রাশিয়া থেকে সরাসরি সার কিনছে বিসিআইসি

বেসরকারিভাবে দরপত্রের মাধ্যমে চার লাখ টন সার আমদানির জন্য তিনটি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হলেও মাত্র সোয়া লাখ টন সরবরাহের সাড়া পাওয়া গেছে। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি এখন সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি বা ডিরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথডে (ডিপিএম) ইউরিয়া আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। এরই মধ্যে রাশিয়া থেকে এক লাখ টন সার আমদানির জন্য সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কমিটিতে একটি প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছে।

সাধারণত সরকারি কোনো সংস্থা কোনো পণ্য ক্রয় বা আমদানি করতে চাইলে দরপত্র আহ্বানের বিধান অনুসরণ করতে হয়। তবে বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় আইন ২০০৬-এর ৬৮(১) ধারায় জরুরি জাতীয় প্রয়োজন বা দুর্যোগকালীন পরিস্থিতিতে বিশেষ পদ্ধতিতে ক্রয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে। এই ধারায় বলা হয়েছে, সরকার যদি কোনো জরুরি জাতীয় প্রয়োজন বা বিপর্যয়কর পরিস্থিতি মোকাবিলায় জনস্বার্থে প্রয়োজন মনে করে, তাহলে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি বা আইনসম্মত অন্য কোনো পদ্ধতিতে সরকারি ক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।

বিসিআইসি সূত্রে জানা গেছে, সরকারি ক্রয় আইন ২০০৬-এর ৬৮(১) ধারার আওতায় রাশিয়া থেকে এক লাখ টন ইউরিয়া আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং এ বিষয়ে ঈদের আগেই মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। রাশিয়ার একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সার দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ও তাদের স্থানীয় এজেন্টের মাধ্যমে সরবরাহ করা হবে, আর পুরো প্রক্রিয়াটি রাশিয়া দূতাবাসের মাধ্যমে অগ্রসর হচ্ছে। ডিপিএম পদ্ধতিতে আমদানি করা হলেও এটি জিটুজি চুক্তির মতো ফর্মুলা প্রাইসিংয়ে সম্পন্ন হবে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে বিসিআইসির পরিচালক (বাণিজ্যিক, উৎপাদন ও গবেষণা) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, রাশিয়া থেকে এক লাখ টন ইউরিয়া আমদানির প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে, যেখানে প্রতিষ্ঠানটি তিন লাখ টন পর্যন্ত সরবরাহে আগ্রহী; প্রাথমিকভাবে এক লাখ টন আনার পরিকল্পনা রয়েছে এবং দ্রুতই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জানা গেছে, বিসিআইসি জিটুজি চুক্তিতে ইউরিয়া আমদানি করে থাকে। তবে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের জেরে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ইউরিয়া আমদানি করতে না পেরে বেসরকারিভাবে বিকল্প উৎস থেকেও সংগ্রহের চেষ্টা করেছিল রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি। তারই অংশ হিসেবে চার লাখ টন ইউরিয়া সার আমদানির জন্য দুই দফা তিনটি (একটি পুনঃবিজ্ঞপ্তি) দরপত্র আহ্বান করেছিল। তবে সেখানে মাত্র ১ লাখ ২৫ হাজার টন সরবরাহের বিষয়ে আশ্বাস মিলেছে। এখন চতুর্থবারের মতো দরপত্র আহ্বানের পথে হাঁটছে বিসিআইসি। সংস্থাটির একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে তারা জানিয়েছেন।

বিসিআইসি সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে প্রথম দফায় দুই লাখ টন ইউরিয়া আমদানির জন্য আহ্বান করা হলেও কোনো প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নেয়নি। পরবর্তীতে দ্বিতীয় দফায় আবারও দুই লাখ টন আমদানির দরপত্র আহ্বান করা হলে মাত্র ৫০ হাজার টন সরবরাহের জন্য দুটি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখায়। এরপর প্রথম দরপত্রের বিপরীতে পুনঃদরপত্র বিজ্ঞপ্তি দিলে আরও ৭৫ হাজার টন সরবরাহের আশ্বাস পাওয়া যায়। ফলে চার লাখ টন আমদানির লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মোট ১ লাখ ২৫ হাজার টনের সরবরাহকারী পাওয়া গেছে। এ অবস্থায় নতুন করে দরপত্র আহ্বানের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। তবে বিসিআইসির পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, আপাতত পুনঃদরপত্র আহ্বানের কোনো পরিকল্পনা নেই। অন্যদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংস্থাটির এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, পুরনো উৎসগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ চলছে এবং পুনঃদরপত্রের বিষয়েও ভাবনা থাকলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

বাংলাদেশের ইউরিয়ার বড় জোগানদাতা চীন, সৌদি আরব ও আরব আমিরাত। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ কাতার থেকেও ইউরিয়া কেনা হয়। তবে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসনের জেরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় সার আমদানি নিয়ে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও অনিশ্চয়তায় পড়েছে। সংকট কাটাতে পুরনো উৎস চীনের কাছ থেকে অতিরিক্ত ইউরিয়া আমদানির চেষ্টা করছে বিসিআইসি। পাশাপাশি নতুন উৎসও খোঁজ করে। ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ব্রুনাইয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। তবে ব্রুনাইয়ের সঙ্গে চুক্তির কাছাকাছি রয়েছে বলে জানায় বিসিআইসি। কৃষি মন্ত্রণালয় ও বিসিআইসি সূত্রে জানা গেছে, দেশে আগামী অর্থবছরে ইউরিয়ার চাহিদা রয়েছে ২৬ লাখ ২২ হাজার টন। নিরাপত্তার জন্য মজুদ হিসেবে আরো পাঁচ লাখ টন মিলিয়ে ইউরিয়া প্রয়োজন ৩১ লাখ টনের বেশি। এর মধ্যে আগামী জুলাই-আগস্টে শুরু হতে যাওয়া আমন মৌসুমের জন্য ইউরিয়ার চাহিদা রয়েছে ৬ লাখ ৬৫ হাজার টন। গত ২৪ মে পর্যন্ত দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এ সার মজুদ ছিল ৩ লাখ ৯৮ হাজার টনের মতো, যেখানে চার লাখ টনকে ন্যূনতম নিরাপদ মজুদসীমা ধরা হয়।

বিসিআইসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করছেন, অল্প অল্প আমদানি হলেও সারের সংকট হবে না। চালু থাকা তিনটি কারখানায় দৈনিক পাঁচ হাজার টনের মতো ইউরিয়া উৎপাদন হচ্ছে। তা দিয়ে আমনের চাহিদা মেটানো সম্ভব। তবে আগামী শীতকালীন মৌসুমকে লক্ষ্য রেখে তারা আমদানির মাধ্যমে মজুদ বাড়াতে চাচ্ছেন। তাদের দাবি, আগামী সেপ্টেম্বর শেষে চাহিদা মিটিয়েও ছয় লাখ টনের মতো মজুদ থাকবে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, একসময় চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ ইউরিয়া বিসিআইসি উৎপাদন করত। তবে এখন চাহিদার ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশই আমদানি করা হয়। বৈশ্বিক এ সংকটের কারণে আমদানি কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই।

বিসিআইসির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির অধীনে থাকা পাঁচটি ইউরিয়া কারখানার বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৩১ লাখ ৫৫ হাজার টন। তবে বিসিআইসির পরিচালক (বাণিজ্যিক, উৎপাদন ও গবেষণা) মো. মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, অধিকাংশ কারখানার বয়স বেশি হওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন সম্ভব হয় না। তার মতে, পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে বছরে ২০ লাখ টনের বেশি ইউরিয়া উৎপাদন করা সম্ভব। এদিকে জানা গেছে, হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে ইউরিয়া আমদানির চেষ্টা করছে বিসিআইসি। এর অংশ হিসেবে সৌদি আরব থেকে ২২ হাজার টন ইউরিয়া বহনকারী একটি জাহাজ ভূমধ্যসাগর হয়ে বাংলাদেশের পথে রয়েছে, যা আগামী ৫ জুন দেশে পৌঁছানোর কথা। এতে পরিবহন ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী অর্থবছরের জন্য ইউরিয়া আমদানির ক্ষেত্রেও ব্যয় বাড়বে বলে জানিয়েছে বিসিআইসি। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ওঠানামার কারণে নির্দিষ্ট করে ব্যয় কতটা বাড়বে তা এখনই নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।

এ বিষয়ে বিসিআইসির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা মো. গোলাম ফারুকের মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক বাজারে সারের দাম ও জাহাজ ভাড়া বেড়েছে। ফলে আগামী অর্থবছরের জন্য যে ইউরিয়া কেনা হবে তার জন্য আগের বছরের তুলনায় ব্যয়ও বাড়বে। তবে কী পরিমাণ বাড়বে সেটি এখন বলা সম্ভব না। আগামী অর্থবছরে ইউরিয়া আমদানিতে কেমন বাজেট লাগতে পারে সে বিষয়ে গত বছরের অক্টোবরের দিকে হিসাব চাওয়া হয়েছিল। তখন আমরা চলতি অর্থবছরের দামের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি প্রক্ষেপণ করেছিলাম। এখন বৈশ্বিক বাজারে অনেক দাম বেড়েছে। ফলে নিশ্চিতভাবে ব্যয়ও বাড়বে। ব্যয়ের বিষয়টি রিভাইস বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হবে।’

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘বৈশ্বিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়া এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা থাকায় সরবরাহকারী কম পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে নিজেদের প্রয়োজনে অনেক দেশ সার বিক্রি কমিয়ে দিয়েছে। ফলে বৈশ্বিক সংকটের কারণে সার পাওয়া নিয়েও উদ্বেগ আছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো সমাধান—দেশেই উৎপাদন বাড়ানো। এছাড়া হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে আনা যাবে এমন উৎস খুঁজে সেখান থেকে পেলে আমদানি করতে হবে।