মডেলিং ক্লের নামে প্রসাধনী-গয়না, শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা

জেরিন এন্টারপ্রাইজ

চট্টগ্রাম বন্দরে মডেলিং ক্লে ও সেফটি পিনের নামে চীন থেকে আনা হয়েছে প্রায় ৫ হাজার কেজি প্রসাধনী ও গয়না। চালানটি আমদানির সময় এসব পণ্যের পরিবর্তে কম শুল্কের মডেলিং ক্লে, আলপিন ও সেফটি পিন দেখানো হয়। কাস্টমসের পরীক্ষায় ঘোষণার সঙ্গে পণ্যের বড় ধরনের গরমিল ধরা পড়ার পর চালানটি আটকে দেয়া হয়েছে। কাস্টমস বলছে, সরকারি রাজস্ব ফাঁকির উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

দেশের আমদানি-রপ্তানির অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পণ্য খালাস হয়। শুল্ক, কর ও সার্ভিস চার্জ মিলিয়ে এখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার লেনদেন হয়। এই বিশাল বাণিজ্যের মধ্যে মিথ্যা ঘোষণা, পণ্যের ধরন ও ওজনে কারসাজি এবং শুল্ক ফাঁকির মতো অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। সম্প্রতি এমন একটি চালান ধরা পড়ে চট্টগ্রাম কাস্টমসের পরীক্ষায়। নথিপত্র অনুযায়ী, ঢাকার চকবাজারের প্রতিষ্ঠান ফাতেমা এন্টারপ্রাইজ চীন থেকে ৯ হাজার ৭৫০ কেজি মডেলিং ক্লে এবং ৫ হাজার ৫২৮ কেজি আলপিন ও সেফটি পিন আমদানির ঘোষণা দেয়। চালানটির ইনভয়েস মূল্য দেখানো হয় ১৫ হাজার মার্কিন ডলার।

কিন্তু পণ্য পরীক্ষার সময় কাস্টমস দেখতে পায়, ঘোষিত দুই ধরনের পণ্য রয়েছে মাত্র প্রায় ১ হাজার ৩০০ কেজি। এসব পণ্যের শুল্ক-কর হার ৬৪ শতাংশ। অন্যদিকে, ঘোষণার বাইরে পাওয়া যায় প্রায় ৫ হাজার কেজি পণ্য। এর মধ্যে রয়েছে মেকআপ কিট, ফাউন্ডেশন, আইশ্যাডো, আইলাইনার, চোখ ও ঠোঁটের বিভিন্ন প্রসাধনী, ক্রিম এবং গয়না। এসব পণ্যের শুল্ক-কর হার ১১৭ শতাংশ—ঘোষিত পণ্যের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। অর্থাৎ, যে পণ্যগুলোর শুল্ক-কর তুলনামূলক কম, সেগুলোর নাম ঘোষণা করে বেশি শুল্কের পণ্য আনার অভিযোগ উঠেছে এই চালানে। কাস্টমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি রাজস্ব ফাঁকির উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে পণ্যের মিথ্যা ঘোষণা দেয়া হয়েছে। তবে এই চালানে ঠিক কত টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হয়েছে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কাস্টমসের মূল্যায়ন ও শুল্কায়ন শেষ হলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার ও মুখপাত্র শরীফ আল আমিন বলেন, মিথ্যা ঘোষণার সব ঘটনায় চট্টগ্রাম কাস্টমস ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। কাস্টমস আইন অনুযায়ী এ ঘটনায় ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি জানান, চালানটি পুনঃপরীক্ষার জন্য সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট আবেদন করেছে। কমিশনার আবেদনটি নাকচ করলে ফাইল মূল্যায়ন ও শুল্কায়নের জন্য পাঠানো হবে। এরপর আমদানিকারক কত টাকার শুল্ক-কর ফাঁকির চেষ্টা করেছে, তা জানা যাবে। মিথ্যা ঘোষণা ইচ্ছাকৃতভাবে দেয়া হয়েছে—তদন্তে তা প্রমাণিত হলে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।

চালানটির সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের জেরিন এন্টারপ্রাইজ। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, আমদানিকারকের দেয়া কাগজপত্র কাস্টমসে জমা দেয়া এবং পণ্য পরীক্ষার সময় সহযোগিতা করা ছাড়া তাদের ভূমিকা নেই। কাস্টমসে দেয়া নথিতে থাকা ঠিকানায় গিয়ে সেখানে একজন আয়কর আইনজীবীকে পাওয়া যায়। তিনি জানান, জেরিন এন্টারপ্রাইজ ওই ঠিকানা পরিবর্তন করেছে এবং তিনি সাবলেট হিসেবে সেখানে থাকেন।

পরে বিভিন্নভাবে খোঁজ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নতুন ঠিকানায় গেলে ভিন্ন শাখার কর্মকর্তাদের পাওয়া যায়। সে সময় সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা অংশীদার সেখানে ছিলেন না। পরে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দায় আমদানিকারকের ওপর দেন। একই সঙ্গে আমদানিকারকের ফোন নম্বর দিতেও অস্বীকৃতি জানান। জেরিন এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা অংশীদার মাহবুবুর রহমান সাগর বলেন, আমদানিকারক যে ডকুমেন্ট দেয়, আমরা সেগুলোই জমা দিই এবং কাস্টমসের পরীক্ষার সময় উপস্থিত থাকি। পরীক্ষার পর কাস্টমস যা পায়, তার ভিত্তিতে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়। তার দাবি, ঘোষণার বাইরে পাওয়া পণ্যগুলো নিষিদ্ধ নয়; এগুলো আমদানিযোগ্য পণ্য। তবে এসব পণ্য আমদানির ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়নি। এ ঘটনায় আমদানিকারককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে এবং তারা এর জবাবও দিয়েছে। মাহবুবুর রহমান বলেন, কাস্টমস পণ্যগুলোর মূল্য নির্ধারণ করে প্রযোজ্য শুল্ক-কর আদায় করবে। আইনগত প্রক্রিয়া শেষ হলে পণ্যগুলো খালাস করা হবে।

কাস্টমস কর্মকর্তাদের মতে, এ ধরনের মিথ্যা ঘোষণার ঘটনায় আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের একটি সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত থাকতে পারে। এর সঙ্গে কাস্টমস বা অন্য কোনো সংস্থার ভেতরের কারও যোগসূত্র রয়েছে কিনা, সেটিও তদন্তের বিষয়। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে এমন যোগসূত্রের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার আগে তদন্ত ও কাস্টমসের প্রক্রিয়া শেষ হওয়া প্রয়োজন। এই চালানের ক্ষেত্রে এখন মূল প্রশ্ন, মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে কত টাকার শুল্ক-কর ফাঁকির চেষ্টা করা হয়েছে এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত। কাস্টমসের মূল্যায়ন ও পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়াতেই মিলবে এর উত্তর।