আবহাওয়া অধিদপ্তরের পাঁচ রাডারের চারটি অচল

দেশের কোথাও তাপপ্রবাহ, আবার কোথাও ভারী বৃষ্টিপাতের মধ্যে আবহাওয়া পরিস্থিতি অস্থির হয়ে উঠেছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র ইতোমধ্যে কয়েকটি জেলার জন্য সতর্কতা জারি করেছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু এখন সারা দেশে পূর্ণ শক্তিতে সক্রিয়, ফলে বিভিন্ন স্থানে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি, তীব্র বজ্রঝড় ও দমকা হাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মেঘের গতি, বৃষ্টির অবস্থান ও বজ্রঝড়ের গতিপথ সম্পর্কে আগাম নির্ভুল তথ্য জানা অত্যন্ত জরুরি হলেও দেশের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের প্রধান প্রযুক্তি—রাডার নেটওয়ার্ক—প্রায় ভেঙে পড়েছে। অধিদপ্তরের পাঁচটি রাডারের মধ্যে চারটিই বর্তমানে অচল, কেবল ঢাকার একটি রাডার কার্যকর রয়েছে। ফলে উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল ও কক্সবাজার উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যকর পর্যবেক্ষণের বাইরে চলে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়তে থাকা সময়ে এমন দুর্বল রাডার ব্যবস্থা গভীর উদ্বেগের কারণ এবং এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের পাঁচটি রাডার স্থাপন করা হয়েছে ঢাকা, রংপুর, মৌলভীবাজার, কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর খেপুপাড়ায়। এর মধ্যে রংপুরের নতুন রাডারটি ১৭ জুন থেকে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ। কক্সবাজারের রাডার প্রায় তিন বছর ধরে অচল। পটুয়াখালীর খেপুপাড়ার রাডার বন্ধ আট বছর। মৌলভীবাজারের রাডারও কয়েক বছর ধরে অকেজো। আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক রাডারের যন্ত্রাংশ পুরোনো হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব যন্ত্রাংশ আর পাওয়া যায় না। ফলে চাইলেও সেগুলো মেরামত করা সম্ভব না। অনেক ক্ষেত্রে পুরো রাডার ব্যবস্থাই নতুন করে স্থাপন করতে হচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে রংপুরের নতুন আবহাওয়া রাডারটি। প্রায় ১২ বছর অপেক্ষার পর এটি গত বছরের মে মাসে চালু করা হলেও এর আগে ২০১২ সালের পর থেকেই রংপুরের পুরোনো রাডার পুরোপুরি অচল হয়ে ছিল। ১৯৯৯ সালে জাপানের অর্থায়নে উত্তরাঞ্চলে প্রথম ডপলার আবহাওয়া রাডার স্থাপন করা হয়, কিন্তু স্থাপনের কয়েক বছরের মধ্যেই এতে ত্রুটি দেখা দেয়। ২০০৭ সালে বড় ধরনের যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দেয় এবং ২০১২ সালে এটি সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ে। এরপর প্রায় এক যুগ ধরে উত্তরাঞ্চলে কার্যকর কোনো আবহাওয়া রাডার ছিল না। এই সময়ে আকস্মিক বন্যা, শিলাবৃষ্টি, কালবৈশাখী ও অতিবৃষ্টির মতো একাধিক দুর্যোগ ঘটেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, নির্ভুল ও সময়োপযোগী আবহাওয়া তথ্যের অভাবে বারবার কোটি কোটি টাকার ফসলহানি হয়েছে; আগাম সতর্কতা না থাকায় বোরো ধান, ভুট্টা, গম ও বিভিন্ন সবজির চাষে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা।

রংপুরের নতুন আবহাওয়া রাডার স্থাপন প্রকল্পটি বিভিন্ন কারণে দীর্ঘ সময় বিলম্বিত হয়। ২০১৫ সালে জাপানি নাগরিক হোশি কোনিও হত্যাকাণ্ডের পর নিরাপত্তা শঙ্কায় প্রকল্পের কাজ থেমে যায়, পরে করোনা মহামারির প্রভাবেও তা আরও পিছিয়ে পড়ে। অবশেষে জাইকা ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে রাডারটি নির্মাণ করা হয়। জাপানের শিমিজু করপোরেশন নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করে মারুবিনি করপোরেশন। গত বছরের ১১ মে জাপানি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে রাডারটি বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করে। প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার বিস্তৃত এলাকায় নজরদারির সক্ষমতা থাকা এই রাডারের মাধ্যমে ঝড়, বজ্রপাত, বৃষ্টিপাত, শিলাবৃষ্টি, মেঘের গঠন, আর্দ্রতা, জলীয় বাষ্পের গতি, তাপমাত্রা ও বায়ুর গতিবেগসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হতো। এসব তথ্যের ভিত্তিতে লাইভ আবহাওয়া মানচিত্র তৈরি করা হতো এবং বিমান চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাও শনাক্ত করা যেত।

রংপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ প্রকৌশলী মোস্তাফিজার রহমান বলেন, এই রাডারের মাধ্যমে শুধু বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল নয়; ভারতের বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, মেঘালয়, আসাম, মণিপুর, ত্রিপুরা, মিজোরাম, অরুণাচল প্রদেশ, এমনকি নেপাল, ভুটান এবং তিব্বতের আবহাওয়াও পর্যবেক্ষণ করা যেত। আমরা বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। জাপানের একটি দল অকেজো রাডারটি ঠিক করতে বাংলাদেশে এসেছে। কিছু দিনের মধ্যেই তারা রংপুরে আসবে। একইভাবে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মৌলভীবাজারের রাডারটিও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। সিলেট ও সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল প্রতিবছরই আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিতে থাকে। ভারতের মেঘালয় পাহাড়ে ভারী বৃষ্টি হলেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সীমান্তবর্তী নদীগুলোর পানি বেড়ে যায়। এ ছাড়া এই অঞ্চলে বজ্রপাতের ঘটনাও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে বেশি ঘটে। মৌলভীবাজারের রাডারটি সচল থাকলে মেঘের গতিবিধি, বৃষ্টির তীব্রতা এবং বজ্রঝড়ের বিষয়ে দ্রুত তথ্য পাওয়া যেত। তবে কয়েক বছর ধরে এটি অচল থাকায় সিলেট বিভাগের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

কক্সবাজার আবহাওয়া কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, কক্সবাজারের রাডারটি সচল থাকলে সমুদ্র এলাকার আরও নির্ভুল তথ্য পাওয়া সম্ভব হতো। বর্তমানে অন্য রাডার ও আন্তর্জাতিক উৎসের তথ্যের ওপর নির্ভর করেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, জাপানের একটি সংস্থা ইতিমধ্যে রাডারটি পরিদর্শন করেছে এবং প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয়েছে। রাডারটি পুনরায় চালু করতে নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপন প্রয়োজন, এ-সংক্রান্ত নথিপত্র বর্তমানে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। অন্যদিকে পটুয়াখালীর খেপুপাড়া রাডার স্টেশনও দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় রয়েছে। ২০১৮ সালের ২৬ এপ্রিল যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ট্রান্সমিশন ও সার্ভে সিস্টেমের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ নষ্ট হওয়ার পর থেকে এটি আর সচল করা সম্ভব হয়নি। অথচ আগে এই রাডারটি প্রায় ৪০০ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ নির্ধারণ, বৃষ্টির তীব্রতা বিশ্লেষণ এবং উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য জরুরি সতর্কতা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ বলেন, নতুন রাডার নির্মাণের জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হয়ে গেছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ আশরাফ উদ্দিন বলেন, কক্সবাজারসহ সারাদেশে নতুনভাবে তিনটি রাডার সিস্টেম চালু করা হবে, যা ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ পুরোপুরি চালু হবে। জাপান সরকারের অর্থায়নে তৈরি হওয়া রাডার স্টেশনের সরঞ্জামগুলো বর্তমানে বাজারে পাওয়া না যাওয়ায় সংস্কার করা যাচ্ছে না। যে কারণে অবকাঠামো ঠিক রেখে নতুন সিস্টেমে রাডার স্থাপন করতে হচ্ছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এই রাডার সিস্টেমের মেয়াদকাল ৮ থেকে ১০ বছর হবে।