দেশজুড়ে গ্যাস সংকটের চাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে গভীর ভূগর্ভে নতুন সম্ভাবনার খোঁজে কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রায় ৫ হাজার ৬০০ মিটার গভীর পর্যন্ত কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই ডিপ ড্রিলিং প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে চীনের প্রতিষ্ঠান সিনোপেক কনট্র্যাক্টিং অ্যান্ড ড্রিলিং কোম্পানি লিমিটেড (সিসিডিসি)। সোমবার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে দেখা যায় ব্যস্ত কর্মপরিবেশ, যেখানে বিশাল ড্রিলিং রিগের অবিরাম কাজের পাশাপাশি দেশি ও চীনা কর্মীদের সমন্বিত অংশগ্রহণে মাটির গভীরে নতুন সম্ভাবনার অনুসন্ধান চলছে।
সীমা ছাড়িয়ে গভীর অনুসন্ধান
দেশে আগে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৯০০ মিটার পর্যন্ত কূপ খননের রেকর্ড থাকলেও এবার সেই সীমা অতিক্রম করে প্রায় ৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার বা ১৮ হাজার ৩৭২ ফুট গভীর পর্যন্ত খননের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সাধারণত এই গভীর স্তরে বড় গ্যাস মজুতের সম্ভাবনা থাকে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী আব্দুল জলিল প্রামাণিক জানান, এই কূপ খনন শেষ হওয়ার পর একই রিগ ব্যবহার করে বাখরাবাদেও আরেকটি কূপ খনন করা হবে। দুটি প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৯৪ কোটি টাকা এবং পরিকল্পনা সফল হলে প্রায় দুই টিসিএফ গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত ফল নিশ্চিত করতে খনন শেষে বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে।
চাহিদা ও সরবরাহে বড় ফারাক
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা কাগজে প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট হলেও বাস্তবে তা ৫০০ কোটি ঘনফুটের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এর বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২৬০ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে ৮০ থেকে ৮৫ কোটি ঘনফুট আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় এ ঘাটতি ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে নতুন গ্যাস মজুত আবিষ্কার হলে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সময় ও অগ্রগতি
তিতাস-৩১ কূপ খননে সময় ধরা হয়েছে ২১০ দিন। গত ১৯ এপ্রিল শুরু হওয়া কাজের প্রায় ২২ শতাংশ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে বাখরাবাদ-২১ কূপ খননে সময় লাগবে প্রায় ১৮০ দিন। খনন শেষে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে গ্যাসের উপস্থিতি ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। উপযোগী হলে তা জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে।
ভূগর্ভে সম্ভাবনার চার স্তর
বিশেষজ্ঞদের মতে, তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৫ হাজার ৪০০ মিটার গভীরতার মধ্যেই গ্যাসের সম্ভাবনা বেশি। এই এলাকায় চারটি সম্ভাবনাময় স্তর চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রথম স্তরটি ৩ হাজার ৭৩৬ থেকে ৩ হাজার ৭৬৫ মিটার এবং শেষ স্তরটি ৫ হাজার ৩১৫ থেকে ৫ হাজার ৩৪৪ মিটার গভীরে অবস্থিত। মাঝের দুটি স্তরও সম্ভাবনাময় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে গভীরতার সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়ছে—৩ হাজার ৭৫০ মিটার অতিক্রম করলেই উচ্চচাপ অঞ্চল শুরু হয়, যা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে পুরো খনন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ঝুঁকি মোকাবিলায় এবার ১৫ হাজার পিএসআই সক্ষমতার উন্নত ব্লো-আউট প্রিভেন্টর ব্যবহার করা হচ্ছে। পুরো প্রকল্পটি চীনা প্রতিষ্ঠান সিনোপেক কনট্র্যাক্টিং অ্যান্ড ড্রিলিং কোম্পানি লিমিটেড (সিসিডিসি) বাস্তবায়ন করছে, যাদের গভীর কূপ খননে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
বিজিএফসিএলের কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের উচ্চক্ষমতার রিগ ও প্রযুক্তি দেশে এই প্রথম ব্যবহার হচ্ছে। তাই প্রকল্পটি শুধু গ্যাস অনুসন্ধান নয়, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তিতাসের মাটির নিচে কী আছে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে প্রতিটি মিটার অগ্রগতির সঙ্গে বাড়ছে প্রত্যাশা। দেশের জ্বালানি সংকটের এই সময়ে এই ডিপ ড্রিলিং খুলে দিতে পারে নতুন সম্ভাবনার দরজা।
