প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের মালামাল সরবরাহের আড়ালে পাচারের অভিযোগে কাস্টমসের এক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাসহ তিনজনকে মঙ্গলবার (২৩ জুন) দুপুরে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। এর আগে সোমবার গভীর রাতে বেনাপোল বাজার এলাকা থেকে বর্ডার গার্ড বিজিবি প্রায় ৩ কোটি টাকার পণ্য বোঝাই একটি কাভার্ট ভ্যানসহ তাদের আটক করে, যা কাস্টমসের গুদাম থেকে পাচারের চেষ্টা করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় সচেতন ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে কাস্টমসের দুই সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও এক সিপাহীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। জব্দ করা পণ্যের মধ্যে রয়েছে ৬,০০৮টি শাড়ি, ৩৩,২২২টি কসমেটিকস সামগ্রী, ৩৮৬টি কম্বল, ২০৮টি চাদর, ৮টি ওড়না এবং ৬৩৪টি থ্রিপিস।
বেনাপোল কাস্টমসের সহকারী কমিশনার রাহাত হোসেন জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত অপরাধের দায় কাস্টমস নেবে না। প্রাথমিক তদন্তে পণ্য পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে তিনজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এদিকে সচেতন ব্যবসায়ী মহল বলছে, বেনাপোল বন্দর থেকে ৭ কোটি টাকার পণ্য পাচারের ঘটনায় ৪৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পরও পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার আগেই কাস্টমস হাউসের নিজস্ব গুদাম থেকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে সরবরাহের নামে নতুন করে ৩ কোটি টাকার পণ্য পাচারের খবর দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। এতে কাস্টমসের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ঘিরে ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
বেনাপোল আমদানি, রফতানি সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান জানান, এ যেন রক্ষক যে ভক্ষকও সে। কাস্টমসের এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের নানান অনিয়ম, দুর্নীতিতে শুল্ক হারানোর খেসারত গুনতে হচ্ছে এনবিআরকে। আর কালো টাকার পাহাড় গড়ছে দুনীতিবাজরা। যার প্রভাবে চলতি অর্থবছরেই রাজস্ব আয়ের লক্ষমাত্রার বিপরীতে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা আয় কমেছে কাস্টমসের। দায়িত্বশীল কাস্টমস কর্মকর্তারা এসব বিষয়ে আগামী কঠোর পদক্ষেপ নিবেন আশা রাখছি।

জানা গেছে, বিভিন্ন সময়ে আটক হওয়া অবৈধ পণ্য কাস্টমসের গুদামে সংরক্ষণ করা হয়। পরে এসব পণ্য কখনো নিলামে বিক্রি করা হয়, আবার কখনো প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে পাঠানো হয়। গত ২৪ মে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পৃথক দুটি চিঠির মাধ্যমে বেনাপোল কাস্টমসের গুদামে থাকা বাজেয়াপ্ত পণ্য ত্রাণ তহবিলে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। একটি চিঠিতে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা শ্রী ইন্দ্রজিতকে ৩,০২২টি শাড়ি, ৫৮টি থ্রিপিস, ২০৮টি চাদর, ২৬৩টি কম্বল ও ৮টি ওড়না পাঠাতে বলা হয়। অপর চিঠিতে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম চৌধুরীকে ৬৪৮টি শাড়ি, ১০৩টি চাদর, ৭১টি থ্রিপিস এবং ৬২টি লুঙ্গি পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে নির্দেশনার প্রায় এক মাস পর, ২১ জুন গভীর রাতে কাস্টমস হাউস থেকে ত্রাণ পণ্য পাঠানোর কথা বলে দুটি কাভার্ট ভ্যানে বিপুল পরিমাণ প্রসাধনী সামগ্রী তুলে পাচারের চেষ্টা করা হয়। পরে বিজিবি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে বৈধ কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় একটি কাভার্ট ভ্যানে থাকা কাস্টমস কর্মকর্তাসহ তিনজনকে আটক করে।
অপরদিকে আটকের খবর পেয়ে অন্য কাভার্ট ভ্যানটি কাস্টমস এলাকা থেকে বের করা হয়নি। পরে সেটি তল্লাশি করে সেখানেও ঘোষণার অতিরিক্ত পণ্য পাওয়া যায়। এ ঘটনায় সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা শ্রী ইন্দ্রজিত মুখার্জি, আরিফুল ইসলাম চৌধুরী এবং তাদের সহযোগী সিপাহী সাগর হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। সাধারণ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কাস্টমসের গুদামে থাকা আটক পণ্যের হিসাব মিলিয়ে দেখলে বড় ধরনের পণ্য চুরির তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। তাদের প্রশ্ন, কাস্টমস যদি নিজেরাই পণ্য পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকে, তবে নিরাপত্তা কোথায়? এতে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও তারা মনে করছেন। বেনাপোল পোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি তদন্ত) শেখ আব্দুল হাই জানান, সোমবার রাত ১১টার দিকে বিশেষ ক্ষমতা আইনে তিনজনকে গ্রেফতার করে বিজিবি সদস্যরা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। পরে মঙ্গলবার দুপুরে তাদের যশোর আদালতে সোপর্দ করা হয়, যাদের মধ্যে একজন কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা রয়েছেন।
