৭৩ টন ডুপ্লেক্স বোর্ড বিক্রির সময় আটক

খুলনার এসআর ফ্লেক্সোপ্যাক লিমিটেড

বন্ড সুবিধার ডুপেক্স বোর্ড। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাস হয়েছে। ১০টি ট্রাকে করে যাওয়ার কথা খুলনায় প্রতিষ্ঠানের বন্ডেড ওয়্যারহাউজে। কিন্তু চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে ট্রাকের গতিপথ বদলে গেলো। ট্রাকগুলো খুলনা যাওয়ার পরিবর্তে যাচ্ছে পুরান ঢাকার নয়াবাজার। উদ্দেশ্য খোলাবাজারে বিক্রি। কিন্তু গোপন সংবাদ থাকায় ৭৩ মেট্রিক টন বন্ড সুবিধার ডুপেক্স বোর্ড বোঝাই নয়টিসহ মোট ১০টি ট্রাক আটক করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) দিবাগত রাতে শুল্ককর ফাঁকি দেওয়া এই বিপুল পরিমাণ ডুপেক্স বোর্ড আটক করা হয়। শনিবার (২৯ আগস্ট) আগারগাঁও এনবিআরে এক সংবাদ সম্মেলনে কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এই তথ্য জানান। আটক করা এই ডুপেক্স বোর্ড বন্ড সুবিধায় আমদানি করেছে খুলনার বন্ডেড প্রতিষ্ঠান এসআর ফ্লেক্সোপ্যাক লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, পণ্যগুলো স্থানীয় আড়তে খালাস ও বিক্রির প্রস্তুতি চলছিল। পরে র্যাবের সহায়তায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানকালে নয়াবাজারমুখী ১০টি ট্রাকের বহর কাস্টমস গোয়েন্দার উপস্থিতি টের পায়। এ সময় বহরের একটি ট্রাক দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে পালিয়ে যায়। অন্যদিকে, নয়াবাজারে আগে থেকেই অবস্থানরত এবং পণ্য বিক্রির প্রস্তুতিতে থাকা আরও একটি ট্রাক শনাক্ত ও আটক করা হয়। ফলে অভিযানস্থলে মোট ১০টি পণ্যবোঝাই ট্রাক কাস্টমস গোয়েন্দার নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সম্ভব হয়। পালিয়ে যাওয়া ট্রাকটি শনাক্ত ও আটকের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

প্রাপ্ত আমদানি ও পরিবহন নথি অনুযায়ী, ভারতের শীর্ষস্থানীয় একটি প্রিমিয়াম কোটেড ডুপ্লেক্স বোর্ড রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মেহালি পেপার্স প্রাইভেট লিমিটেড থেকে খুলনার তেলিগাতি আড়ংঘাটা এলাকার প্রতিষ্ঠান এসআরআই ফ্লেক্সোপ্যাক লিমিটেড আমদানি করেছে। এম এ আজাদ অ্যান্ড কোং লিমিটেড নামক সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস থেকে বন্ড সুবিধায় পণ্যটি খালাস করেছে। ডেলটা ট্রান্সপোর্ট সার্ভিস নামক পরিবহনের ট্রাকে এসব ডুপেক্স বোর্ড বোঝাই করা হয়। গাড়িগুলো কাঁচপুর, সাইনবোর্ড, পোস্তগোলা মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে পদ্মাসেতু হয়ে প্রতিষ্ঠানের ওয়্যারহাউজে যাওয়ার কথা। কিন্তু ঢাকার কাছে এসে রুট পরিবর্তন হয়ে যায়। পোস্তগোলা থেকে মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগপথ ঢাকার মূল শহর এড়িয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দিকে চলে গেছে। অন্যদিকে, পুরান ঢাকার নয়াবাজার, রায়সাহেব বাজার ও তাঁতীবাজার খুলনাগামী স্বাভাবিক পরিবহনপথের বাইরে এবং বিপরীত দিকে অবস্থিত ঘনবসতিপূর্ণ পাইকারি বাণিজ্যিক এলাকা। ফলে খুলনাগামী বন্ডেড পণ্যবোঝাই ট্রাকগুলোর নির্ধারিত বাইপাস রুট ছেড়ে নয়াবাজার এলাকায় প্রবেশের ফলে গোপন সংবাদের প্রাথমিক সত্যতা প্রমাণিত হয়। যে আড়তে বন্ডেড কাগজসমূহ বিক্রির অপচেষ্টা চলছিল তার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তের স্বার্থে উক্ত প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির নাম এখন প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না।
Duplex Board
কর্মকর্তারা বলেন, বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা কাঁচামাল সংশ্লিষ্ট বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত কারখানা বা গুদামে নিয়ে উৎপাদন কাজে ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের পণ্য— অন্য কোনো গুদাম বা আড়তে স্থানান্তর; খোলাবাজারে খালাস; বিক্রি বা হস্তান্তর; অথবা অনুমোদিত উৎপাদন কার্যক্রমের বাইরে ব্যবহার করা হলে তা বন্ড সুবিধার শর্ত লঙ্ঘন এবং সম্ভাব্য শুল্ক-কর ফাঁকির ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর দায় চূড়ান্ত তদন্ত, নথি যাচাই এবং বক্তব্য গ্রহণের পর নির্ধারিত হবে। আটক প্রতিটি ট্রাকের নিবন্ধন ও মালিকানার তথ্য; ট্রাকপ্রতি পণ্যের পরিমাণ ও প্যাকেজ সংখ্যা; কনটেইনার ও পরিবহন সিলের অখণ্ডতা; বিল অব এন্ট্রি, ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট ও পরিবহন চালান; বন্ড লাইসেন্স ও সংশ্লিষ্ট ইউটিলাইজেশন পারমিশন; চট্টগ্রাম থেকে ছাড়ার সময় এবং ঢাকায় পৌঁছানোর সময়; নয়াবাজারের কোন আড়ত বা ব্যবসায়ীর কাছে পণ্যগুলো সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল; আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, পরিবহনকারী ও সম্ভাব্য ক্রেতাদের ভূমিকা; পালিয়ে যাওয়া ট্রাকটির অবস্থান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয়; এর আগে একই পদ্ধতিতে বন্ডেড পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়েছে কি না; সরকারি রাজস্ব ঝুঁকি ও সম্ভাব্য শুল্ক-কর ফাঁকির পরিমাণ-তা যাচাই করা হচ্ছে।

আটক পণ্য ও ট্রাকগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত, পরিমাণ নিরূপণ এবং সংশ্লিষ্ট নথি যাচাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে। তদন্তে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার, গন্তব্য পরিবর্তন, অবৈধভাবে পণ্য খালাস অথবা খোলাবাজারে বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রচলিত কাস্টমস ও বন্ডসংক্রান্ত আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া ট্রাকটি শনাক্ত, পণ্যের সম্ভাব্য ক্রেতা বা আড়তদারদের চিহ্নিত এবং এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত পুরো চক্র উদ্ঘাটনে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।