স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের আগেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, ইইউর সঙ্গে এফটিএ নিয়ে আলোচনা শীঘ্রই শুরু হবে। তবে এফটিএ স্বাক্ষর সম্ভব না হলে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে বর্তমান বাজারসুবিধা অব্যাহত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হবে। বৃহস্পতিবার হংকংয়ে বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের আয়োজনে ‘বাংলাদেশে বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।
বিনিয়োগ পরিবেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বাংলাদেশের উচ্চ সরবরাহ ব্যয়ের কথা তুলে ধরে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১৬ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক গড় প্রায় ১০ শতাংশ। পরিবহন, উৎপাদন এবং আমদানি-রপ্তানি ব্যয় কমিয়ে এ ব্যবধান কমাতে হবে। বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে নীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, সরবরাহ ব্যয় কমানো, শুল্ক ব্যবস্থার স্বয়ংক্রিয়ীকরণ এবং ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজ করার ওপরও জোর দেন তিনি।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ২০২৯ সালে এলডিসির তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সুবিধা ধরে রাখতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করা হচ্ছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি হয়েছে। এ ছাড়া আরও প্রায় ১৩টি দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে আন্তর্জাতিক পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করা এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। এসব অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন ও বন্দর ব্যবস্থাপনার ব্যয় কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন মন্ত্রী।
ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ঋণপত্র খোলার পর্যায়ে যেতে কয়েকশ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। পুরো প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল করা হচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে নতুন একটি প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ ১৪ দিনের মধ্যে ঋণপত্র খোলার পর্যায়ে যেতে পারবে। ট্রেড লাইসেন্স ও শেয়ার হস্তান্তরসহ বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রক্রিয়াও ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, এর ফলে উদ্যোক্তাদের সরকারি দপ্তরে সরাসরি উপস্থিতির প্রয়োজন অনেকটাই কমবে।
শুল্ক ব্যবস্থার সংস্কার প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, স্বয়ংক্রিয়ীকরণের মাধ্যমে আমদানিকারকদের পণ্য খালাসের সময় ও ব্যয় কমানো হবে। প্রতিষ্ঠিত ও নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় শারীরিক পরিদর্শন কমিয়ে ঝুঁকিভিত্তিক শুল্ক ব্যবস্থাপনা চালুর উদ্যোগ রয়েছে। আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে শুল্ক ব্যবস্থার অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ ও প্রক্রিয়া অনেকটাই শিথিল হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি। বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের কথাও তুলে ধরেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ জাহাজ বাংলাদেশ ও ভারতে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে এ খাতে আরও বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
শ্রীলঙ্কায় আলু-পেঁয়াজ রপ্তানির সম্ভাবনা যাচাই
এদিকে, শ্রীলঙ্কার বাজারে বাংলাদেশি আলু ও পেঁয়াজ রপ্তানির সম্ভাবনা যাচাই করতে শীঘ্রই দেশটিতে বাণিজ্য প্রতিনিধি দল পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। হংকংয়ে অনুষ্ঠিত ১১তম ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড শীর্ষ সম্মেলন ২০২৬’-এর দ্বিতীয় দিনে বৃহস্পতিবার এক পার্শ্ব-আয়োজনে শ্রীলঙ্কার বাণিজ্য, বাণিজ্যিক কার্যক্রম, খাদ্য নিরাপত্তা ও সমবায় উন্নয়নমন্ত্রী ওয়াসান্থা সামারাসিংহের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয় বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। বৈঠকে ওয়াসান্থা সামারাসিংহে বাংলাদেশ থেকে আলু ও পেঁয়াজ আমদানিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আঞ্চলিক বাণিজ্য জোরদার হলে এ অঞ্চলের মানুষের জন্য তা ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।
