রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আমদানি করা ৮৭৬ টন কাঁচামাল অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করছে। এর মধ্যে দাহ্য রাসায়নিকও রয়েছে এবং এসব পণ্যের প্রায় সবই তৈরি পোশাক খাতের। দীর্ঘদিন ধরে কাঁচামালগুলো বিমানবন্দরের সংবেদনশীল ‘টারম্যাক’ এলাকায় পড়ে আছে। টারম্যাক হলো রানওয়ের বাইরের সেই অংশ, যেখানে বিমান পার্কিং, জ্বালানি গ্রহণ, যাত্রী ওঠানামা এবং মালামাল লোড-আনলোড করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য জমে থাকায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি বিষয়টি জানিয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) তৈরি পোশাক খাতের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএকে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, পণ্য জটের কারণে বিমানবন্দরের ফায়ার টেন্ডার বা অগ্নিনির্বাপক গাড়ির চলাচল এবং এয়ার সাইড অপারেশন—যেমন রানওয়ে, টারম্যাক ও হ্যাঙ্গারের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে অগ্নিকাণ্ডসহ নানা ঝুঁকি বাড়ছে। ঝুঁকি এড়াতে এসব কাঁচামাল জরুরি ভিত্তিতে টারম্যাক এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এর আগেও একাধিকবার এ বিষয়ে অনুরোধ জানানো হলেও কোনো কার্যকর ফল পাওয়া যায়নি বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
বেবিচকের চিঠি পাওয়ার পর বিজিএমইএ আমদানি করা পণ্য দ্রুত বিমানবন্দর থেকে ছাড় করে নেওয়ার জন্য সদস্যদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে। এ বিষয়ে বেবিচকের চিঠিও সংযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। সংগঠনটি আরও জানিয়েছে, খোলা আকাশের নিচে পণ্য সংরক্ষণ করায় বৈরী আবহাওয়ার কারণে আমদানি করা কাঁচামাল কখনও রোদের তাপে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, আবার কখনও বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আমদানি পণ্য ডেলিভারি না নিলে বিমান কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে উচ্চ হারে ডেমারেজ চার্জ আরোপ করা হতে পারে বলে সদস্যদের সতর্ক করেছে বিজিএমইএ।
আকাশপথে সাধারণত রপ্তানিমুখী পণ্যের স্যাম্পল বা নমুনা পরিবহন করা হয়। রপ্তানি আদেশ প্রক্রিয়ায় ব্র্যান্ড-ক্রেতাদের পণ্যের নমুনা পাঠানো হয়। সেই নমুনা অনুযায়ী পণ্য তৈরি করে আবার ব্র্যান্ড-ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানো হয়। এই প্রক্রিয়ায় একাধিকবার নমুনা পরিবহন করা হয়। আমদানি ও রপ্তানির এই প্রক্রিয়ায় বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ ব্যবহার করা হয়। নমুনা পরিবহনের বাইরে জরুরি কিছু কাঁচামাল, এক্সেসরিজ আমদানিতেও হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ ব্যবহার হয়ে থাকে। এ ছাড়া কুরিয়ারে পাঠানো আমদানি-রপ্তানি নথিপত্রও থাকে এর মধ্যে।
জানতে চাইলে তৈরি পোশাকের নিট ক্যাটেগরির পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম গতকাল বলেন, আসল কথা হচ্ছে– কাস্টমস কর্তৃপক্ষের তৈরি করা জটিলতার কারণেই আমদানিকারকরা সময়মতো পণ্য খালাস করে নিতে পারেন না। আকাশপথে আমদানি করা সবই অত্যন্ত জরুরি পণ্য। এ কারণেই সমুদ্রপথে পরিবহন ব্যয় কম– তা সত্ত্বেও কয়েকগুণ বেশি পরিবহন ব্যয়ে আকাশপথে আনা হয়। জরুরি এই কাঁচামাল বিমানবন্দরে ফেলে রাখার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। তিনি বলেন, কেন পণ্য খালাস হচ্ছে না– সে বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটির মাধ্যমে দায়ীদের শনাক্ত করতে পারে সরকার।
ঢাকা কাস্টমস এজেন্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বৃষ্টিতে ভিজে ও রোদের তাপে কিছু পণ্যের মান নষ্ট হচ্ছে। বর্ষা মৌসুম শুরু হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে কার্যকর কোনো সমাধান না পেয়ে ব্যবসায়ীরা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ বিমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও সমস্যার সমাধান হয়নি। এদিকে এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) হিসাব অনুযায়ী, গত অক্টোবরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১২ হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া প্রায় ২০০ কোটি টাকার রপ্তানিমুখী ওষুধসামগ্রী পুড়ে নষ্ট হয়, যার ফলে রপ্তানি সরবরাহ ব্যবস্থাও ব্যাহত হয়।
