প্রতি বছর দেশে গড়ে ২০ লাখ মানুষ কর্মক্ষম হয়ে উঠলেও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে মাত্র ১০ থেকে ১২ লাখের জন্য। ফলে শিক্ষিত তরুণ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪০ শতাংশই বেকার থেকে যাচ্ছে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীকে কর্মক্ষম হিসেবে ধরা হয়; এর নিচে ১৪ বছর এবং ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে থাকা ব্যক্তিরা কর্মক্ষমতাহীন হিসেবে বিবেচিত। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপি) অনুযায়ী, কোনো দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা যদি কর্মক্ষমতাহীনদের তুলনায় বেশি হয় এবং তারা অর্থনীতিতে কার্যকর অবদান রাখে, তবে সেটিকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যাতাত্ত্বিক মুনাফা বলা হয়। এই বিবেচনায় বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধাপ্রাপ্ত দেশ হলেও, এর সম্ভাবনাকে কতটা কাজে লাগানো যাচ্ছে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
দেশে প্রায় ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে সাড়ে ৪ কোটি তরুণ কর্মক্ষম হলেও শিক্ষিত তরুণদের প্রায় ৪০ শতাংশই বেকার। পড়াশোনা শেষ করেও চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছে অনেকেই। এক তরুণের মতে, বর্তমান চাকরির বাজারে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে; অনেকেই শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে পড়াশোনা শেষ করলেও বাস্তব দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। রাজধানীর এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী জানান, যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডার মতো দেশে এআই প্রযুক্তি আগে আসলেও সেখানে কর্মসংস্থান সংকট তেমন দেখা যায় না। তার মতে, দেশের মানুষকে দক্ষ করে তুলতে পারলে এই পরিস্থিতি বড় সুযোগে পরিণত হতে পারে।
চাকরিদাতারা বলছেন, শিক্ষিত জনগোষ্ঠী বাড়লেও দক্ষ জনবল বাড়ছে না। উচ্চ শিক্ষা ও চাকরির বাজারে চাহিদার মিল নেই। বিডি জবসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম মাসরুর বলেন, শিক্ষিত, যারা মূলত অফিস জব করতে চায়, তারা আসলে ফ্যাক্টরি লেবেলে কাজ করতে চায় না। বা এ ধরনের কাজে অনীহা আছে। সেই সংখ্যাটা হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। এইজন্যই দেখা যাচ্ছে যে, অনেক কোম্পানি তাদের প্রতিষ্ঠান চালানোর জন্য লোক পাচ্ছে না।
দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর উচ্চ হার থাকার এই সুযোগ ২০৪০ সাল পর্যন্ত বজায় থাকবে। তবে এখনই তরুণদের দক্ষ করে তোলা না গেলে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. আমিনুল হকের মতে, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অর্জনের জন্য কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সুশাসন এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি। এই চারটি উপাদান একসঙ্গে কার্যকর হলে তবেই এর সুফল পাওয়া সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকারের সুপরিকল্পিত পদক্ষেপের পাশাপাশি তরুণদেরও সচেতন ও দক্ষ হয়ে ওঠা প্রয়োজন।
