শীর্ষ অপারেটর থেকে পতনে সাইফ পাওয়ারটেক!

চট্টগ্রাম বন্দরের শীর্ষ টার্মিনাল অপারেটর ছিল সাইফ পাওয়ারটেক। প্রতিষ্ঠানটি একবছর আগে চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক টার্মিনাল নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনা থেকে বাদ পড়েছিল। এ এনসিটি পরিচালনায় নতুন বিদেশি অপারেটর নিয়োগ দিয়েছে সরকার। আর গতকাল (২ নভেম্বর) সাইফ পাওয়ারটেকের শেষ হয়েছে চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনালের (সিসিটি) পরিচালনার কাজ। এ টার্মিনালটিও বিদেশি টার্মিনাল অপারেটর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় থাকা আপাতত বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করবে। ফলে বন্দরের টার্মিনাল সাইফ পাওয়ারটেকের বিদায়।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) সূত্রে জানা যায়, ঠিক আজ থেকে ৩০ বছর আগে চট্টগ্রাম বন্দরে (২০০৬ সালে) গ্যান্ট্রি ক্রেন পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে সাইফ পাওয়ারটেকের কাজের হাতেখড়ি হয়। তারপর প্রতিষ্ঠানটি বিগত ১৯ বছরে সমঝোতা, বিনা দরপত্রে, দরপত্র ও সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে প্রতিবারই নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) চারটি জেটি এবং চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনালের (সিসিটি) দুটি জেটির কাজ পেয়েছিল। এ দুই টার্মিনালে ৬৫ শতাংশ কনটেইনার ওঠানো-নামানো হয়ে থাকে। অর্থাৎ সাইফ পাওয়ার টেকের হাতে ছিল সবচেয়ে বড় ও সরঞ্জামসমৃদ্ধ টার্মিনাল নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) চারটি জেটি এবং চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনালের (সিসিটি) দুটি জেটির নিয়ন্ত্রণ। এরমধ্যে গত বছরের জুলাইয়ে সাইফ পাওয়ারটেক বাদ পড়ে এনসিটি পরিচালনায়। সেইটি বর্তমানে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম ড্রাইডক লিমিটেডের (সিডিডিএল) ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে। যা আগামী বছর দুুবাইয়ের প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়াল্ড পরিচালনায় দায়িত্ব পেয়েছে। এছাড়া গতকাল (২ নভেম্বর) শেষ হয়েছে আরেকটি টার্মিনাল চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনালের (সিসিটি) পরিচালনার কাজ। এ টার্মিনালটিতেও বিদেশি টার্মিনাল অপারেটর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় থাকা আপাতত বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করবে। তবে সাইফ পাওয়ারটেকের আরও ১৫ দিন পরিাচলনায় আছে।

বন্দর ব্যবহারকারীরা বলেন, আওয়ামী লীগ আমলেই গত ১৭ বছর সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আর প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমিন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, তৎকালীন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি নূর-ই-আলম চৌধুরী (লিটন চৌধুরী নামে পরিচিত) ও স্থানীয় সাবেক সংসদ সদস্য এম এ লতিফের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তাদের সহযোগিতায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে সাইফ পাওয়ারটেক। যদিও ২০০৭ ও ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচাালনার জন্য দরপত্রের কাজ গুছিয়ে এনেছিল। তবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি নূর-ই-আলম চৌধুরী ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের হস্তক্ষেপে দরপত্র প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়। টার্মিনালটি চালু করতে লেগে যায় আরও ছয় বছর। ২০১৫ সালে টার্মিনালটির চার জেটিকে দুই প্যাকেজে ভাগ করে দরপত্র আহ্বান করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। দরপত্রের শর্ত এমনভাবে দেওয়া হয়েছিল, যাতে সাইফ পাওয়ারটেক ছাড়া আর কেউ যোগ্য নির্বাচিত না হয়। এ কাজে তৎকালিন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, সংসদীয় কমিটি ও বন্দর কর্মকর্তারা কীভাবে সাইফ পাওয়ারটেককে বন্দরের কাজ পেতে সহযোগিতা করতেন, তার বড় উদাহরণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা সংক্রান্ত দরপত্র। আর নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় আর কখনো দরপত্র ডাকা হয়নি। বরং সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে ছয় মাস মেয়াদে সাইফ পাওয়ারটেককে কাজ দেওয়া হয়। সর্বশেষ গত বছরের জুলাই পর্যন্ত সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ দেওয়া হয়েছিল। একইভাবে গত ১৭ বছরে সমঝোতা, দরপত্র ও সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে প্রতিবারই চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনালের কাজ পেয়েছে সাইফ পাওয়ারটেক। সর্বশেষ ২০১৯ সালে ছয় বছরের জন্য প্রায় ৩০৪ কোটি টাকায় টার্মিনালটি পরিচালনার কাজ পায় তারা। এই চুক্তির মেয়াদ গতকাল শেষ হয়।

বেশ কয়েক বার্থ ও টার্মিনাল অপারেটররা বলেন, কনটেইনার ওঠানো-নামানোর ব্যবসায় বিনিয়োগ কম লাগে। নিশ্চিত মুনাফা বেশি। তাই আওয়ামী লীগ সরকার ঘনিষ্ঠরা বেশি টাকায় কাজ নিয়েছেন। কখনো এসব প্রতিষ্ঠান ‘নামমাত্র’ ডাকা দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদারি কাজ পেয়েছে। এতে বন্দর প্রকৃত রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আবার কখনো সরাসরি দরপত্র পদ্ধতিতে এই সাত প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিযোগিতাবিহীন এসব কোম্পানি সহজে বন্দরের কাজ পেয়ে যায়। এতে বন্দরে কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় ব্যয় বেশি হয়েছে। বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামের ওপর সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আদায় করেছেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অন্য কাউকে সেখানে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এসব দরপত্র ছিল লোক দেখানো। সে কারণেই একই প্রতিষ্ঠান বারবার কাজ পেত। দরপত্রের শর্ত ওই সব প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার জন্যই তৈরি করা হতো। ফলে এখন নতুন কওে কোনো প্রতিষ্ঠান কাজ পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। ঘুরে ফিরে তাদের আসার সুযোগ রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, বিগত সরকারের আমলে যে সুবিধাভোগী শ্রেণি তৈরি হয়েছে, বর্তমানে সময়ে আগের মতো ব্যবসা দখল করতে না পারে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর স্বচ্ছতা আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বন্দরকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হলে হাজার কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এতে কারো যেন একক আধিপত্য সৃষ্টি না হয়। দুইটি টার্মিনাল পরিচালনা থেকে বাদ পড়া ও নতুন কোনো ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বিষয়ে জানতে সাইফ পাওয়ারটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমিনের সাথে যোগাযোগ বার যোগাযোগ করা হলে তিনি সংযোগটি রিসিভি করেননি। ফলে উনার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আলাপকালে বলেন, আগে আমরা এনসিটি পরিচালনা থেকে বাদ পড়ছি। আর আমাদের সিসিটিতে টার্মিনাল পরিচালনার মেয়াদ পর্যন্ত সিটিসিটিতে আমরা কাজ করব। আর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বন্দর কর্তৃপক্ষ কি সিদ্ধান্ত নেয় তার অপেক্ষায় আছি।

অপরদিকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব রেফায়েত হামিম বলেন, সাইফ পাওয়ারটেকের সাথে গতকাল সিসিটি পরিচালনার চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। তবে তাদের সঙ্গে আরও তিন সপ্তাহ চুক্তির সময় বাড়ানো হচ্ছে। এরমধ্যে সিসিটি পরিচালনার একটা সিদ্ধান্ত আসবে, তখন বিষয়টি পরিস্কার হবে। তাই সিসিটি পরিচালনা বিষয়ে আপাতত তেমন কিছু বলা যাচ্ছে না।

নাম প্রকাশে অনাগ্রহী নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি টার্মিনালের মধ্যে একটি বিদেশি অপারেটর দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বড় ও সরঞ্জামসমৃদ্ধ টার্মিনাল নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) ডিপি ওয়ার্ল্ডকে পরিচালনার কাজ পেয়েছে। যদিও এখন ড্রাইডকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি সিসিটিও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে। যার মেয়াদ চলতি নভেম্বর মাসে শেষ হবে। এরপর তাদের সাথে চুক্তি নবায়ন হওয়ার সম্ভাবনা কম। এরমধ্যে পিপিপি মডেলে নতুন করে বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এটিও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে জিটুজি ভিত্তিতে টার্মিনালটি পরিচালনার ভার দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। যা শেষ পর্যায়ে আছে। সরকার বিদেশি অপরেটর নিয়োগে আগ্রহী। এর বেশি কিছু আপতত বলা যাচ্ছে না।

উল্লেখ, পুঁজিবাজারের ২০১৪ সালে তালিকাভুক্ত হয় সেবা খাতের প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে বিনিয়োগাকারীদের জন্য এক শতাংশ লভ্যাংশ অর্থাৎ দশ পয়সা লভ্যাংশ ঘোষণা দেয়। এ লভ্যাংশ গত দুই বছরের বিনিয়োগাকারীদের পরিশোধ করতে পারেনি। যদিও কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ৩৭৯ কোটি টাকা। এরমধ্যে উদ্যোক্তা পরিচালকদের ৪০ দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ১৮ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগাকারীদের হাতে ৪১ দশমিক ৮১ শতাংশ শেয়ার মালিকানা রয়েছে। গতকাল সমাপনি শেয়ার দর ছিল ছয় টাকা ৫০ পয়সা।

** ৩,০৬৩ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ সাইফ পাওয়ারটেকের
** সাইফ পাওয়ারটেক: বিপাকে ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীরা
**এনসিটি ছাড়ছে সাইফ পাওয়ারটেক
**সাইফ পাওয়ারটেকের সম্পত্তি নিলামে
**রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বন্দরে গাড়ি চালায় সাইফ পাওয়ারটেক
**বন্দরে সাইফ পাওয়ারটেকের সব ‘অনিয়ম-ই-নিয়ম’
**বন্দরের ‘ক্ষমতাধর’ সাইফ পাওয়ারটেক
**সাইফ পাওয়ারটেকের অভিযোগ তদন্ত করবে দুদক
**জাল কাগজ তৈরিতে সাইফ পাওয়ারের কর্মচারী
**সাইফ পাওয়ারকে বিদায়ে লাগলো ১৭ বছর
**ম্যানেজ করেই বন্দরে কাজ পান ‘সাইফ পাওয়ার’