি। নাকি সেগুলো ভালো করে কায়িক পরীক্ষা করা হয়নি, সে বিষয়ে তাদের সন্দেহ রয়েছে। অথচ পানগাঁও দিয়ে একটি মাত্র কন্টেইনার খালাস করা চেষ্টা হয়েছে, তাতেই চোরাচালান করা হচ্ছে। এই সিঅ্যান্ডএফ এর খালাস করা সব পণ্য যাচাই করা দরকার বলে মনে করেন কর্মকর্তারা। এছাড়া এই সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারক-দুজনই চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন তারা।
মৈত্রী অটোমোবাইলের সেই চালানে কি কি ছিলো
বিল অব এন্ট্রি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২৬ ফেব্রুয়ারি শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকে মৈত্রী অটোমোবাইলস দুবাইয়ের বাব মাসকাট ইউজড কারস অ্যান্ড স্পেয়ার পার্টস ট্রেডিং নামক প্রতিষ্ঠান হতে ব্যবহৃত ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে এলসি খোলে। যার ইনভয়েস মূল্য ৫ লাখ ৩৭ হাজার ৬০ টাকা বা ৪ হাজার ৩৮২ ডলার (প্রতি ডলারের মূল্য ১২২ টাকা ৭৪ পয়সা)। আর অ্যাসেসমেন্ট শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ১২ লাখ ৪৭ হাজার ৬৩২ টাকা। সমুদ্র পথে ১৩ দশমিক ১০ মেট্রিক টন (১০ হাজার ২৩০ কেজি) ওজনের চালানটি সমুদ্র পথে বিএস কার্গো এজেন্সি লিমিটেডের মাধ্যমে পানগাঁও কাস্টম হাউসে পৌঁছায়। ১২ এপ্রিল চালানটি খালাসে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মিতুল ট্রেড লিমিটেডের মাধ্যমে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হয়। তবে গোপন সংবাদ থাকায় ১৩ এপ্রিল চালানটি শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করা হয়। বিল অব এন্ট্রি অনুযায়ী, চালানটিতে জাপানের তৈরি ব্যবহৃত ইঞ্জিন, গিয়ারবক্স, গাড়ির দরজা ও গাড়ির বড়ির পার্টস রয়েছে। ১৩ দশমিক ১০ টন (১৩ হাজার ১০০ কেজি) ওজনের চালানটিতে ১০ দশমিক ২৩ মেট্রিক টন-ই ইঞ্জিন ও গিয়ারবক্স। অর্থাৎ মোট ওজনের প্রায় ৭৮ শতাংশ ইঞ্জিনজাত পণ্য। টয়োটার ইঞ্জিন ও গিয়ারবক্স একটি, মিতসুবিশির ইঞ্জিন ও গিয়ারবক্স তিনটি, হিনোর ইঞ্জিন ও গিয়ারবক্স দুইটি, ব্যবহৃত গাড়ির কেবিন ৪০০টি (চালকের কক্ষ), ব্যবহৃত সামনের ও পেছনের ৯০টি দরজা, ব্যবহৃত ৫০টি বনেট (গাড়ির সামনের ও পেছনের ঢাকনা), ব্যবহৃত ২০টি ড্যাশবোর্ড, ব্যবহৃত ৫০টি স্টিয়ারিং হুইল, ১৬টি ব্যবহৃত গাড়ির আসন, ৪৯৬টি ব্যবহৃত জ্বালানি পাম্প, ৫০টি ব্যবহৃত এয়ার ক্লিনার বক্স ও ৩০টি উইন্ডশিল্ড কাচ (সামনের কাচ)।
চালানটি অ্যাসেসমেন্ট করা কাস্টমস কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যবহৃত মেশিনারিজ, গাড়ির পার্টস থাকায় চালানটি অ্যাসেসমেন্ট করা একটু কষ্টকর ছিলো। এরপরও গোপন সংবাদ থাকায় আমরা বড় বড় কার্টুন কেটে চালানটি অ্যাসেসমেন্ট করা শুরু করি। চালানটিতে প্রায় ১৮০টি গাড়ির দরজা ছিলো। দরজাগুলো অন্য পার্টসের চেয়ে অনেক বেশি আকারে ট্যাপ দিয়ে মোড়ানো ছিলো। এতে আমাদের সন্দেহ হয়। একটি দরজা প্রথমে আমরা ট্যাপ কাটতে থাকি। এতে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের মাথার ঘাম বের হতে থাকে। ট্যাপ কাটার পরপরই দরজার ভাজের মধ্যে কালো কালো প্যাকেট দেখা যায়, বের করার পর নিশ্চিত হই যে সিগারেট। এরপর সব সংস্থার উপস্থিতিতে একে একে সব দরজার ট্যাপ কাটার পর এই বিপুল পরিমাণ সিগারেট বের হয়। আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ ভেবেছিলো, পুরনো মেশিন ও গাড়ির পার্টস দেখে আমরা হয়ত প্যাকেট খুলবো না। পুরনো জিনিসের মধ্যেই চোরাচালান বেশি হয় বলে মনে করেন কর্মকর্তারা।
সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মিতুল ট্রেড আইসিডি ছেড়ে হঠাৎ পানগাঁও এসে ধরা
মিতুল ট্রেড এর আমদানি তথ্য বিশ্লেষ করে দেখা গেছে, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মিতুল ট্রেড লিমিটেড আইসিডি কমলাপুর কাস্টম হাউস দিয়ে নিয়মিত কাজ করেন। বিশেষ করে আমদানিকারক মৈত্রী অটোমোবাইল এর পণ্য খালাস করেন। কিন্তু হঠাৎ করে পানগাঁও কাস্টম হাউসে এসে-ই সিগারেট চোরাচালান করে ধরা খেয়ে গেলেন। চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি ও ২৮ ফেব্রুয়ারি মৈত্রী অটোমোবাইলের পুরাতন পার্টসের দুইটি চালান আমদানি করা হয়। এই দুইটি চালান দিয়ে চলতি বছর পানগাঁও কাস্টম হাউসে প্রবেশ করে মিতুল ট্রেড। আর সুযোগ বুঝে ১২ এপ্রিল পার্টসের মধ্যে চার কোটি টাকার সিগারেট খালাসের চেষ্টা করে। ২০২৫ সালেও এই কাস্টম হাউস দিয়ে তিনটি চালান খালাস করা হয়। তবে এই কাস্টম হাউস দিয়ে সুযোগ বুঝে চালান খালাস করে, যাতে অবৈধ বা ঘোষণার অতিরিক্ত পণ্য থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। আর নিয়মতিভাবে মিতুল ট্রেড আইসিডি কমলাপুর কাস্টম দিয়ে মৈত্রী অটোমোবাইলের পুরাতন পার্টস খালাসের কাজ করে মিতুল ট্রেড। আবার ১২ এপ্রিল মিতুল ট্রেড লিমিটেড মৈত্রী অটোমোবাইলসের চালান পানগাঁও দিয়ে খালাস করে ধরা খেলেন। ঠিক এর আগের মাসে অর্থাৎ ২৪ মার্চ একই আমদানিকারকের একই দেশ ও রপ্তানিকারকের পাঠানো চালান আইসিডি দিয়ে খালাস করেছে। এই চালানেও একই কায়দায় সিগারেটের মতো চোরাচালানের পণ্য আমদানি করা হয়েছে কিনা-তা যাচাই করার অনুরোধ জানিয়েছেন কাস্টমস কর্মকর্তা।
এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে মিতুল ট্রেড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নোমান সিদ্দিকীর ব্যক্তিগত নাম্বারে ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। বক্তব্যের বিষয় লিখে হোয়াটসঅ্যাপে দেওয়া হলেও তিনি জবাব দেননি।
মামলায় চারজনকে আসামি করা হয়েছে, রপ্তানিকারককে আসামি করা হয়নি
পানগাঁও কাস্টম হাউস সূত্রমতে, চট্টগ্রামের আমদানিকারক মৈত্রী অটোমোবাইল দুবাইয়ের বাব মাসকাট ইউজড কারস অ্যান্ড স্পেয়ার পার্টস ট্রেডিং থেকে পুরাতন পার্টস ও গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানি করে। চালানটি খালাসের জন্য মিতুল ট্রেড লিমিটেড ১২ এপ্রিল পানগাঁও কাস্টম হাউসে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করে। তবে ৪০ ফিটের কন্টেইনারে যে ওজনের পণ্য থাকার কথা, তার চেয়ে কম ওজনের পণ্য থাকায় কাস্টমস কর্মকর্তাদের সন্দেহ হয়। পরে চালানটি শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করা হয়। কাস্টমস কর্মকর্তারা পুরাতন পার্টসগুলো খুলতে থাকে। সব পার্টস স্বাভাবিক কার্টুন দিয়ে মোড়ানো। কিন্তু গাড়ির দরজাগুলো বিশেষ কায়দায় কস্টিভ মোড়ানো দেখে কর্মকর্তাদের সন্দেহ হয়। পরে একটি দরজার কস্টিভ খোলার পর দরজার ভেতরে অংশে বিদেশি সিগারেট পাওয়া যায়। একে একে প্রায় ১৮০টি দরজার ভেতরে ৩০৩ এসএস ও ব্ল্যাক ব্র্যান্ডের ৩০ লাখ ৮৪ হাজার ৮০০ শলাকা সিগারেট পাওয়া যায়। যার মূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা। আমদানিকারক এই সিগারেট ঘোষণা দেয়নি। অর্থাৎ চোরাচালানের মাধ্যমে এই সিগারেট খালাস করে নিতে চেয়েছেন। মিথ্যা ঘোষণা ও আইন বর্হিভূতভাবে আমদানি নিয়ন্ত্রিত বিদেশি সিগারেট আমদানি করায় ১৫ এপ্রিল হাউসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা একেএম রশীদুল আলম বাদী হয়ে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় চারজনের বিরুদ্ধে ফৌরদারি মামলা দায়ের করেন। মামলায় আমদানিকারক মৈত্রী অটোমোবাইলসের অংশীদার সাজ্জাদ হোসেন, মোহাম্মদ হানিফ, সিঅ্যান্ডএফ মিতুল ট্রেড লিমিটেডের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নোমান সিদ্দিকীকে আসামি করা হয়। কিন্তু রপ্তানিকারক বাব মাসকাট ইউজড কারস অ্যান্ড স্পেয়ার পার্টস ট্রেডিং এর মালিক মোহাম্মদ মাসুদ এলাহীকে আসামি করা হয়নি। তবে তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারককে পৃথক কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়েছে। জবাব দিয়েছে। কাস্টমস আইন অনুযায়ী, তাদের বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আমদানিকারকের সব কাগজপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে, তাও তদন্ত করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে আমদানিকারক উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন। তবে আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের বিরুদ্ধে তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।
