প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি এটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা, আমদানি ব্যয় মেটানো, গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাহিদা বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ কারণে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বৈধপথে প্রবাসী আয় পাঠাতে আড়াই শতাংশ নগদ প্রণোদনার জন্য ৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও আগামী বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৭ হাজার কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হুন্ডিনির্ভর অবৈধ লেনদেন কমিয়ে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে আরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ করা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় দেড় কোটির কাছাকাছি বাংলাদেশি প্রবাসী রয়েছেন, যাদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কাতার, কুয়েত, মালয়েশিয়া, ইতালি ও ওমান থেকে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে। চলতি বছর শেষে রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রায় ৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে বর্তমানে এ প্রবাহ ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। তবে এ খাতের সামনে হুন্ডি ব্যবহারের প্রবণতা, ব্যাংকিং জটিলতা, উচ্চ ট্রান্সফার খরচ, বিদেশে কর্মীদের অধিকার সুরক্ষার দুর্বলতা এবং দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতিসহ বেশ কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনার কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত প্রবাসীরা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈধপথে রেমিট্যান্স বাড়াতে হলে শুধু প্রণোদনা নয়, আর্থিক খাতে সুশাসন ও আস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশে কর্মীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা গেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়বে। রেমিট্যান্স শুধু বৈদেশিক মুদ্রা জোগান দেয় না, এটি দেশের অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় ও বিনিয়োগও বাড়ায়। গ্রামের অসংখ্য পরিবার প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল বলে এই অর্থ সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখে। এ প্রসঙ্গে সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, ‘রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে রেমিট্যান্সের অবদান অনেক। সরকার যে নগদ প্রণোদনার বরাদ্দ বাড়াচ্ছে, সেটি ইতিবাচক। তবে শুধু প্রণোদনা দিলেই হবে না, ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানো সহজ ও দ্রুত করতে হবে। তিনি বলেন, হুন্ডি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে। এজন্য বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা, ব্যাংকিং খাতে আস্থা এবং প্রবাসীদের জন্য কম খরচে রেমিট্যান্স পাঠানোর সুযোগ বাড়াতে হবে।’
জানা যায়, আসন্ন বাজেটে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে জেলা পর্যায়ে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সম্প্রসারণ, বিদেশগামী কর্মীদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ সুবিধা, ডিজিটাল রেমিট্যান্স প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণ, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে দ্রুত অর্থ প্রেরণ, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠালে বিশেষ সঞ্চয়পত্র বা বিনিয়োগ সুবিধা এবং শ্রমবাজার বহুমুখীকরণের মাধ্যমে নতুন দেশে জনশক্তি রপ্তানির উদ্যোগ। পাশাপাশি বিভিন্ন ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে দক্ষ শ্রমিক গড়ে তুলে বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অদক্ষ শ্রমিকদের তুলনায় দক্ষ শ্রমিকরা কয়েকগুণ বেশি মজুরি পান, তবে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো ভারত ও নেপালের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। তাই বিদেশগামী কর্মীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে নতুন করে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার শ্রমবাজারে প্রবেশের চেষ্টা চলছে, বিশেষ করে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, রোমানিয়া, পোল্যান্ড ও গ্রিসে দক্ষ কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ বাড়ানো হচ্ছে। এজন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বাজেটে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘বাজেটে শুধু প্রণোদনা বাড়ালেই হবে না, দক্ষ কর্মী তৈরিতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশের বড় অংশের শ্রমিক নিম্ন দক্ষ। ফলে তারা কম মজুরির কাজ পান। দক্ষতা বাড়ানো গেলে একই সংখ্যক কর্মী থেকেও বেশি রেমিট্যান্স আসবে। বিশ্ববাজারে এখন স্বাস্থ্যসেবা, আইটি, নির্মাণ, মেশিন অপারেশন ও কারিগরি খাতে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। বাজেটে তাই টেকনিক্যাল প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক মানের স্কিল ডেভেলপমেন্টে বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি।’ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী এপ্রিলে ২৯ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩০০ কোটি ২০ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। আবার কুরবানির ঈদ সামনে রেখে প্রবাসী আয়ে সুবাতাস বইছে। মে মাসের ২৩ দিনে রেমিট্যান্স এসেছে ২৯৮ কোটি মার্কিন ডলার। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত সবমিলিয়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩ হাজার ২৩১ কোটি মার্কিন ডলার।
