ব্যাংক খাতের আর্থিক দুরবস্থার নেতিবাচক প্রভাব এখন প্রধান সব সূচকে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। কিছু ব্যাংক ভালো মুনাফা করলেও তা সামগ্রিক চিত্র বদলাতে পারেনি। প্রথমবারের মতো পুরো খাতে বড় ধরনের লোকসান রেকর্ড হয়েছে। ২০২৫ সালে ব্যাংক খাতের নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। অথচ ২০২৪ সালে একই খাতে নিট মুনাফা ছিল ১২ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা। এর আগের বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে পুরো ব্যাংক খাত লাভজনক অবস্থায় ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত ‘বার্ষিক আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন ২০২৫’-এ এই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ব্যাংক খাতের নিট সুদ আয় ঋণাত্মক ১২ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা। এর মানে আমানতকারীদের যে পরিমাণ সুদ দেওয়া হয়েছে, সে তুলনায় ঋণ থেকে আয়ে পরিমাণ কম হয়েছে। আগের বছর ২৯ হাজার ৩৯১ কোটি টাকার নিট সুদ আয় হয়েছিল। অবশ্য সুদবহির্ভূত আয় ২০২৪ সালের ৬৩ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৮৩ হাজার ১৭১ কোটি টাকা হয়েছে। গত বছর বেতন-ভাতাসহ পরিচালন ব্যয় হয়েছে ৫১ হাজার ৬৩ কোটি টাকা, যা আগের বছর ৪৮ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা ছিল। সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতের কর-পূর্ববর্তী লোকসান ছিল এক লাখ ২৪ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা। আর নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা।
আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে ব্যাংকভিত্তিক লাভ-লোকসানের বিস্তারিত তথ্য না থাকলেও জাতীয় বাজেটের সঙ্গে প্রকাশিত ‘ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও তথ্যাবলি’ শীর্ষক বইয়ে প্রতিটি ব্যাংকের সূচকভিত্তিক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ওই তথ্য অনুযায়ী, নিট লোকসানে শীর্ষ ১০ ব্যাংক একসঙ্গে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকার লোকসান করেছে। এর মধ্যে শীর্ষ পাঁচে রয়েছে একীভূত হওয়া কয়েকটি ব্যাংক। গত বছর এককভাবে সবচেয়ে বেশি লোকসান করেছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, যার নিট লোকসান ৬৬ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা। এরপর রয়েছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ৩১ হাজার কোটি, এক্সিম ব্যাংক ২৮ হাজার ৯০৯ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি এবং ইউনিয়ন ব্যাংক ৪ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা। লোকসানের তালিকায় পরের অবস্থানে রয়েছে এবি ব্যাংক ৩ হাজার ৭০৬ কোটি, আইএফআইসি ব্যাংক ২ হাজার ৫৬১ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংক ২ হাজার ৪৩০ কোটি, প্রিমিয়ার ব্যাংক ৯৯৩ কোটি এবং পদ্মা ব্যাংক ৯৩০ কোটি টাকার নিট লোকসান নিয়ে।
চরম দুরবস্থার মধ্যেও কয়েকটি ব্যাংক রেকর্ড মুনাফা করেছে। এ তালিকার শীর্ষে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। ব্যাংকটি গত বছর এক হাজার ৫৮১ কোটি টাকার নিট মুনাফা করেছে। এ ছাড়া সিটি ব্যাংক এক হাজার ৩০৬ কোটি, পূবালী ব্যাংক এক হাজার ৭৯ কোটি, ইস্টার্ন ব্যাংক ৯১০ কোটি এবং প্রাইম ব্যাংক ৮৯০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে গত বছর ১৬টি ব্যাংক লভ্যাংশ দিতে পেরেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংক খাতের দুরবস্থা কাটাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্ধ কারখানা সচলসহ অর্থনীতি চাঙ্গা করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া হয়েছে। সঠিকভাবে এসব ঋণ বিতরণ হলে ঋণ আদায় বেড়ে দ্রুত ব্যাংক খাতের পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন উপায়ে ঋণ নিয়মিত দেখানো হলেও ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পেতে শুরু করে। এরপর থেকেই পুরো ব্যাংক খাতের বাস্তব অবস্থা সামনে আসে। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে। বিশেষ পুনঃতপশিলের কারণে পরবর্তী তিন মাসে খেলাপি ঋণ ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা কমে ডিসেম্বরে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকায় নেমে আসে, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। মূলত লুকানো খেলাপি ঋণ প্রকাশ পাওয়াসহ দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ দ্রুত বৃদ্ধির ফলে পুরো খাতের দুর্বল চিত্র স্পষ্ট হয়েছে। গত বছর রেকর্ড পরিমাণ এক লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ পুনঃতপশিল করা হলেও ব্যাংক খাতে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এক বছর আগে এই দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৫৬ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণ ব্যাপক বৃদ্ধির ফলে ব্যাংক খাতের সামগ্রিক মূলধন ঘাটতি প্রথমবারের মতো ঋণাত্মক ধারায় চলে গেছে। ব্যাংকগুলোকে যেখানে মোট ঝুঁকিভিত্তিক ঋণের সাড়ে ১২ শতাংশ মূলধন রাখার কথা। গত বছর শেষে তা ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমেছে। আগের বছর শেষেও প্রয়োজনের তুলনায় মূলধন অনেক কম ছিল। তবে তা ছিল ইতিবাচক ৩ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। মূলত ২০টি ব্যাংকের ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার ঘাটতির প্রভাবে পুরো খাতে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
চরম দুরবস্থায় থাকা ব্যাংক খাতের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে বাংলাদেশ ব্যাংক লভ্যাংশ ঘোষণার নীতিমালা আরও কঠোর করেছে। গত বছরের নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জন্য কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশ বা তার বেশি হলে তারা লভ্যাংশ দিতে পারেনি। একইভাবে মূলধন বা প্রভিশন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলো মুনাফা করলেও লভ্যাংশ ঘোষণার সুযোগ পায়নি। এ নীতির ফলে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ১৬টি ব্যাংক লভ্যাংশ দিতে সক্ষম হয়েছে। ২০২৬ সালের জন্য এ নির্দেশনার পাশাপাশি নতুন করে দুটি শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, পরিশোধিত মূলধন ২ হাজার কোটি টাকার কম হলে কোনো ব্যাংক নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে না।
