সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং নগদ ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ করতে ১ জুলাই থেকে সব ধরনের সরকারি রাজস্ব ও প্রাপ্তি জমায় ‘এ-চালান’ (স্বয়ংক্রিয় চালান পদ্ধতি) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে সনাতন বা ম্যানুয়াল চালান পদ্ধতি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
অর্থ বিভাগের এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু থেকে কোনো মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বা অধীন দপ্তর এ-চালান ছাড়া অন্য কোনো মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব বা প্রাপ্তি সংগ্রহ ও জমা দিতে পারবে না। বর্তমানে প্রচলিত অন্য কোনো অর্থ সংগ্রহ পদ্ধতি থাকলে তা অবিলম্বে বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিভিন্ন হিসাবে থাকা সরকারি অর্থ ৩০ জুনের মধ্যে ‘ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্টে’ (টিএসএ) স্থানান্তরের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগের মতে, সরকারি অর্থ দ্রুত রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা নিশ্চিত করা, নগদ ব্যবস্থাপনা আরও সাশ্রয়ী করা এবং ভুয়া চালানের ঝুঁকি দূর করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সরকারের এই সিদ্ধান্ত এমন সময়ে কার্যকর হচ্ছে, যখন এ-চালান প্ল্যাটফর্মে ব্যবহার ও লেনদেন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ ব্যবস্থার মাধ্যমে ৪ লাখ ৭ হাজার ২২৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের ২ লাখ ৬৫ হাজার ৭০৮ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ৬ কোটি ৭৫ লাখ চালান প্রক্রিয়াকরণ হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৭১ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। অথচ ২০১৯-২০ অর্থবছরে মাত্র ১৭টি চালান দিয়ে এই ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয়েছিল। গত সাত অর্থবছরে এ প্ল্যাটফর্মে ১৯ কোটি ৩ লাখের বেশি চালান প্রক্রিয়াকরণ হয়েছে এবং জমা হয়েছে ১০ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
অনলাইন লেনদেনেও সাড়া
তথ্য অনুযায়ী, এ-চালান এখন আর শুধু প্রযুক্তিনির্ভর পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং রাজস্ব ব্যবস্থাপনার একটি প্রধান ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অনলাইন চালানের সংখ্যা ৯২ শতাংশ বেড়ে ৫ কোটি ৩৬ লাখে পৌঁছেছে এবং অনলাইনে আদায়ের পরিমাণ ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ২৯৮ কোটি ১২ লাখ টাকায়। একই সময়ে ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) লেনদেনের মাধ্যমে ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৩৯৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা জমা হয়েছে। আগে সরকারি ফি বা রাজস্ব জমা দিতে নির্দিষ্ট ব্যাংক শাখায় গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হতো, ফলে সময় ও শ্রমের অপচয়ের পাশাপাশি কোষাগারে অর্থ জমায় বিলম্ব এবং ভুয়া চালানের ঝুঁকি ছিল। এ-চালান চালুর ফলে এসব সীমাবদ্ধতা অনেকটাই দূর হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের শাখা কাউন্টার, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, ডেবিট-ক্রেডিট কার্ড এবং বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায় ও ট্যাপের মতো মোবাইল আর্থিক সেবার (এমএফএস) মাধ্যমে যেকোনো স্থান থেকে সহজেই সরকারি রাজস্ব ও ফি জমা দেওয়া যাচ্ছে। অর্থ জমা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ডিজিটাল চালান রসিদ তৈরি হয়, যা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারযোগ্য।
অর্থ বিভাগের মতে, এ-চালান পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে সরকারের নগদ অবস্থার তাৎক্ষণিক ও নির্ভুল তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে, ফলে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে অলস পড়ে থাকা অর্থের পরিমাণ কমবে। এ ব্যবস্থায় অর্থ জমা হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক, সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিস ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পরিশোধসংক্রান্ত তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাঠানো ক্রেডিট স্ক্রল সরাসরি আইবাস++ (iBAS++)-এ আপলোড হওয়ায় হিসাব মিলানোর সময় ও ত্রুটি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। পাশাপাশি এ-চালান ড্যাশবোর্ড ও অনলাইন যাচাই ব্যবস্থার মাধ্যমে যেকোনো চালানের সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে, যা রাজস্ব ফাঁকি ও জালিয়াতি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
