প্রতারণার টাকায় জাহাঙ্গীরের পাঁচ বাড়ি, ফ্ল্যাট-জমি-গাড়ি

প্রশ্নফাঁসকারী কর কর্মচারী জাহাঙ্গীর

** সম্পূর্ণ সুস্থ হলেও চাকরি নিয়েছেন প্রতিবন্ধী কোটায়, লিখিত ও ভাইভা দিয়েছেন আরেকজন
** কেন্দ্রীয় কর অঞ্চলে চাকরি নেয়ার আগে থেকেই প্রশ্নফাঁস চক্রের সঙ্গে জড়িত ছিলো
** রাজশাহীতে যোগদান করে প্রতারণার করে টিকতে না পেরে প্রেষণে এনবিআরে আসে
** রাজশাহীর এক পুলিশের আত্মীয়কে চাকরি দেওয়ার কথা বলে টাকা নিয়ে মেরে দেয়, চারদিন জেল খাটে
** এনবিআর, কর অঞ্চলসহ বিভিন্ন জায়গায় কয়েকশ জন থেকে চাকরি দেওয়ার নাম করে কয়েক কোটি টাকা নিয়ে মেরে দিয়েছে

কর বিভাগে কর্মচারী হিসেবে চাকরি করেন। বাহিরে পরিচয় দেন কর্মকর্তা হিসেবে। ছড়েন দামি গাড়িতে। নিজে সম্পূর্ণ সুস্থ। কিন্তু চাকরি নিয়েছেন প্রতিবন্ধী কোটায়। চাকরি নেওয়ার আগেও প্রশ্নফাঁস ও বদলি বাণিজ্য করা চক্রের সঙ্গে জড়িত ছিলো। চাকরি হওয়ার পর থেকে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেন। চাকরি হলেও অফিস করেন না। চাকরি দেওয়ার নাম করে এনবিআর, কর অঞ্চল, ভ্যাট কমিশনারেট, কাস্টম হাউসের বহু কর্মচারী থেকে নিয়েছেন হাতিয়ে নিয়েছেন। এনবিআরের বাইরে বহু সরকারি অফিসে চাকরি দেওয়ার নাম করে টাকা নিয়ে মেরে দিয়েছেন। পরে টাকা চাইলে বেশিরভাগ সময় দিতেন চেক, কিন্তু চেক দেওয়া ব্যাংক হিসাবে কোন টাকা থাকতো না। প্রতারণার টাকায় ঢাকা ও ঢাকার বাইরে গড়েছেন কোটি কোটি টাকার সম্পদ। কর বিভাগের এই প্রতারকের নাম মো. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি কেন্দ্রীয় কর জরীপ অঞ্চল, ঢাকার আওতাধীন খুলনা অফিসে অফিস সহকারী-কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক হিসেবে কর্মরত। অবশেষে যুব উন্নয়নের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসে জড়িত থাকায় গ্রেফতার হয়েছেন। এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, কর বিভাগের বহু কর্মচারী থেকে টাকা নিয়ে মেরে দিয়েছেন। শুধু কর্মচারী নয়, কর্মকর্তারাও জাহাঙ্গীরের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

এনবিআর সূত্রমতে, মো. জাহাঙ্গীর আলম ২০১৯ সালে কেন্দ্রীয় কর জরীপ অঞ্চল, ঢাকায় অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক হিসেবে চাকরি নিয়েছেন। জাহাঙ্গীর সম্পূর্ণ সুস্থ। কিন্তু ৩২ বছর বয়সে প্রতিবন্ধী কোটায় চাকরি নিয়েছেন। জাহাঙ্গীরের লিখিত ও ভাইভা অন্যজন দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে, ঘুষ দিয়ে প্রতারণা করে জাহাঙ্গীর চাকরি নিয়েছেন বলে জানা গেছে। চাকরিতে প্রবেশের পরপরই জাহাঙ্গীরকে কেন্দ্রীয় কর জরীপ অঞ্চলের আওতাধীন রাজশাহী অফিসে বদলি করা হয়। তবে জাহাঙ্গীর মাসে এক বা দুইদিন অফিস করতো। বেশিরভাগ সময় সে রাজশাহী না থেকে ঢাকায় অবস্থান করতো। রাজশাহী অফিসের কিছু কর্মচারীর সহায়তায় খাতায় হাজিরা দেখানো হতো। আর কর বিভাগে চাকরি হওয়ার আগে থেকেই জাহাঙ্গীর প্রশ্নফাঁস চক্র ও বিভিন্ন জায়গায় বদলি বাণিজ্য চক্রের সঙ্গে জড়িত ছিলো। আর বিভাগে চাকরি হওয়ার পর বেপরোয়া হয়ে উঠেন। রাজশাহীতে একটি চক্র গড়ে তোলেন। সেখানে কর অঞ্চল ও বিভিন্ন সরকারি অফিসে চাকরি দেওয়ার নাম করে বিভিন্ন মানুষ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। কিছু জায়গায় চাকরি দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে রাজশাহীতে প্রতারণা করে টিকতে না পেরে এনবিআরে প্রেষণে চলে আসেন। এনবিআর আসলেও অফিস করতো না। এনবিআরের বিভিন্ন কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের আত্মীয়দের চাকরি দেওয়ার নাম করে টাকা নেয়া শুরু করেন। টাকা নেওয়ার পর চাকরি হয় না। জাহাঙ্গীরকে খুঁজে পাওয়া যায় না। পাওয়া গেলেও চেক দেয়, যাতে ব্যাংকের হিসাবে টাকা পাওয়া যায় না।

কর বিভাগের একাধিক ভুক্তভোগী কর্মচারী জানিয়েছেন, রাজশাহী কেন্দ্রীয় কর জরিপ অঞ্চলের বিভিন্ন কলিগ ও রাজশাহীর বিভিন্ন লোকজনকে কর বিভাগসহ বিভিন্ন জায়গায় চাকরি দেওয়ার নাম করে ৮০-৯০ লাখ টাকা নিয়েছেন। কেন্দ্রীয় কর জরিপ অঞ্চল, ঢাকা অফিসের এক সহকর্মীর কাছ থেকে তার এক আত্মীয়কে চাকরি দেওয়ার নাম করে দেড় লাখ টাকা নিয়ে মেরে দিয়েছেন। এনবিআরের একজন গাড়িচালক থেকে চাকরি দেওয়ার নাম করে ২ লাখ টাকা নিয়ে চাকরি দেননি। এনবিআরের এক অফিস সহকারী থেকে তার আত্মীয়কে চাকরি দেওয়ার নাম করে ৫-৬ লাখ টাকা নিয়ে মেরে দিয়েছেন। এনবিআরের কর্মরত কেন্দ্রীয় কর জরিপ অঞ্চলের এক কর্মচারীর ভাইকে চাকরি দেওয়ার নাম করে সাড়ে ৫ লাখ টাকা নিয়ে মেরে দিয়েছেন। এনবিআরের কর্মরত একজন কর্মকর্তা ভাইকে চাকরি দেওয়ার নাম করে অন্তত ১০ লাখ টাকা নিয়ে মেরে দিয়েছেন। হাফিজ নামে একজনের কাছ থেকে চাকরি দেওয়ার নাম করে ২২ লাখ টাকা নিয়েছেন। সাইফুর নামে একজন থেকে অন্তত ৩০ লাখ টাকা নিয়ে মেরে দিয়েছেন। হালিম নামের একজন থেকে তিনজনকে চাকরি দেওয়ার নাম করে অন্তত ৮৫ লাখ টাকা নিয়ে মেরে দিয়েছেন। এনবিআরের দুইজন কর্মকর্তার আত্মীয়কে চাকরি দেওয়ার নাম করে অন্তত ৩০ লাখ টাকা নিয়েছেন। শেষে চাকরি হয়নি, টাকাও ফেরত দেয়নি। দুইটি ভ্যাট কমিশনারেট, নতুন পাঁচটি কর অঞ্চলে চাকরি দেওয়ার নাম করে অন্তত দেড় কোটি টাকা নিয়েছেন। কিন্তু একজনেরও চাকরি হয়নি, টাকাও ফেরত দেয়নি। এনবিআরের বাহিরে বিদ্যুৎ বিভাগ, পেট্রোবাংলাসহ কয়েকটি সরকারি অফিসে জাহাঙ্গীর চক্র চাকরি দেওয়ার নাম করে অন্তত কয়েক কোটি টাকা নিয়েছেন। যার মধ্যে পেট্রোবাংলায় একজনের চাকরি হলেও অন্য জায়গায় চাকরি হয়নি। শুধু প্রতারণা নয়, জাহাঙ্গীর সরকারি চাকরির প্রশ্নফাঁস চক্রের সঙ্গে জড়িত।

আরো জানিয়েছেন, জাহাঙ্গীর চাকরি দেওয়ার নাম করে টাকা নিয়ে ভুয়া প্রশ্ন ধরিয়ে দিতো। পরে চাকরি না হলেও ফোন বন্ধ করে পালিয়ে যেতো। সর্বশেষ রাজশাহীর এক পুলিশ কর্মকর্তার আত্মীয়কে চাকরি দেওয়ার নাম করে টাকা হাতিয়ে নেয়। চাকরি না হওয়ায় পালিয়ে যায় জাহাঙ্গীর। শেষে ওই পুলিশ কর্মকর্তার অভিযোগের ভিত্তিতে দিনাজপুর থেকে পুলিশ এসে জাহাঙ্গীরকে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করে। চারদিন জেল খাটার পর চলতি বছরের জুন মাসে জাহাঙ্গীর জামিন পান। তবে, গ্রেফতার হওয়ার পরও কর অফিস জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় জাহাঙ্গীর এনবিআরে প্রেষণে আসেন। পরে তাকে এনবিআরে মন্ত্রির দপ্তরে বদলি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে যে, জাহাঙ্গীর একদিনও সেখানে অফিস করেননি। জাহাঙ্গীর শুধু চাকরি দেওয়ার নাম করে প্রতারণা নয়, এনবিআরের বদলি সিন্ডিকেটের সঙ্গেও জড়িত ছিলো বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে চাকরি না করলেও কোন সমস্যায় পড়তেন না জাহাঙ্গীর। সর্বশেষ জাহাঙ্গীরকে কেন্দ্রীয় কর জরীপ অঞ্চলের খুলনা অফিসে বদলি করা হয়। কিন্তু সে যোগদান না করায় নামমাত্র শোকজ করা হলেও কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

জাহাঙ্গীরের সম্পদ

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাহাঙ্গীর চাকরির প্রথম থেকেই বেতন তুলতো না। আয়কর বিভাগের বড় কর্মকর্তার ভুয়া আইডি কার্ড ব্যবহার করে বিভিন্ন জায়গায় চাকরি দেওয়ার নাম কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। প্রতারণার টাকায় রাজধানীর হাজারীবাগ ও নীলাচল আবাসিকে ছয়তলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন। রংপুরে গড়েছেন ছয়তলা বাড়ি। রায়ের বাজার এলাকায় ১০ তলা বাড়ি নির্মাণাধীন। মোহাম্মদপুরের বছিলায় আরো একটি ১০ তলা বাড়ি নির্মাণ করছেন। প্রায় কোটি টাকা দামের একটি গাড়ি কিনেছেন, যা দিয়ে প্রায় সময় এনবিআরসহ বিভিন্ন জায়গায় যান। বছিলায় ফ্ল্যাট বিক্রি করার নামে বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা। কামরাঙ্গীর চরে একটি ভবনে তিনটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া ঢাকার মিরপুরসহ তিনটি জায়গায় জমি কিনেছেন জাহাঙ্গীর।

যুব উন্নয়নের নিয়োগের প্রশ্নফাঁসে জাহাঙ্গীর জড়িত, গ্রেফতার

অপরদিকে, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় জাহাঙ্গীরসহ দুই কর্মচারীকে গ্রেফতার করে এসআরবি। পরে গত শনিবার তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।