নতুন ঋণ পেতে কৌশল তুলে ধরবে বাংলাদেশ

নতুন ঋণ কর্মসূচির আওতায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলার চায় বাংলাদেশ। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সম্মেলনের সাইডলাইনে এই ঋণের শর্ত নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক হবে। এসব বৈঠকে সরকারের প্রতিনিধি দল কর্মকৌশল তুলে ধরবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়সূত্রে জানা গেছে। বার্ষিক সভায় যোগ দিতে ইতোমধ্যে ব্যাংকক এসেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। রোববার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারসহ বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের ব্যাংককে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। আগামীকাল ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হবে। ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর চাপ থাকলেও বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের চাপিয়ে দেওয়া সংস্কার নয়; বরং দেশজ কায়দায় বাস্তবায়ন করতে চায় বর্তমান সরকার।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় বাংলাদেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কমে গিয়েছিল। জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আয় মাত্র ৬ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসে এবং অধিকাংশ ব্যাংকে তারল্য সংকট ছিল। তিনটি সংকটের বিষয়ে বিএনপির ইশতেহারে উল্লেখ রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার এসব সমস্যা চিহ্নিত করেনি। আইএমএফ তখনকার ঋণ চুক্তির আওতায় তা চিহ্নিত করে। পার্থক্য হচ্ছে, বিএনপি নিজেই চিহ্নিত করেছে এবং বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নও করছে। বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সম্মেলনে বাংলাদেশের এই অবস্থান তুলে ধরা হবে।

আইএমএফ কেন বাংলাদেশের নিজস্ব তরিকায় সংস্কার মেনে নেবে– এমন প্রশ্নে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা সরকারের সংস্কার কর্মসূচির প্রথম লক্ষ্য ছিল। পাঁচটি ব্যাংক ও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা একসময় নিজেদের অর্থ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন। তাদের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে এবং গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে তারা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ তুলতে পারছেন। এতে ব্যাংকিং খাতে আস্থার পরিবেশ ফিরতে শুরু করেছে।

উপদেষ্টা বলেন, ‘আগের আইএমএফ প্রোগ্রাম তখনকার সরকার বাধ্য হয়ে গ্রহণ করেছিল। আর আমরা দায়িত্বভার গ্রহণ করার আগেই ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা, বন্ধ কলকারখানা চালু ও ঋণপ্রবাহের সংস্কারগুলো চিহ্নিত করেছি। এগুলো সবই অভ্যন্তরীণ বা স্বীয় চালিত সংস্কার প্রোগ্রাম। তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনটি অভ্যন্তরীণ সম্পদবিষয়ক টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে রাজস্ব-জিডিপির অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রচলিত মডেলে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এমন প্রেক্ষিতে যেহেতু বিএনপি সরকারের সঙ্গে জনগণ আছে, আইএমএফও দেখছে সংস্কার হচ্ছে– উন্নয়ন সহযোগীরা বিএনপির সঙ্গে থাকবে বলে তাঁর বিশ্বাস।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র সমকালকে জানিয়েছে, আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় আগের কর্মসূচির যেসব শর্ত বাস্তবায়ন বাকি রয়েছে, সেগুলোও আবার সামনে আসবে। এর মধ্যে মূলত বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বিদ্যুৎ ও সারে ভর্তুকি কমানো এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। থাইল্যান্ডে আলোচনায় অগ্রগতি হলে চলতি মাসের শেষ দিকে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসতে পারে।

বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ সরকার স্বাক্ষরিত ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি থেকে বের হয়ে আসে। অবশ্য পরে অন্তর্বর্তী সরকার ওই কর্মসূচির ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করেছিল। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ পাঁচ কিস্তিতে ৩৮০ কোটি ডলার পেয়েছে। গত বছরের নভেম্বরে আইএমএফ আলোচনা স্থগিত করার পর ষষ্ঠ কিস্তি আটকে যায়। নির্বাচনের পর নতুন সরকারের সঙ্গে আলোচনা আবার শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয় সংস্থাটি। নতুন সরকার আগের ঋণ কর্মসূচি বাদ দিয়ে নতুন একটি ঋণ প্যাকেজের জন্য আবেদন করে বলে আইএমএফের বাংলাদেশ মিশনপ্রধান ইভো ক্রজনার গত ৩ জুন দেওয়া এক বিবৃতিতে জানান।