সরবরাহ স্বাভাবিক, তবুও মসলার বাজারে অস্বস্তি

আমদানি ও সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও বাজারে কয়েকটি মসলার দাম বেড়েছে। বিশেষ করে জিরা, এলাচ ও লবঙ্গের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত এক মাসে জিরার কেজিতে প্রায় ৫০ টাকা, লবঙ্গে ৫০ থেকে ১০০ টাকা এবং এলাচের কেজিতে প্রায় ৩০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। ফলে মসলা কিনতে গিয়ে ক্রেতাদের অতিরিক্ত খরচ করতে হচ্ছে।

খুচরা ব্যবসায়ীদের মতে, কোরবানির ঈদ সামনে আসায় মসলার চাহিদা বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে দামে। অন্যদিকে আমদানিকারকদের দাবি, আমদানি খরচ বাড়লেও বাজারদর এখনো স্বাভাবিক রয়েছে। তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, প্রতি বছর ঈদের আগে মসলার চাহিদা বাড়লেই বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে কৃত্রিম সংকটও সৃষ্টি করা হয়। তাদের মতে, সরকারের কার্যকর নজরদারি থাকলে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব। বাজার নিয়ন্ত্রণে আমদানি থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় তদারকি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা। ব্যবসায়ীরা জানান, কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর মসলার চাহিদা প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়, যা পাইকারি থেকে খুচরা বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি করে। তবে বুধবার রাজধানীর আগারগাঁও, মহাখালী, তেজকুনিপাড়া ও কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দোকানগুলোতে মসলার পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে এবং ক্রেতাদের উপস্থিতিও চোখে পড়েছে।

খুচরা ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা মানভেদে প্রতি কেজি জিরা ৫৫০ থেকে ৬৫০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। মাসখানেক আগে জিরার কেজি ছিল ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। একইভাবে এক মাস আগে এক হাজার ৩০০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হওয়া লবঙ্গের কেজি এখন এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে এলাচের দাম। এক থেকে দেড় মাসের ব্যবধানে কেজিতে অন্তত ৩০০ টাকা বেড়ে এলাচ বিক্রি হচ্ছে চার হাজার ৪০০ থেকে পাঁচ হাজার ৫০০ টাকায়। কেজিতে ৩০ টাকা বেড়ে দারুচিনি বিক্রি হচ্ছে ৪৮০ থেকে ৫৫০ টাকায়। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে পেঁয়াজের কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা দরে। এ ছাড়া প্রতি কেজি গোলমরিচ এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৩৫০ টাকা, তেজপাতা ১৮০ থেকে ২২০, হলুদ ২৫০ থেকে ৪০০, আদা ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা, রসুন ৬০ থেকে ২০০ টাকা, শুকনা মরিচ ৩২০ থেকে ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বলছে, এক বছরের ব্যবধানে দারুচিনির দাম ৫, লবঙ্গের ৩, এলাচের ৫, আদার ১৩, শুকনো মরিচের গড়ে ৩৫ এবং তেজপাতার ২১ শতাংশ দর বেড়েছে। তবে রসুনের ২০ ও জিরার ৫ শতাংশ দর কমেছে। মসলার দাম বাড়লেও বাজারে এসব পণ্যের সরবরাহে কোনো ঘাটতি দেখা যায়নি। আমদানিও হচ্ছে নিয়মিত। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে আমদানি হয়েছে পাঁচ লাখ ৭৪ হাজার টন (১৪ ধরনের মসলা)। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকেই (জানুয়ারি থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত) আমদানি হয়েছে প্রায় দুই লাখ টন।

ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজারে মসলার কোনো সংকট না থাকলেও ঈদকে ঘিরে খুচরা থেকে পাইকারি—সব পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াচ্ছেন। বুধবার রাজধানীর আগারগাঁও কাঁচাবাজারে কেনাকাটা করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মিলন হোসেন বলেন, আগে যে টাকায় এক মাসের মসলা কেনা যেত, এখন সেই টাকায় এক সপ্তাহও চলে না। অন্যদিকে কারওয়ান বাজারের তুহিন জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. রায়হান জানান, কয়েক দিন ধরে মসলার চাহিদা বেড়েছে। অনেকেই বাড়তি পরিমাণে কিনে গ্রামেও পাঠাচ্ছেন, ফলে বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি পাইকারি বাজারেও দাম বাড়ায় খুচরা ব্যবসায়ীদের কিছুটা দাম বাড়াতে হয়েছে।

আমদানিকারকরা জানান, দেশের মসলার বড় অংশই আমদানিনির্ভর। ডলার সংকট, এলসি জটিলতা, অতিরিক্ত শুল্ক ও পরিবহন খরচ বাড়ার কারণে আমদানি খরচ বেড়েছে। জানতে চাইলে বাংলাদেশ পাইকারি মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এনায়েত উল্লাহ বলেন, মসলার বাজার স্থিতিশীল। এ সময় দাম যা থাকার কথা, তার চেয়েও কম আছে। এ ব্যাপারে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, কোরবানির ঈদের আগে মসলার বাজারে কিছুটা চাপ থাকে। এর সুযোগ নেন ব্যবসায়ীরা।