অর্থ পাচারের মাধ্যমে বিদেশে চলে যাওয়া অর্থ ফেরত আনতে ১৫টি দেশে চিঠি দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াসহ এসব দেশের সঙ্গে পারস্পরিক আইনি সহায়তা বা মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্টের (এমএলএআর) আওতায় অর্থ ফেরানোর প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ২০২৭ সালের আন্তর্জাতিক মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশনের আগে অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে সরকারের প্রস্তুতি আরও জোরদার করা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশনের প্রস্তুতি পর্যালোচনা করতে এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিংয়ের (এপিজি) দুই সদস্যের প্রতিনিধিদল ১১ থেকে ১৩ আগস্ট বাংলাদেশ সফর করছে। এপিজির পরিচালক (কারিগরি সহায়তা ও টাইপোলজিস) মেলিসা সেভিলের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের অপর সদস্য হলেন উপ-নির্বাহী সচিব ডেভিড শ্যানন। সফরের অংশ হিসেবে অর্থ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মুহাম্মদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, অ্যাটর্নি জেনারেল, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের প্রধান এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব উপস্থিত ছিলেন। সভা সূত্রে জানা গেছে, পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরা হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৫টি দেশে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এসব দেশের সঙ্গে প্রয়োজনীয় পারস্পরিক আইনি সহায়তা নিশ্চিত করে অর্থ ফেরানোর প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
চতুর্থ মূল্যায়ন ২০২৭ সালে
২০২৭ সালে বাংলাদেশের চতুর্থ মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশন অনুষ্ঠিত হবে। এতে মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বাংলাদেশের আইনগত কাঠামোর পাশাপাশি বাস্তব কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পাঁচ ধরনের ঝুঁকি নিরূপণ সম্পন্ন করতে হবে। এর মধ্যে জাতীয় ঝুঁকি নিরূপণও রয়েছে। এসব প্রতিবেদন চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
পাঁচটি ঝুঁকি নিরূপণ প্রতিবেদনের তিনটি বিএফআইইউ, একটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং একটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রস্তুত করছে। ডিসেম্বরের মধ্যে খসড়া তৈরি করে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠকের পর প্রতিবেদনগুলো চূড়ান্ত করা হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন, বিএফআইইউ ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি তৃতীয় জাতীয় ঝুঁকি নিরূপণ করছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে সন্ত্রাসে অর্থায়ন এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের বিস্তার-সংক্রান্ত ঝুঁকি নিরূপণের কাজও চলছে। বিএফআইইউর নেতৃত্বে ভার্চুয়াল সম্পদ ও এ-সংক্রান্ত সেবা প্রদানকারী খাতের ঝুঁকি নিরূপণ করা হচ্ছে।
১১ অগ্রাধিকার মামলার অগ্রগতি
সভায় মানিলন্ডারিং-সংক্রান্ত সরকারের নির্ধারিত ১১টি অগ্রাধিকার মামলার অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে যৌথ তদন্ত দলের মাধ্যমে তদন্তাধীন মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় ঘাটতি ও চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করে তা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের ঝুঁকি মোকাবিলায় কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর চলমান সংশোধনীতে প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকের সংজ্ঞা নির্ধারণ, নিবন্ধকের তথ্যভান্ডার উন্নয়ন এবং এক ব্যক্তি কোম্পানির সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার কার্যক্রমও চলছে।
দুই ধাপে মূল্যায়ন
ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের (এফএটিএফ) পদ্ধতি অনুসারে বাংলাদেশের মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশন দুই ধাপে হবে। প্রথম ধাপে ‘কারিগরি অনুগত্য’ যাচাই করা হবে। এতে এফএটিএফের ৪০টি সুপারিশের আলোকে বাংলাদেশের আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা মূল্যায়ন করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে ‘কার্যকারিতা মূল্যায়ন’ হবে। এতে ১১টি তাৎক্ষণিক ফলাফলের ভিত্তিতে মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে আইন ও বিধিবিধানের বাস্তব প্রয়োগ কতটা কার্যকর, তা দেখা হবে।
সভায় বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) নেতৃত্ব ও এর বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা হয়। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। এপিজির প্রতিনিধিদলের সফর এবং ২০২৭ সালের মূল্যায়নকে সামনে রেখে জাতীয় সমন্বয় কমিটির সভায় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয়। অর্থমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রস্তুতি, পারস্পরিক সমন্বয় এবং প্রয়োজনীয় নথি ও তথ্য আগে থেকেই প্রস্তুত রাখার ওপর গুরুত্ব দেন। এ ছাড়া এপিজির প্রতিনিধিদল বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে অনুসৃত পদ্ধতিগুলো পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের বিদ্যমান ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বলে জানা গেছে।
