সবার জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিক্রির সুযোগ

জ্বালানিমন্ত্রী

কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানিকে সুবিধা দেওয়ার জন্য নয়, বরং যোগ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিক্রির সুযোগ দিতে সরকার একটি সাধারণ নীতিমালা প্রণয়ন করছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘একটি নির্দিষ্ট কোম্পানিকে সুবিধা দেওয়ার জন্য সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে, এমন ব্যাখ্যা সঠিক নয়। সরকার স্পষ্ট করেছে যে বিষয়টি তা নয়। বরং সবাই যেন ব্যবসা করতে পারে, সেজন্য একটি সাধারণ নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে।’ মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) রাজধানীর ঢাকা ক্লাবে ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ (এফইআরবি) আয়োজিত ‘জ্বালানি খাতের সংকট: সম্ভাবনা ও উত্তরণের উপায়’- শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।

এসময় জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, কিছু পেট্রোলিয়াম পণ্য বেসরকারি খাতে কেনার সুযোগ দেওয়ার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সরকার জ্বালানি তেলের বাজারে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়াতে চায়।তিনি বলেন, ‘প্রস্তাবিত নীতিমালার আওতায় পদ্মা, মেঘনা বা যমুনার পাম্পের পাশাপাশি কোনো বেসরকারি কোম্পানির পাম্প থাকলে ক্রেতা নিজের পছন্দ অনুযায়ী তেল কিনতে পারবেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি ব্যবস্থায় কম দামে তেল পাওয়া গেলে কেউ সেখানে যাবেন। কেউ যদি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বেশি দামে কিনতে চান, সেই সুযোগও থাকতে পারে।’ বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের উদাহরণ হিসেবে মন্ত্রী ভারতের জ্বালানি বাজারের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি উভয় প্রতিষ্ঠানই জ্বালানি তেল বিক্রি করে।

মন্ত্রী বলেন, সরকারের বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পরিকল্পনার পেছনে সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের অভিজ্ঞতাও রয়েছে। ওই সময় দেশে পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছিল। তিনি বলেন, কিছু এলাকায় সরবরাহ সাময়িকভাবে কমে গেলেও ঢাকা পুরোপুরি তেলশূন্য হয়নি। তবে সংকটের আশঙ্কাকে কেন্দ্র করে কোথাও কোথাও কালোবাজারি শুরু হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের কাছে পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়।’ মন্ত্রী বলেন, শেষ পর্যন্ত সরকার জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সক্ষম হয়।

তিনি জানান, এই অভিজ্ঞতার পর তিনি এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ কীভাবে বাড়ানো যায়, তা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি আরও বলেন, গ্যাস, কয়লা ও পেট্রোলিয়ামসহ প্রাথমিক জ্বালানি-সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোতেও বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা যেতে পারে। কারণ, দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা সরকার একা পূরণ করতে পারবে না। মন্ত্রী বলেন, ‘বিশেষ করে জ্বালানি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ অত্যন্ত প্রয়োজন।’

সরকার সরকারি খাতকে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিক্রির সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে।সেমিনারে এক সাংবাদিক জ্বালানি তেলের ব্যবসায় বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিয়ে সরকারের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের বিষয়ে মন্ত্রীর কাছে জানতে চান। এ প্রসঙ্গে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, আপাতদৃষ্টিতে যে অসংগতি দেখা যাচ্ছে, তা একটি ভুল বোঝাবুঝির কারণে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘একটি নির্দিষ্ট কোম্পানিকে সুবিধা দেওয়ার জন্য সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে, এমন ব্যাখ্যা সঠিক নয়। সরকার স্পষ্ট করেছে যে বিষয়টি তা নয়। বরং সবাই যেন ব্যবসা করতে পারে, সেজন্য একটি সাধারণ নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে।’ এ উদ্যোগ নির্দিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার জন্য নেওয়া হয়েছে-সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, এই উদ্যোগ ঘিরে তার বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ নেওয়ার অভিযোগও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখেছেন বলে জানান তিনি। এসব অভিযোগকে ‘অযৌক্তিক’ বলে অভিহিত করেন তিনি।

মন্ত্রী আরও বলেন, দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে কিছু গোষ্ঠী বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করছে। রাজনৈতিক বিরোধিতা বৈধ হলেও রাজনৈতিক স্বার্থে জ্বালানি সংকটকে কাজে লাগানোর চেষ্টা জাতীয় স্বার্থে কোনো কাজে আসবে না। সেমিনারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী আনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, আগামী সাড়ে চার বছরের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছে সরকার। তিনি বলেন, মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের সরকারি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অমিত বলেন, লক্ষ্যমাত্রার নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ ভূমিভিত্তিক ও ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে আসতে পারে।

এর আগে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কয়েকটি প্রকল্প আটকে যাওয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের বাধা দূর করতেও সরকার কাজ করছে। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনগুলো ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য ভবন নির্ধারণ করে দেবে। বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা এসব প্রকল্পে অর্থায়ন করতে পারবেন এবং নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে তাদের বিনিয়োগের অর্থ তুলে নিতে পারবেন। মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে খুবই কঠোর অবস্থানে আছি।’ তিনি আরও বলেন, ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে সহায়তা করতে প্রয়োজন হলে সরকার হোল্ডিং ট্যাক্স-সংক্রান্ত প্রণোদনার কথাও বিবেচনা করতে পারে।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অমিত বলেন, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট। তবে জ্বালানির সংকটের কারণে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে চাহিদার তুলনায় প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়েও এই ঘাটতি পূরণ হচ্ছে না। অমিত আরও বলেন, দেশে গ্যাসের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বছরে প্রায় ১৫০ এমএমসিএফডি করে কমছে। তিনি বলেন, ‘আপনার কাছে টাকা থাকলেও রাতারাতি এলএনজি আমদানি বাড়াতে পারবেন না, কারণ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই।’ বর্তমানে বাংলাদেশ দুটি ভাসমান স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ)-এর ওপর নির্ভরশীল।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, নতুন একটি এফএসআরইউ স্থাপনে সাধারণত ৩০ থেকে ৩৬ মাস সময় লাগে। তবে সরকার দুই বছরের কম সময়ে নতুন একটি এফএসআরইউ চালু করার লক্ষ্য নিয়েছে। একই সঙ্গে তৃতীয় ও চতুর্থ এফএসআরইউ স্থাপনের বিষয়টিও বিবেচনা করছে বলে জানান তিনি। মাতারবাড়ীতে একটি ভূমিভিত্তিক বা ল্যান্ড-বেইজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে সরকার এগোচ্ছে। অমিত এটিকে এলএনজি আমদানি সক্ষমতা বাড়ানোর ‘চূড়ান্ত সমাধান’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, লেনদেনবিষয়ক পরামর্শক নিয়োগের জন্য দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। প্রস্তাবিত টার্মিনালের জন্য জমিও চিহ্নিত করা হয়েছে।

চলমান সমুদ্রভিত্তিক তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান-সংক্রান্ত দরপত্র প্রক্রিয়া সফল হবে বলেও সরকার আশাবাদী। পাশাপাশি স্থলভিত্তিক দরপত্র প্রক্রিয়ার প্রস্তুতিও চলছে বলে জানান অমিত। তিনি আরও বলেন, সরঞ্জাম ও জনবল—দুই ক্ষেত্রেই উন্নতি করে বাপেক্সকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। বিশেষায়িত দক্ষতা উন্নয়নে বাপেক্সের কর্মকর্তাদের ছয় মাস থেকে দুই বছর মেয়াদি সার্টিফিকেট কোর্সে বিদেশে পাঠানো হবে। এলপিজির দাম স্থিতিশীল রাখতে সরকার এ বাজারে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে চায় বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দিলেও ভোক্তারা সব সময় নির্ধারিত দামে পণ্যটি পান না।

অমিত বলেন, বাজারে অনেক অপারেটর থাকলেও বর্তমানে মাত্র পাঁচ বা ছয়টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এলপিজি আমদানি করছে। সরকার এলপিজি আমদানি করে বেসরকারি খাতের বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে তা বিতরণের পরিকল্পনা করছে। এর মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল করায় সহায়তা হবে। মহেশখালীতে ক্ষতিগ্রস্ত এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত এফএসআরইউটি সরকারের জন্য এখনও বড় চ্যালেঞ্জ বলে জানান আমিত। তিনি বলেন, দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় এফএসআরইউটির আংশিক কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হয়েছে। বর্তমানে একটি বয়লার চালু রয়েছে, তবে অন্যটি এখনও বন্ধ। দ্বিতীয় বয়লারটি মেরামত করে চালু করতে হলে প্রথম বয়লারটিও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে। তাই ভোক্তাদের ওপর প্রভাব সবচেয়ে কম হবে—এমন একটি সময় নির্ধারণের চেষ্টা করছে সরকার। অমিত বলেন, ‘কমপক্ষে ৭২ ঘণ্টার জন্য কখন এমন সময় বেছে নেওয়া যায়, যখন মানুষের দুর্ভোগ কম হবে, তা নিয়ে আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনা করছি।’ এফএসআরইউটিকে পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতেও সরকার কাজ করছে বলে জানান তিনি।