বিআইএন সাসপেন্ড, আইজিএম পরিবর্তনের পর কাপড় খালাস করে-ই বিক্রি

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে তুঘলকি কাণ্ড

** রাফায়েত গ্রুপের এস ইসলাম এন্ড ফ্যাশন লিমিটেডের ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে বিআইএন সাসপেন্ড রয়েছে
** সিটিজি ফোর ব্রাদার্স অ্যাপারেলস লিমিটেড এস ইসলামের আমদানি করা চালানটির আইজিএম কৌশলে পরিবর্তন করে ৯ এপ্রিল কাপড় খালাস করেছে
** খালাস করা ২৮ মেট্রিক টন কাপড় সিটিজি ফোর ব্রাদার্সে গিয়ে পায়নি চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেট
** বিআইএন সাসপেন্ড থাকা সত্ত্বেও চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী প্রোগ্রামার রবিউল আলম নোট দেয় যে এস ইসলামের বিআইএন সচল

বন্ড সুবিধায় কন্টেইনার ভর্তি কাপড় আমদানি করা হয়েছে। সেই আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বন্ড সুবিধার সব কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি করে দেন। কিছু কাপড় দিয়ে পোশাক তৈরি করে রপ্তানি করলেও রপ্তানির সেই টাকা দেশে আসে না। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করায় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বন্ড কমিশনারেট মামলা করেছে, বিআইএন সাসপেন্ড করেছে। প্রায় ৮৭৭ কোটি টাকা পাচারের তথ্য পেয়েছে বিএফআইইউ। প্রতিষ্ঠানটি হলো এস ইসলাম অ্যান্ড ফ্যাশন লিমিটেড। কাহিনী এখানে শেষ নয়। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করা প্রতিষ্ঠানটির আমদানি করা কাপড় চট্টগ্রাম বন্দরে আটকে যায়।

এস ইসলামের আমদানি করা কাপড়ের চালানটির আইজিএম কৌশলে পরিবর্তন করে চট্টগ্রামের আরেক বন্ডেড প্রতিষ্ঠান সিটিচি ফোর ব্রাদার্স অ্যাপারেলস লিমিটেড। এস ইসলামের বিআইএন যে সাসপেন্ড, তা গোপন করে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস থেকে আইজিএম পরিবর্তন করা হয়। আইজিএম পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ফোর ব্রাদার্স প্রায় ২৮ মেট্রিক টন ওজনের কাপড়ের চালানটি খালাস করে। কিন্তু খালাসের পরপরই তা ফোর ব্রাদার্সে পায়নি চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেট। অর্থাৎ এস ইসলামের নামে আমদানি করা চালানটির আইজিএম পরিবর্তন করে ফোর ব্রাদার্স। সেই কাপড় খালাস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা খোলাবাজারে বিক্রি করে দেয়া হয়। বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের প্রমাণ পাওয়ায় বন্ড কমিশনারেট প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এনবিআর সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

এনবিআর সূত্রমতে, চট্টগ্রামের নিউ চাক্তাই এলাকার বন্ডেড প্রতিষ্ঠান সিটিজি ফোর ব্রাদার্স অ্যাপারেলস লিমিটেড। চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেট অভিযোগ পান যে, আইজিএম পরিবর্তন করে ফোর ব্রাদার্স ৯ এপ্রিল ২৮ হাজার ২৬৩ কেজি বা প্রায় ২৮ মেট্রিক টন ওভেন ফেব্রিক্সের একটি চালান খালাস নিয়েছে। কিন্তু শুল্কমুক্ত সুবিধার এই কাপড় প্রতিষ্ঠানটির বন্ডেড ওয়্যারহাউজে প্রবেশ করেনি। এরই প্রেক্ষিতে ১২ এপ্রিল বন্ড কমিশনারেটের একটি প্রিভেন্টিভ টিম ফোর ব্রাদার্সে অভিযান পরিচালনা করে। এসময় ২ এপ্রিল বিল অব এন্ট্রি নং-৬০৭৮৩৫ মাধ্যমে আমদানি করা কাপড়ের বিষয় প্রতিষ্ঠানের কাছে কর্মকর্তারা দেখতে চান। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, ওই চালানের একটি কার্ভাড ভ্যান ও ডেলিভারি চালানের মাধ্যমে আমদানি করা ১৯৪ রোল কাপড় মজুদ আছে। তবে ইনভেস্ট্রিতে আমদানি করা সেই কাপড় এই কাপড় নয়। আবার আমদানি করা কাপড়ের বাকি ৯৯০ রোল বা ২৩ হাজার ৬৩২ কেজি বা ২৩ মেট্রিক টন কাপড় বন্দর থেকে খালাসের পর ওয়্যারহাউজে আসেনি বলে জানান প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। বন্ড কর্মকর্তারা ১৬ এপ্রিল যোগাযোগ করলে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, ওই কাপড় হাউসে প্রবেশ করেনি। এর মানে হলে কন্টেইনার ভর্তি প্রায় ২৮ মেট্রিক টন ওভেন ফেব্রিক্স বা কাপড় বন্দর থেকে খালাস হয়েছে। সেই কাপড় ফোর ব্রাদার্সের ওয়্যারহাউজে প্রবেশ করেনি। অর্থাৎ খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এই কাপড়ের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা, যাতে প্রযোজ্য শুল্ককর প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ টাকা। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে কাপড় বিক্রি করায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ২৩ এপ্রিল চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ফোর ব্রাদার্সের বিরুদ্ধে একটি রাজস্ব ফাঁকির মামলা করেছে।

অপরদিকে, একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়ে, সাভারের বিরুলিয়া এলাকার রাফায়েত গ্রুপের বন্ডেড প্রতিষ্ঠান এস ইসলাম এন্ড ফ্যাশন লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধার সব কাপড় ইসলামপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। শুধু কাপড় বিক্রি নয়, ভুয়া রপ্তানি দেখানো, রপ্তানি করার পরও টাকা দেশে না আনার প্রমাণও পাওয়া গেছে। বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের সত্যতা পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ঢাকা দক্ষিণ কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট প্রায় ৬৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকা শুল্ককর ফাঁকির অভিযোগে মামলা করেছে। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির বিআইএন ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে সম্প্রতি বিএফআইইউ একটি প্রতিবেদন দিয়েছে। যাতে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি নামমাত্র মূল্য দেখিয়ে পোশাক রপ্তানি করলেও দেশে আসেনি প্রায় ৮৭৭ কোটি টাকা। একই গ্রুপের প্রতিষ্ঠান রাফায়েত ফেব্রিক্স লিমিটেডের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগে প্রায় ১০০ কোটি ৮২ লাখ টাকার মামলা হয়েছে।

সূত্রমতে, এস ইসলামের বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধার কাপড় সরাসরি খোলাবাজারে বিক্রির প্রমাণ পাওয়ায় বন্ড কমিশনারেট ও চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস প্রতিষ্ঠানটির আমদানি-রপ্তানিতে সর্তক হয়ে যায়। এস ইসলামের নামে ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর কোরিয়া থেকে বন্ড সুবিধায় ২৮ হাজার ২৬৩ কেজি ওভেন ফেব্রিক্স আমদানি করা হয়েছে। তবে এস ইসলামের ব্যবস্থাপনা পরিচালক যখন বুঝতে পারেন যে, এই কাপড় খালাস সম্ভব নয়। সেজন্য তিনি অপতৎপরতা শুরু করেন। তিনি চট্টগ্রামের সিটিজি ফোর ব্রাদার্স অ্যাপারেলস লিমিটেডকে দিয়ে আইজিএম পরিবর্তনের কাজ শুরু করেন। বিআইএন সাসপেন্ড থাকা প্রতিষ্ঠানের আইজিএম পরিবর্তন করা কষ্টসাধ্য, সেজন্য একটি চক্রকে কাজে লাগায় দুইটি প্রতিষ্ঠান। বিআইএন সাসপেন্ড থাকার পরও চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের প্রোগ্রামার রবিউল আলম ফাইলে নোট দেয় যে, এস ইসলামের বিআইএন লক বা সাসপেন্ড নেই। চক্রটি দ্রুততার সঙ্গে আইজিএম পরিবর্তন করে দেয়। যার প্রেক্ষিতে ২ এপ্রিল ফোর ব্রাদার্সের নামে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হয়। ৯ এপ্রিল তা খালাস নেয়া হয়। খালাসের পরপরই তা ফোর ব্রাদার্সে প্রবেশ করেনি। অর্থাৎ এস ইসলাম ও ফোর ব্রাদার্সের যোগসাজসে খালাসের পরপরই এই কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করছেন বন্ড কর্মকর্তারা।

এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে রাফায়েত গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলামের ব্যক্তিগত নাম্বারে ফোন দেওয়া হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। আর সিটিজি ফোর ব্রাদার্স অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নুরুল ইসলাম চৌধুরী আইজিএম জালিয়াতির কাপড় খালাস করে বিক্রি করে দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, বন্ড কমিশনারেটের অভিযান নয়, রেগুলার চেকিং। আমার আইজিএম পরিবর্তেনের মাল ছিলো, অনেক টাকা পোর্ট ডেমারেজ চলে এসেছে। এস ইসলামের আমদানি চালান কিভাবে আইজিএম পরিবর্তন করা হয়েছে-এই বিষয়ে তিনি বলেন, এস ইসলামকে আমি চিনি না। আমি চাইনিজ সাপ্লাইয়ার থেকে নিয়েছি। এস ইসলামকে ওই চাইনিজ মাল পাঠিয়েছে। ওই মাল তারা রিলিজ করতে পারছে না। এস ইসলাম ওই মালের পেমেন্টও দিতে পারছে না। তখন সাপ্লাইয়ার আমাকে বলেছেন, মালটা কম রেটে ছেড়ে দেবেন। সাপ্লাইয়ার এস ইসলামকে বলেছে এনওসি দেবেন। পরে আইজিএম পরিবর্তন করে মাল খালাস করেছি। এস ইসলামের বিআইএন সাসপেন্ড, এরপরও আইজিএম পরিবর্তন হলো কিভাবে-এই বিষয়ে মো. নুরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, না-তাদের তো সব কাজ চলছে। বিআইএন সাসপেন্ড থাকার পরও আইজিএম কিভাবে পরিবর্তন হলে, সেই বিষয়ে কাস্টমসকে ধরতে বলেন তিনি। তবে খালাস নেয়া কাপড় বিক্রি করে দেওয়ার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সহকারী প্রোগ্রামার যাচাই করে নোট দিয়েছে, ব্যাংক এনওসি দিয়েছে। যার ফলে আইজিএম পরিবর্তন হয়েছে। তবে বিআইএন সাসপেন্ড থাকা, বন্ড সুবিধার কাপড় বিক্রি করে দেওয়া এবং বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা প্রতিষ্ঠানের কিভাবে আইজিএম পরিবর্তন হলো, সেই বিষয়ে তিনি বলেন, একটি এসআরও রয়েছে, যার প্রেক্ষিতে হয়ত হয়েছে।

** রপ্তানির আড়ালে এস ইসলামের ৮৭৭ কোটি টাকা পাচার
** বন্ডের ৪৯২৭ টন কাপড়ের ৩৭৯৭ টন-ই বিক্রি করে দিয়েছে!
** সেই রাফায়েতের ২৫৯৫ টন কাপড় খুঁজে পায়নি বন্ড
** বন্ডের কাপড় ‘ডোর-টু-ডোর সার্ভিস’ ও এলসি বিক্রি করে কেএলডি
** ডোর-টু-ডোরে ৬৪ টন কাপড় বিক্রি করেছে ‘কেএলডি’
** জাল এফওসি ও ইউডির ২৫৮৮ টন কাপড় বিক্রি
** অস্বাভাবিক আমদানি, ভুয়া রপ্তানি, বিক্রি করে কাপড়