** এক ইউডি একাধিকবার ব্যবহার করা হয়েছে, এছাড়া ভুয়া ও জাল ইউডিও ব্যবহার করা হয়েছে
** এলিয়েন অ্যাপারেলস লিমিটেডের বন্ড লাইসেন্সে দেওয়া ঠিকানায় প্রতিষ্ঠানের কোন অস্তিত্ব নেই
** ফ্যাশন প্লে বিডি নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে জমি, বিল্ডিং ও মেশিনারিজ বিক্রি করে দিয়েছে
** ৮২ চালানের মধ্যে চলতি বছর জানুয়ারি মাসে ৩৩ চালানে কাপড় আমদানি করে বিক্রি করা হয়েছে
** ফাঁকি দেওয়া শুল্ককর পরিশোধে দাবিনামা এবং লাইসেন্স বাতিল-বিআইএন স্থগিতে নোটিশ জারি করা হয়েছে
মেশিনারিজসহ পুরো গার্মেন্টস বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্ব নেই। অথচ এই প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যবহার করা হচ্ছে ভুয়া ইউডি। এছাড়া একই ইউডি বারবার ব্যবহার করা হচ্ছে। ভুয়া ও একাধিকবার ব্যবহৃত ইউডি দিয়ে আমদানি করা হয়েছে ৮২ কন্টেইনার বন্ড সুবিধার কাপড়। আবার এই কাপড় সরাসরি খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলেও দেদারসে এলসি বিক্রি করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানের মালিক। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। কথায় বলে, চোরের দশদিন আর গেরস্তের একদিন। অবশেষে ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটের অভিযানে সব অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করা অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানটি হলো গাজীপুরের কালিয়াকৈর এলাকার এলিয়েন অ্যাপারেলস লিমিটেড। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স বাতিল ও বিন লক করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এনবিআর সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
সূত্রমতে, গাজীপুরের কালিয়াকৈর কাঠালিয়ার ৫নং ওয়ার্ডে অবস্থিত এলিয়েন অ্যাপারেলস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৮ সালে বন্ড লাইসেন্স পায়। তবে লাইসেন্স পাওয়ার পর থেকে বন্ড সুবিধার কাপড় খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি ঢাকা উত্তর কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট গোপন সূত্রে জানতে পারে যে, প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানায় প্রতিষ্ঠান নেই। একই ইউডি বারবার ব্যবহার করছে প্রতিষ্ঠান। এছাড়া প্রচুর পরিমাণ ভুয়া ইউডি তৈরি করে বন্ড সুবিধায় কাপড় ও এক্সেসরিজ খালাস করা হচ্ছে। এই কাপড় ও এক্সেসরিজ দিয়ে কোন পোশাক তৈরি করে রপ্তানি হচ্ছে না। সব খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। এমন অভিযোগের ভিত্তিতে ২৪ জুন ঢাকা উত্তর কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের একটি প্রিভেন্টিভ দল ঠিকানা অনুযায়ী এলিয়েন অ্যাপারেলস লিমিটেডে অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানে বন্ড কর্মকর্তারা অভিযোগের সত্যতা পায়। পরে ২৮ জুন কমিশনারকে একটি প্রতিবেদন দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযানের সময় এলিয়েন অ্যাপারেলস লিমিটেডের বন্ড লাইসেন্স ও বিআইএন এর দেওয়া ঠিকানায় প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্ব নেই। ওই ঠিকানায় ফ্যাশন প্লে বিডি নামের একটি নন বন্ডেড প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার উৎপাদন এখনো শুরু হয়নি। কর্মকর্তারা ওই প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেন এবং কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। তবে ওখানে এলিয়েন অ্যাপারেলস লিমিটেডের কোন কর্মী, ডকুমেন্ট ও আমদানি করা বন্ড সুবিধার কাপড় ও এক্সেসরিজ খুঁজে পায়নি। ফ্যাশন প্লে বিডির কর্মকর্তা বন্ড কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, এলিয়েন অ্যাপারেলস লিমিটেড ফ্যাশন প্লে বিডির কাছে প্রতিষ্ঠানের জমি, বিল্ডিং, মেশিনারিজ ও যন্ত্রপাতি বিক্রি করে চলে গেছে। তবে কবে, কত টাকায় বিক্রি করা হয়েছে তা ওই কর্মকর্তা জানাতে পারেনি। প্রতিষ্ঠান বিক্রি বা বন্ধ করা হলেও এলিয়েন অ্যাপারেলস কর্তৃপক্ষ বন্ড কমিশনারেটকে লিখিতভাবে কিছু জানায়নি, যা কাস্টমস আইনের লঙ্ঘন।

এলিয়েন অ্যাপারেলস লিমিটেডের আমদানি-রপ্তানির তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫ সালে ৪৯টি ও ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ৩৩টিসহ মোট ৮২টি চালানে বন্ড সুবিধায় ২ কোটি ৩৩ লাখ ৪৪ হাজার ৭৪৩ টাকার ওভেন ফেব্রিক্স, লেইস ফেব্রিক্স আমদানি করেছে। যাতে প্রযোজ্য শুল্ককর ১ কোটি ৮০ লাখ ৫৬ হাজার ১২৬ টাকা। এই কাপড় খালাসে একই ইউডি একাধিকার ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া ভুয়া ইউডিও ব্যবহার করা হয়েছে বলে প্রমাণ পেয়েছেন বন্ড কর্মকর্তারা। শুধু তাই নয়, এই কাপড় দিয়ে প্রতিষ্ঠান কোন পোশাক তৈরি করে রপ্তানি করেছে-এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সূত্রমতে, বন্ডেড প্রতিষ্ঠান হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি বন্ড সুবিধায় মেশিনারিজ আমদানি করেছে। ফলে এই মেশিনারিজ হস্তান্তর বা বিক্রি করতে হলে প্রযোজ্য শুল্ককর পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠান এই মেশিনারিজ বিক্রি করে দিলেও শুল্ককর পরিশোধ করেনি। প্রতিবেদনে মেশিনারিজ বিক্রিতে প্রযোজ্য শুল্ককর আদায়ের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া বন্ড লাইসেন্সে বিদ্যমান ঠিকানায় প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব না থাকা এবং রাজস্ব ঝুঁকি থাকায় প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স ও বিআইএন স্থগিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। আর ইউডি ও দলিলাদি যাচাইয়ে কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ও কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়ায় প্রযোজ্য শুল্ককর পরিশোধে প্রতিষ্ঠানকে দাবিনামা সম্বলিত কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়েছে। সম্প্রতি বন্ড কমিশনারেট থেকে এই নোটিশ জারি করা হয়। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির বন্ড লাইসেন্স বাতিল ও বিআইএন স্থগিত কেন করা হবে না-তার ব্যাখ্যা চেয়ে প্রতিষ্ঠান আরো একটি নোটিশ জারি করা হয়েছে।
এই বিষয়ে ঢাকা উত্তর কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের একজন কর্মকর্তা বিজনেস বার্তাকে বলেন, প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই। অথচ বন্ড সুবিধায় কাপড় আমদানি করা হচ্ছে। কাপড় খালাসে ভুয়া ও জাল ইউডি ব্যবহার করা হচ্ছে। একই ইউডি একাধিকবারও ব্যবহার করা হয়েছে। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করা এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বন্ড কমিশনারেট থেকে সব সময় ব্যবস্থা নেয়া হয়।
অপরদিকে, এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে এলিয়েন অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জসিম উদ্দিন আহমেদকে ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। বক্তব্যের বিষয় হোয়াটসঅ্যাপে লিখে দেওয়া তিনি সিন করেন। তবে কোন জবাব দেননি।
