বিএসটিআইয়ের ঝুঁকিভাতায় ব্যয় হাজার কোটি টাকা

মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) সব কর্মকর্তা-কর্মচারীই পাচ্ছেন ঝুঁকিভাতা। এ খাতে বছরে ব্যয় হচ্ছে সংস্থাটির আয়ের প্রায় ১০০ কোটি টাকা। সে হিসাবে গত এক দশকে ঝুঁকিভাতার নামে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) গঠিত প্রাতিষ্ঠানিক টিমের অনুসন্ধানে এমন তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বিএসটিআইয়ের প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, আর্থিক অসংগতি এবং সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে। সম্প্রতি ১৭টি সুপারিশসহ প্রতিবেদনটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠিয়েছে দুদক।

সূত্র জানায়, চলতি নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বিএসটিআইয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের দুর্নীতির উৎস, কারণ ও তা প্রতিরোধের উপায় অনুসন্ধান করে দুদকের গঠিত টিম। অনুসন্ধান শেষে কমিশনের কাছে ১৭টি সুপারিশ জমা দেওয়া হয়। এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে প্রতিবেদন পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। পরে দুদকের সচিব সাইদুর রহমান খানের স্বাক্ষরে প্রতিবেদনটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন। বিএসটিআইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সুপারিশ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদকের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।

দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএসটিআইয়ের আয়ের একটি অংশ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বিধান থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানের আয় ও উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঝুঁকিভাতা ও অন্যান্য সুবিধা দিতে ব্যয় করা হচ্ছে। এ ছাড়া সংস্থাটিতে আর্থিক অনিয়ম, প্রকল্প বাস্তবায়নে অসংগতি এবং সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিএসটিআই আইন, ২০১৮ অনুযায়ী, সংস্থাটির আয় ও উদ্বৃত্ত অর্থ ব্যবস্থাপনায় নির্ধারিত আইনি বিধান অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির আয়কে বেসরকারি অর্থ হিসেবে বিবেচনা করে এর একটি অংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বণ্টন করা হচ্ছে। অথচ অর্থ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, বিএসটিআইয়ের কোনো আয়কে বেসরকারি আয় হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই।

ঝুঁকিভাতার নামে অর্থ বিতরণ নিয়ে এর আগেও একাধিকবার অডিট আপত্তি উঠেছে। এসব আপত্তিতে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের আয়ের ৪০ শতাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার বিএসটিআই কাউন্সিলের নেই। পণ্যের মান সনদ ও লাইসেন্স দেওয়া কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক দায়িত্বের অংশ। ফলে এ থেকে অর্জিত আয় প্রতিষ্ঠানের সরকারি আয় হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা। তারপরও প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়ন না করে দীর্ঘদিনের প্রচলিত নিয়মের অজুহাতে অর্থ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।

২৫ থেকে ২৭ মাসের মূল বেতনের সমান ঝুঁকিভাতা

বিএসটিআইয়ে অনুমোদিত জনবল ৬০৮ জন। দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সবাই ঝুঁকিভাতা পাচ্ছেন। বছরে এ ভাতার পরিমাণ জনপ্রতি ২৫ থেকে ২৭ মাসের মূল বেতনের সমান। গড়ে একজন কর্মকর্তা-কর্মচারী মাসে প্রায় ৬০ হাজার টাকা ঝুঁকিভাতা পান। সব মিলিয়ে বছরে এ খাতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা। সে হিসাবে গত এক দশকে ঝুঁকিভাতা বাবদ বিতরণ করা হয়েছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের মনিটরিং সেল ২০২২ সালের ৫ জুন বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতনের অতিরিক্ত ২৫ থেকে ২৭ মাসের সমপরিমাণ ঝুঁকিভাতা দেওয়া বন্ধের নির্দেশ দেয়। ওই নির্দেশনার বিরুদ্ধে একই বছর হাইকোর্টে রিট করেন বিএসটিআইয়ের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মো. তুহিন আহমেদ। রিটের পরিপ্রেক্ষিতে নির্দেশনার কার্যকারিতা স্থগিত হলে ঝুঁকিভাতা নেওয়া অব্যাহত থাকে বলে দুদকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বিএসটিআইয়ের ৬০৮টি পদের গ্রেডভিত্তিক বিবরণও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে গ্রেড-৪-এ ছয়টি, গ্রেড-৬-এ ৫১টি, গ্রেড-৯ ও তদূর্ধ্বে ৩৭৫টি, গ্রেড-১০ ও ১১-তে নয়টি, গ্রেড-১২ থেকে ১৬-তে ১০৭টি এবং গ্রেড-১৭ থেকে ২০-এ ৫৯টি পদ রয়েছে। এসব পদের বিপরীতে কর্মরত সবাই ঝুঁকিভাতা পাচ্ছেন।

বিধিমালা হয়নি প্রায় আট বছরেও

বিএসটিআই আইন, ২০১৮-এর ৪১ ধারায় প্রতিষ্ঠানের তহবিল গঠন, অর্থের উৎস, তফসিলি ব্যাংকে অর্থ জমা এবং বিধি অনুযায়ী তহবিল পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। তবে আইন প্রণয়নের প্রায় আট বছর পেরিয়ে গেলেও প্রয়োজনীয় বিধিমালা তৈরি করা হয়নি। দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিধিমালা না থাকার সুযোগে ঝুঁকিভাতা, পেনশনভাতা ও কল্যাণভাতাসহ বিভিন্ন খাতে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। এসব ব্যয়ের যৌক্তিকতা ও আইনি ভিত্তি নিয়ে অডিট আপত্তি রয়েছে। আলাদা কল্যাণ তহবিল থাকার পরও প্রতিষ্ঠানের অর্থ থেকে কল্যাণমূলক খাতে ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অডিট আপত্তি থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেই

বিএসটিআইয়ের বিভিন্ন আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে সরকারি বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তরের একাধিক আপত্তি রয়েছে। এসব আপত্তির মধ্যে সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘন করে দরপত্র মূল্যায়ন, অযোগ্য ঠিকাদারকে যোগ্য বিবেচনা করে চুক্তি সম্পাদন এবং প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএসটিআইয়ের প্রধান কার্যালয়ের প্রশাসন ভবনের চতুর্থ তলার ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ কাজে ১ কোটি ৫১ লাখ ৭৫ হাজার ৫৮৬ টাকার অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। একই তলার সৌন্দর্যবর্ধনের কাজে ফলস সিলিং স্থাপন না করেই ৫ লাখ ৫৩ হাজার ৭২৮ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এ ছাড়া নকশা ও কার্যাদেশের বাইরে করা কাজে ১৯ লাখ ১১ হাজার ১৯৭ টাকা বিল দেওয়ার বিষয়টিও অডিট আপত্তিতে উঠে এসেছে।

অন্যদিকে, ‘পাঁচ জেলায় বিএসটিআইয়ের সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্পের ২ কোটি ২০ লাখ ৭ হাজার ২০০ টাকার কেনাকাটায় অনিয়ম এবং ঠিকাদারের কাছ থেকে ২ লাখ ৬৯ হাজার ১৬১ টাকা বিলম্বজনিত ক্ষতিপূরণ আদায় না করার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া মহাপরিচালকের অবসরভাতার নামে অনিয়মিতভাবে অর্থ গ্রহণের বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মবহির্ভূতভাবে বছরে ২৫ থেকে ২৭ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ বোনাস ভোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ সত্য হলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একটি মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান হয়েও ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মাধ্যমে জনগণের অর্থ আত্মসাতের দৃষ্টান্ত তৈরি করা হচ্ছে। এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনি প্রক্রিয়ায় জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি নিয়মবহির্ভূতভাবে নেওয়া অর্থ ফেরত নিশ্চিত করতে হবে।

জনবল কাঠামো পুনর্বিন্যাসের সুপারিশ

দুদকের অনুসন্ধানে বিএসটিআইয়ের জাল সিল ব্যবহার করে নিম্নমানের ও ভেজাল পণ্য বাজারজাত করার অভিযোগও উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে সংস্থাটি ১৭ হাজার ৮৯৭টি খাদ্যপণ্যসহ মোট ২৭ হাজার ৫৭টি নমুনা পরীক্ষা করে। তবে বাধ্যতামূলক লাইসেন্সের আওতার বাইরে থাকা অনেক পণ্য যথাযথ তদারকির বাইরে রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় লাইসেন্সের আওতা বাড়ানো, গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার, বিশেষ অভিযান পরিচালনা, কারখানা পরিদর্শন এবং বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ বাড়ানোর সুপারিশ করেছে দুদক।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিএসটিআই, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা এবং একই ধরনের কাজের পুনরাবৃত্তির কারণে অর্থ ও জনবলের অপচয় হচ্ছে। এ জন্য সংস্থাগুলোর দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করা, সমন্বিতভাবে কার্যক্রম পরিচালনা এবং আধুনিক কেন্দ্রীয় পরীক্ষাগার স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া লাইসেন্স ও নমুনা অনুমোদন নিতে উদ্যোক্তাদের হয়রানি বন্ধে কর্মকর্তাদের পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব দেওয়া, অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা নজরদারি এবং তদারকি জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে।

বিএসটিআইয়ের অনুমোদিত ৮৪২টি পদের মধ্যে ৪৭৬টি নবম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব পর্যায়ের। এ অবস্থায় জনবল কাঠামো পুনর্বিন্যাস, মাঠপর্যায়ে তদারকি বাড়ানো এবং পরীক্ষাগার আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পরামর্শ দিয়েছে দুদক। পাশাপাশি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।বিএসটিআইয়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান বলেন, বিষয়টি তিনি এখনো জানেন না। খোঁজ নিয়ে পরে জানাতে পারবেন।

অন্যদিকে, বেতনের বাইরে বছরে ২৫ থেকে ২৭ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ ঝুঁকিভাতা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হক বলেন, বিষয়টি নতুন নয়। এর একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। যেভাবে অভিযোগটি উপস্থাপন করা হচ্ছে, বিষয়টি ঠিক তেমন নয়। তবে এটি নতুন কোনো বিষয়ও নয়।